মাউশিতে সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী নাহিদ সুলতানা ও মেজবাহের দাপট

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ অবসরে গিয়েও থেমে নেই ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীমের বান্ধবী জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক সহকারী সহকারী প্রধান শিক্ষক নাহিদ সুলতানার ক্ষমতার দাপট। বর্তমানে তিনি পিআরএল-এ আছেন। কে কোন পদে পদায়ন পাবেন এবং কাকে কোন পদে রাখা যাবে না তা ঠিক করে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রভাব রয়েছে মাউশি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত। বর্তমানে নাহিদ সুলতানা পিআরএল-এ থাকলেও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি বাগিয়ে নিতেও মাউশি এবং মন্ত্রণালয়ে সমানতালে দৌড়ঝাঁপ করছেন।  অন্যদিকে চলমান শিক্ষকতা জীবনের অধিকাংশ সময়েই বিতর্কিত বিভিন্ন অনিয়মে অভিযুক্ত হয়েও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এস. এম. মেজবাহ্ উদ্দীন যিনি কুমিল্লায় তার বাড়ীর সুবাদে কুমিল্লার দুই উপদেষ্টার নাম ভাঙ্গিয়ে প্রভাব বিস্তার করে এহেন অপকর্ম নেই যা করছেন না। এস. এম. মেজবাহ্ উদ্দীন বর্তমান তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি)।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাহিদ সুলতানা ১৯৯১ সালে সহকারি শিক্ষিকা পদে তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করে ৩২ বছর একই কর্মস্থলে চাকুরী করেছেন। তথ্য গোপন করে সহকারী শিক্ষক থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পদন্নোতি নিয়েছেন।  যেখানে সরকারি চাকরিতে তিন বছর অন্তর অন্তর বদলির কথা বলা হলেও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে একই বিদ্যালয়ে টানা ৩২ বছর থেকেছেন। বর্তমানে পিআরএল-এ থাকলেও ভূতাপেক্ষা পদোন্নতি নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশিতে দৌড়ঝাঁপ করছেন। শুধু তাই নয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার আঞ্চলিক কার্যালয়ে কে উপ পরিচালক হবে, কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে বদলি হবে এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বদলি ঠিক করে দেয়ার মত প্রভাব রয়েছে সাবেক এই ছাত্রলীগ নেত্রীর। 

নাহিদ সুলতানার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ 

টানা ৩২ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত যা সরকারি চাকরির ইতিহাসে বিরল। কর্মজীবনের প্রতিটা দিন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার ফলে শিক্ষকতার চেয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক,  শিক্ষক, কর্মচারী এমনকি প্রধান শিক্ষককেও তার অধীনস্থ ভাবতেন। নিজেই ফার্মগেটে একটি কোচিং সেন্টারের মালিক,  স্কুলেই গাইড বই বিক্রি করা, স্কুলের প্রশ্ন কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থীদের কাছে ফাঁস করা, কোচিং না করলে নম্বর কম দেয়া থেকে শুরু করে একাধিক আর্থিক অনিয়ম রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চাকুরীকালীন মাতৃত্ব ছুটি শেষ হওয়ার পরেও দীর্ঘ দিন বিদ্যালয়ে বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত ছিলেন। তার চাকুরীর ধারাবাহিকতা ক্ষুন্ন হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি  ক্ষমতার দাপটে  তথ্য গোপন করে ও জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হওয়ায় এবং পতিত আওয়ামী সরকারের সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীমের (তিনিও জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী) বান্ধবী হবার সুবাদে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্যদের বঞ্চিত করে ২০১৮ সালে সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ক্ষমতাবলে একই বিদ্যালয়ে যোগদান করেন, যেখানে ঐ বিদ্যালয়ের অন্য সাত  জনকেই ঢাকার বাইরে যোগদান করতে হলেও তিনি তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েই কর্মরত ছিলেন। 

আরও পড়ুনঃ এমপিওভুক্তিতে মাউশির ঢাকা অঞ্চলের ডিডি খালেক নিয়েছেন ১০ কোটি টাকা!

