।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য চলে আসছে। একদিকে সরকার ও প্রশাসন বছরের পর বছর “পাশের হার” বৃদ্ধির গল্প শুনিয়ে সাফল্যের দাবিতে সরব থেকেছে, অন্যদিকে গুণগত শিক্ষার প্রকৃত চিত্র ক্রমশই হতাশাজনক হয়েছে। গত ১৫ বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর করিডরে সবচেয়ে উজ্জ্বল স্লোগান ছিল—“যেভাবেই হোক, পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিলে পাস হবেই।” ফলাফল, কাগজে-কলমে একটি ‘শিক্ষিত’ প্রজন্ম তৈরি হলেও, বাস্তব দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুতি ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
এমন এক প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এসএসসি পরীক্ষায় গুণগত মানের দিকে কিছুটা হলেও নজর দিয়েছে। এর ফলে এ বছর পাশের হার সামান্য কমেছে। এই কমে যাওয়া পাশের হার অনেকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি শিক্ষার মান পুনর্গঠনের একটি ইতিবাচক সূচনা।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়টিকে যদি শিক্ষার মানের দিক থেকে বিশ্লেষণ করা হয়, দেখা যায় এ সময়টিতে সরকার ধারাবাহিকভাবে পাশের হার বাড়ানোর নীতি নিয়েছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ‘গ্রেডিং সিস্টেম’ চালুর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এক প্রকার কৃত্রিম প্রতিযোগিতা—কত বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী A+ পেল বা কত বেশি পাশ করল।
এ নীতির ফলে একদিকে যেমন পরীক্ষার ভীতি কমেছে, তেমনি কমেছে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও। অভিভাবকেরাও মনে করেছেন, যেভাবেই হোক ছেলে-মেয়ের পাশের সার্টিফিকেট পেলে হল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সময়টিতে সরকারি প্রচারণা ও মন্ত্রীদের বক্তব্যে বারবার বলা হয়েছে, “পাশের হার বাড়ছে, মানেও উন্নতি হচ্ছে।” অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাপলে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের পাঠ-বোঝাপড়া, ইংরেজি দক্ষতা ও গণিতের মৌলিক ধারণা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংক ও স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপেও একই তথ্য উঠে এসেছে।
পিছিয়ে পড়ার কারণ বিশ্লেষণে যা চোখে পড়ে-
-চাকরির বাজারে নিয়োগদাতারা বারবার অভিযোগ করছেন, ডিগ্রিধারী তরুণদের হাতে বাস্তব দক্ষতা নেই।
– বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক পাঠে দুর্বলতার কারণে পিছিয়ে পড়ে।
– বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা চাকরির বাজারে বাংলাদেশের তরুণরা পিছিয়ে পড়ছে গুণগত শিক্ষার অভাবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন। এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় “যেভাবেই হোক পাস” নীতি কিছুটা শিথিল করা হয়। ফলে দেখা গেছে, পাশের হার কিছুটা কমে এসেছে।
অনেকের কাছে এটি যেন একটি ‘বিপর্যয়’ মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি শিক্ষাব্যবস্থায় সঠিক দিকের প্রথম পদক্ষেপ। কারণ, গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য কখনো কখনো কঠোরতা জরুরি হয়। পাশের হার কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দিলে তা কেবল রাজনৈতিক প্রচারণায় কাজে লাগে, কিন্তু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো—যে শিক্ষার্থী নির্ধারিত পাঠক্রমে বার্ষিক বা প্রাক-পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করবে, তাকে পাবলিক পরীক্ষায় বসার অনুমতি না দেওয়া।
পদক্ষেপ গুলো বাস্তবায়ন হলে যে সুফল গুলো পাবো:
– শিক্ষার্থীরা জানবে, পরীক্ষায় বসার আগে পাঠে মনোযোগী হতে হবে।
-শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে আরও মনোযোগী হবেন।
– স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে বাধ্য হবে।
– অভিভাবকেরা সন্তানকে নিয়মিত পড়াশোনায় উৎসাহিত করবেন। তাহলে গুনগত মানের রেললাইনে উঠবে শিক্ষাব্যবস্থা।
বর্তমানে অনেক দেশেই এই নীতি চালু আছে। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্দিষ্ট মান অর্জন না করলে কোনো শিক্ষার্থী উচ্চতর স্তরের পরীক্ষায় বসতে পারে না। এর ফলে সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের সেরা পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সিঙ্গাপুর: প্রতিটি স্তরে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে। ফেল করলে পরবর্তী স্তরে উন্নীত হওয়া যায় না।
দক্ষিণ কোরিয়া: কঠোর মূল্যায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠার আগে শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করেছে।
ফিনল্যান্ড: যদিও এখানে পরীক্ষার সংখ্যা কম, তবে প্রতিটি ধাপে শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয় এবং পিছিয়ে পড়লে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়।
এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে—শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করলে শিক্ষার মান বাড়ে, পাশের হার নয় বরং দক্ষতার মানদণ্ড হয়ে ওঠে সাফল্যের মাপকাঠি।
এইগুলো বাস্তবায়নে আসতে পারে নানা বাধা যেমন-
-পাশের হার কমে গেলে তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হতে পারে।
-অনেক অভিভাবক সন্তানের ফেল মেনে নিতে চান না।
– শিক্ষক ও অবকাঠামোর অভাব আছে, সেখানে এই নীতি কার্যকর করতে আলাদা সহায়তা দরকার।
সুপারিশ সমূহ :
বার্ষিক মূল্যায়ন কঠোর করা: প্রাক-পাবলিক পরীক্ষাকে গুণগত মান নির্ধারণের মূল ভিত্তি হিসেবে নিতে হবে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করা: গুণগত শিক্ষা দিতে সক্ষম শিক্ষক তৈরি করতে হবে।
পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা: মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা বাদ দিয়ে দক্ষতা, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগভিত্তিক প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
প্রযুক্তি সংযোজন: ই-লার্নিং, অনলাইন ক্লাস, ও ডিজিটাল মূল্যায়ন চালু করতে হবে, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে।
দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা: ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য রিমিডিয়াল ক্লাস ও অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
শিক্ষা বাজেট বৃদ্ধি: মোট জাতীয় বাজেটের অন্তত ৬% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দিতে হবে।
গত ১৫ বছরের শিক্ষা নীতি কাগুজে পাশের হার বাড়াতে সফল হলেও, দেশের জন্য তা ছিল এক ধ্বংসাত্মক প্রবণতা। গুণগত শিক্ষার মানে ফিরে আসতে হলে, পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রথম উদ্যোগ—পাশের হার কমানো—যদিও অনেকের কাছে অস্বস্তিকর, তবুও এটি শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় ঝাঁকুনি দিয়েছে।
আমরা যদি এখনই সঠিক পথে হাঁটতে শুরু করি—যেখানে পাশের হার নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয় হবে মূল লক্ষ্য—তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু সার্টিফিকেটধারী নয়, প্রকৃত অর্থে যোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৯/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
