নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ কারও নিয়োগ ২০১৯ সালে, কেউ ২০২০ কেউবা ২০১৫ সালে কিন্তু নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০০০ সালে। কারণ ২০০৫ সালের পরবর্তীতে মাধ্যমিক স্কুলের নিয়োগের জন্য শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক এবং ২০১৫ সালের পরে নিয়োগের এখতিয়ার বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ)। নেই শিক্ষক নিবন্ধন সনদ, ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগের ক্ষমতা নেই যখন ঠিক সে সময়ে নিয়োগ দেয়া হলেও তা বৈধ করতে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ২০০৫ সালের আগে নিয়োগ দেখিয়ে ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হওয়া চাঁদপুরের মতলব উত্তরের আলী আহম্মদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঁচ শিক্ষক এমপিওভুক্ত হয়েছেন ২০২৪ সালের মে মাসে। এমপিওভুক্তির আগে ব্যানবেইসের শিক্ষক হালনাগাদ তথ্য আবশ্যিক ভাবে যাচাইসহ নিয়োগ সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র যাছাই বাছাই করে এমপিওভুক্ত চুড়ান্ত করার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও তার কোন পতিপালন করেনি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার কুমিল্লা অঞ্চলের উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ রফিকুল ইসলাম।
নিয়ম অনুযায়ী, এমপিওভুক্তির ফাইল স্কুল থেকে উপজেলা এবং উপজেলা থেকে জেলা শিক্ষা অফিস এবং জেলা থেকে ডিডি অফিসে গিয়ে চূড়ান্ত যাছাই-বাছাই শেষে ব্যক্তি পর্যায়ের শিক্ষক কর্মচারীদের চূড়ান্ত এমপিওভুক্ত করা। কিন্তু শতভাগ জালিয়াতি করে নিয়োগ নেওয়া আলী আহম্মদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক মো. ইব্রাহিম খলিল, সহকারী শিক্ষক মাহমুদ হাসান, মো. শাহ আলম সরকার, নাছিমা বেগম ও তপন চন্দ্র সরকার এবং অফিস সহকারী শারমিন আক্তারের ফাইল প্রায় ত্রিশ লাখ টাকার বিনিময়ে যাচাই বাছাই ছাড়াই এমপিওভুক্ত করেছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ডিডি রফিকুল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৬ অক্টোবর ২০১৫ ইং তারিখে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে ময়মনসিংহে যোগদান করে ১ মে ২০২৩ পর্যন্ত থাকে কর্মরত ছিলে মোঃ রফিকুল ইসলাম। এরপর ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ইং তারিখে কুমিল্লা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদে পদায়ন পান তিনি। ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব থাকা প্রায় আট বছর সময় ধরেই নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ, অবৈধ লেনদেন থেকে শুরু করে অগণিত আর্থিক কেলাঙ্গারীতে নিজের নাম জড়ান তিনি। গুগলে রফিকুল ইসলাম বলে লিখে ‘সার্চ’ করলেই একাধিক জালিয়াতির সংবাদ চোখে পড়ে। নানা সময়ে আর্থিক কেলাংকারীর সংবাদ প্রকাশ হলেও রফিকুল ইসলামের কর্ণপাত নেই তার। অবৈধ আয়ে মোটা অংকের টাকা দিয়ে উর্ধ্বতন অফিস ‘মেনেজ’ করার ক্ষমতা রয়েছে তার।
আরও পড়ুনঃ
- দীপু মনি সিন্ডিকেটের ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মজিদ এখনও বহাল তবিয়তে
- এখনও স্বপদে বহাল ‘নির্ধারিত রেটে ঘুস’ নেওয়া হবিগঞ্জের ডিইও রুহুল্লাহ
- ঢাকাতেই কর্মজীবন আয়নাঘরের হোতার আপন বোন ‘ঘুসখোর’ মাউশির নাজমুন নাহার
- মাউশিতে সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী নাহিদ সুলতানা ও মেজবাহের দাপট
- এমপিওভুক্তিতে মাউশির ঢাকা অঞ্চলের ডিডি খালেক নিয়েছেন ১০ কোটি টাকা!