জানা গেছে, গত ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইং তারিখে  তারিখ স্কুলটির অভিভাবকরা সারাসরি তার এবং তার কোচিংয়ের শিক্ষক একই বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক মেজবাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোচিংয়ে না যাওয়ায় নম্বর কম প্রদানের বিষয়ে  লিখিত অভিযোগ করেন।  তিনি সরকারি নির্দেশ অমান্য করে তার সহযোগী মেজবাহ উদ্দিনকে নিয়ে রয়েল পাবলিকেশন থেকো মোটা অংকের অবৈধ অর্থ গ্রহণ করে গোপনে গাইড বই চালু করার চেষ্টা করেন। ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে সিসিটিভিতে দেখা যায়, তার অফিস কক্ষ থেকে গাইড বই শিক্ষকদের নিকট বিতরণ করছেন। নাহিদ সুলতানা চাকরিজীবনে প্রায় বিনা অনুমতিতে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেছেন। করোনাকালে অনলাইনে কোন সভায় অংশগ্রহণও করেননি। শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাথে শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ এবং প্রশাসনিক এবং একাডেমিক দায়িত্বে অবহেলা ও অনৈতিক কাজের জন্য তার বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ১২ মার্চ ইং তারিখ এবং ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ফব্রুয়ারি ইং তারিখে মাউশির মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ করা হলেও অজানা কারণে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। করোনাকালীন তিনি বিদ্যালয়ে কোন দায়িত্ব পালন করেননি। এ বিষয়েও অভিযোগ করা হয় কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। 

আরও পড়ুনঃ একাই ছয় বছরে দিয়েছেন সাড়ে ৮ হাজার এমপিও

তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হলেও শ্রান্তি বিনোদন ভাতা উত্তোলন করেন তেজগাঁও বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের, যা সরকারি চাকুরীবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন

২০১৯-২০ অর্থ বছরে তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বাজেটের শ্রান্তি বিনোদন ভাতার আর্থিক ঘাটতি ছিল। ফলে মাউশির ফিন্যান্স ও প্রক্রিউমেন্ট শাখার তৎকালীন সহকারী পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদের পরামর্শে বিদ্যালয়ের প্রায় ১৪/১৫ জন শিক্ষককে বাজেটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। পরবর্তীতে বাজেট প্রদান করা হলে সকল শিক্ষক তাদের পূর্ব নির্ধারিত তারিখে বিল করে দাখিল করেন। কিন্তু নাহিদ সুলতানা বিল দাখিল না করায় তাকে বিলের অফিস কপি জমা করার জন্য পুনরায় বলা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনরুপ কর্ণপাত করেননি। তিনি পার্শ্ববর্তী তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাজেট থেকে শ্রান্তি বিনোদন ভাতা উত্তোলন করেছেন বিধায় ঐ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বঞ্চিত হয়েছেন।  তাকে উক্ত টাকা ফেরৎ দিয়ে নিজ বিদ্যালয়ের বাজেট থেকে বিল করতে বলা হলেও তিনি তাতে কর্ণপাত করেননি। তাকে বিদ্যালয় থেকে বারবার কারণ দর্শানো হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি এবং বিদ্যালয়ে তিনিসহ অফিস সহকারী ও তার সহযোগীদের নিয়ে বিশৃংখলা করেছেন। কর্মচারীদের টাকা দিয়ে ষড়যন্ত্র করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং জরুরী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অফিস থেকে সরিয়ে ফেলেছেন । ফলে এ বিষয়ে তিনি কর্ণপাত না করায় বিদ্যালয়টির পক্ষ থেকে ১১/১১/২০ তারিখ তার শ্রান্তি বিনোদন বিষয়ে তদন্তের জন্য তৎকালীন শিক্ষা সচিব, মাউশির মহাপরিচালক এবং চিফ একাউন্টস অফিসারের নিকট লিখিতভাবে আবেদন করা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং হিসাব রক্ষণ অফিস কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলেও শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের আদেশে তার বিরুদ্ধে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে ২৬/০১/২০২১ তারিখ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।  তদন্তকারী কর্মকর্তা সাখায়েত হোসেন বিশ্বাস উপপরিচালক ঢাকা অঞ্চল ২১/০৩/২১ তারিখ এ বিষয়ে বিদ্যালয়ে এসে তদন্ত করেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোন তদন্ত রিপোর্ট পাওয়া যায়নি । তিনি এবং তার সহযোগী কয়েকজন শিক্ষক চাকুরী বিধি লংঘন করে মিথ্যা অভিযোগ এনে বিদ্যালয়টির তৎকালীন প্রধান শিক্ষককে হেনস্থা করার চেষ্টা করেন এবং সামাজিক যোগাঁযোগ মাধ্যমেও মেজবাহ উদ্দিনকে দিয়ে মিথ্যা বানোয়াট বিবৃতি দেন।

আরও পড়ুনঃ মাউশির আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের কার্যালয় যেন ঘুসের হাট-বাজার!

