।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রস্তাব অনুযায়ী শিক্ষকদের বেতন দুই ধাপ বাড়িয়ে ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার পরিকল্পনা চলছে। এটি সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির একটি বড় সাফল্য।
অপরদিকে, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা বছরের পর বছর ধরে এমপিওভুক্তির বিস্তৃতি, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা, বৈষম্য দূরীকরণসহ নানান দাবিতে মিটিং, মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি পালন করলেও এখনো তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। ১৩ আগস্টও তারা প্রেসক্লাবে মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—কেন তাদের আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনছে না?
বেসরকারি শিক্ষক সংগঠন একাধিক ভাগে বিভক্ত। প্রত্যেক সংগঠন নিজস্ব এজেন্ডা ও নেতৃত্ব নিয়ে এগোয়। একীভূত কণ্ঠ না থাকায় দাবিগুলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে শক্তিশালীভাবে প্রতিধ্বনিত হয় না।
সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকরা প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হওয়ায় তাদের দাবি দ্রুত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং রাজনৈতিক সমর্থন পায়। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকরা সরাসরি সরকারি বেতন কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নন, ফলে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির সুযোগ সীমিত।
দাবি আদায়ে শুধু রাস্তায় নামা যথেষ্ট নয়; সংসদীয় কমিটি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও লবিং অত্যন্ত জরুরি। সরকারি শিক্ষক সংগঠন এ দিকটিতে সক্রিয়, কিন্তু বেসরকারি সংগঠনগুলোতে এর অভাব প্রকট।
গণমাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষকদের দুর্দশা সংবাদ আকারে এলেও তা জনমনে বড় আন্দোলন বা চাপ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়নি। দাবির পক্ষে জনমত তৈরির জন্য পরিকল্পিত গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কৌশল প্রায় অনুপস্থিত।
সরকারি শিক্ষকদের দাবির পক্ষে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার স্পষ্ট ভিত্তি থাকে, যা তাদের দাবি বাস্তবায়নে সহায়ক হয়। বেসরকারি শিক্ষকরা অনেক দাবিতেই আইনি ভিত্তি শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।
বহু সংগঠনে নেতৃত্বের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই ও ব্যক্তিগত স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়। এর ফলে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং সরকার তা কাজে লাগায়।
কী করলে দাবিদাওয়া দ্রুত পূরণ হতে পারে: সব শিক্ষক সংগঠন একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসে ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি উত্থাপন করতে হবে। সরকারের কাছে প্রমাণসহ দেখাতে হবে—দাবিগুলো পূরণ করলে শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও দেশের উন্নয়ন কীভাবে ত্বরান্বিত হবে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে সমর্থন আদায় করতে হবে। ধারাবাহিক সংবাদ প্রচার, ভিডিও, তথ্যচিত্রের মাধ্যমে বিষয়টি ভাইরাল করা।
প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে, পরে প্রতীকী কর্মসূচি, এবং শেষ পর্যায়ে শক্তিশালী কিন্তু অহিংস আন্দোলন। প্রয়োজনে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া।
বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি আদায়ে ব্যর্থতার মূল কারণ হচ্ছে নেতৃত্বের বিভাজন, রাজনৈতিক প্রভাবের ঘাটতি, ধারাবাহিক লবিং-এর অভাব এবং জনমত তৈরিতে দুর্বলতা। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব, সুপরিকল্পিত কর্মসূচি, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার এবং আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। অন্যথায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের মতো সফলতা তাদের নাগালের বাইরে রয়ে যাবে।
লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/১০/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