জানা গেছে, একাধিক নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলেও মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে ত্রিশাল উপজেলার কাটাখালী উমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের তদন্তে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের অধ্যক্ষকে আহ্বায়ক করে দুই সদস্যর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে মাধ্যামিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এক আদেশে এই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যক্ষ মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান। প্রতিবেদনে জেলা শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলামের কাছে নিয়োগ, ম্যানেজিং কমিটিসহ একাধিক অনিয়মের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগ জমা দিলেও অভিযুক্তদের থেকে আর্থিক লাভবান হয়ে কোন তদন্ত না করা, নিয়োগ বাণিজ্যে আর্থিক লাভবান হওয়া, ডিজি প্রতিনিধি দিতে অর্থ নেওয়া, ফাইল পাঠাতে ঘুষ বাণিজ্য সহ একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিভাগীয় মামলা করার সুপারিশ করা হয়। এই তদন্ত প্রতিবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ২০১৯ সালের তৎকালীন মহাপরিচালক ২২ আগস্ট শিক্ষা সচিব বরাবর প্রেরণ করেন। তবে তদন্ত প্রতিবেদনের সেই সুপারিশ আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৯ সালের তদন্তে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাকে ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা অফিসার পদেই দায়িত্ব রাখা হয়। এরপর কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার এবং সর্বশেষ মাউশির কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-উপরিচালক পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বর্তমানে জেলা শিক্ষা অফিসার এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের ডিডি একই সাথে পালন করায় তার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, টাইমস্কেল প্রদানে, এমপিওভুক্তিতে মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্য করার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, নামে বেনামে অবৈধ আয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। বর্তমানে ঢাকায়কে কোন স্কুলের প্রধান শিক্ষক হবেন, কে কোন অঞ্চলের ডিডি কিংবা কোন জেলায় শিক্ষা অফিসার পদে পদায়ন পাবেন তা ঠিক করতে মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার পদায়নের আর্থিক ‘দালাল’ হিসেবে কাজ করছেন তিনি। তার এই সিন্ডিকেটে আরও রয়েছে ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল মজিদ, নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইউনূস ফারুকি, হবিগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল্লাহ, তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহরিন খান রুপা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার খুলনা অঞ্চলের ডিডি খোঃ রুহুল আমীন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার বরিশাল অঞ্চলের সাবেক বিতর্কিত উপ-পরিচালক বর্তমান মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লার একাধিক শিক্ষক শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, ‘শুধু কুমিল্লা নয় উপ-পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকায় একাধিক অনিয়মে জড়িয়েছেন তিনি। টাকা ছাড়া কোন কাজই করেন না। গর্ব করে বলেন কত তদন্ত হলো আমার বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারল না। মন্ত্রণালয় মেনেজ করা আছে তার। তার বিরুদ্ধে কিছু হবে না। শুধু টাকাই নয় শিক্ষক কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অশোভন আচরণসহ নানা হয়রানির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।’
ময়মনসিংহের এমপিওভুক্ত এক বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, রফিকুল ইসলাম যখন ময়মনসিংহে দায়িত্বে ছিলেন এমন কোন ফাইল নেই যে ফাইল সেন্ট করতে তিনি টাকা নেননি। স্কুলের কর্মচারী নিয়োগের ডিজি প্রতিনিধি দিতে টাকা, সেই কর্মচারী নিয়োগ করে এমপিও ফাইল পাঠানোর জন্য টাকা, টাইমস্কেল থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় থেকে স্কুলের কোন উন্নয়নমূলক কাজে অর্থ বরাদ্দ হলেও সেখান থেকে তাকে অংশ দিতে হয়েছে। তার অত্যাচারে অতিষ্ট ছিল পুরো জেলার শিক্ষক কর্মচারীরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমার বিষয়ে এগুলো একেবারেই ভুল তথ্য, উপজেলা জেলা থেকে যাচাই-বাছাই হয়ে আমার কাছে আসে অনলাইন তথ্য যাচাই বাছাই করেছি প্রত্যয়ন পত্র পেয়েছি সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এমপিও তো হবেই। আমি ব্যস্ত আছি পরে কথা বলবো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিকের পরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, 01711586505
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক এ বি এম রেজাউল করীম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ আমরা অনেকগুলো পেয়েছি। লিখিত অভিযোগ পেলে সুনির্দিষ্টভাবে তদন্ত করতে সুবিধা হয়ে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের একজন যুগ্মসচিব শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আওয়ামী লীগের আমলের অনেক ফাইল কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে গায়েব হয়ে গেছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাই মুশকিল। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে নিশ্চয়ই সচিব মহোদয় ও মাননীয় উপদেষ্টা মহোদয় ব্যবস্থা নিবেন।
শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য জোটের সভাপতি অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভুইঁয়া শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, ফ্যাসিষ্ট খুনী হাসিনার দোসর এই জেলা শিক্ষা অফিসার কুমিল্লায় যোগদান করার পর রাম রাজত্ব কায়েম করেছেন। টাকা দিলে জাল সার্টিফিকেট এবং আওয়ামী লীগ হলে নিয়োগ দিতে তিনি পিছপা হন না বলে অভিযোগ আছে। নিয়োগ বানিজ্য, এসএসসি ও এইচএসসির ফল বাণি্জ্য করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে তিনি ব্যাপক আলোচিত । এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। অতি সত্তর তার বিচার না হলে কুমিল্লার শিক্ষক-কর্মচারীরা তার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৭/১০/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