এছাড়াও ১৭/০৬/২১ তারিখ নাহিদ সুলতানার সহযোগী ২ জন শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বেতন বন্ধের নামে মিথ্যা অভিযোগ করেন যার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস উপপরিচালক সাধারণ প্রশাসন ৩১/০৮/২১ তারিখ বিদ্যালয়ে তদন্ত করেন এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। একই দিনে উপপরিচালক  সাখায়েত হোসেন বিশ্বাস ও সাহারা খানম শ্রান্তি বিনোদনের বিষয়ে পুনরায় তদন্ত করেন এবং মৌখিকভাবে তাকে উক্ত অর্থ ফেরৎ দিতে বলেন। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে মাউশিতে এ বিষয়ে বেশ কয়েকবার মাধ্যমিক শাখায় উপপরিচালক এবং সহকারী পরিচালকের সমন্বয়ে তাকে নিয়ে শুনানী হয়েছে। কিন্তু তিনি  তা কর্ণপাত না করে তার সহযোগীদের নিয়ে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উল্টো মিথ্যা অপপ্রচারে লিপ্ত হন। ফলে এ বিষয়টির তদন্ত সঠিকভাবে হয়নি। বরং তিনি অফিস সহায়ক মারফত এসিআর প্রেরণ করে তার হাতে হাতে গ্রহণ করতে চাইলে প্রধান শিক্ষক এসিআর উপপরিচালকের নিকট জমা প্রদান করেন। এ বিষয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য নাহিদ সুলতানার তৎকালীন বন্ধু মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর সৈয়দ ফারুক আহমেদ এর নিকট মিথ্যা অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে তাঁর বন্ধু সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক শামীম এর নির্দেশে পুনরায় ১৯/০৩/২০২৩ তারিখ তৎকালীন শিক্ষা সচিবের কক্ষে রিভিউ শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত শুনানীতে মহাপরিচালকের প্রতিনিধি হিসেবে সহকারি পরিচালক (মাধ্যমিক-১) দুর্গা রানী উপস্থিত ছিলেন। উক্ত শুনানীতে নাহিদ সুলতানা নিজেই স্বীকার করেন যে, তিনি অন্য বাজেট থেকে তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কর্মচারী এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটরের মাধ্যমে জালিয়াতি করে শ্রান্তি বিনোদন ভাতা গ্রহণ করেছেন এবং তা অদ্যাবধি ফেরৎ প্রদান করেননি। এছাড়াও শুনানীর সময় উপসচিব (মাধ্যমিক- ১) রহিমা বেগম তাঁর সিলগালাকৃত এসিআর (২য় বারের) সচিব মহোদয়ের নিকট উপস্থাপন করেন। প্রাক্তন উপপরিচালকদ্বয় সাহারা খানম এবং সাখায়েত হোসেন বিশ্বাস তার এসিআর  সংশোধন করেননি। ফলে শিক্ষা সচিব তার অবৈধ শ্রান্তি বিনোদন উত্তোলন বিষয়ে সত্যতা প্রামাণিত হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানান যে বিষয়টি অবলোপন সম্ভব নয়। যে কোন তদন্তের পরে শিক্ষা সচিব শুনানী করলে তার অধিনস্ত  দপ্তর কর্তৃক আর পুনঃতদন্ত করার কোন সুযোগ ও বিধান না থাকলেও তিনি তার রাজনৈতিক বন্ধুদের ক্ষমতাবলে এবং মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর নেহাল আহমেদের নির্দেশে  মাউশির আদেশে ০৮/১০/২০২৩ তারিখে পুনরায় তদন্ত করান এবং উক্ত তদন্তেও তার জালিয়াতির প্রমাণ হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও তার বিরুদ্ধে অজানা কারণে বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। 

অনিয়মের অভিযোগে প্রধান শিক্ষকের পদে পদন্নোতি পাননি নাহিদ সুলতানা

নাহিদ  সুলতানা পিআরএলএ যান ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ খ্রীষ্টাব্দে। নিজের তথ্য গোপন করে ২০১৮ সালে সহকারী শিক্ষক থেকে সহকারী  প্রধান শিক্ষক পদে সাবেক মন্ত্রী এবং জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী যারা মাউশিতে কর্মরত তাদের ব্যবহার করে পদন্নোতি নিতে পারলেও ২০২২ সালে মে মাসে তার পদোন্নতির ফাইল আটকে দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পদোন্নতিযোগ্য শিক্ষকের মাউশি কর্তৃক করা তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করাতে পারলেও তা আটকে দেয় মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, ২০২২ সালের মে মাসে  পদোন্নতিযোগ্য ৪২৩ জন শিক্ষকের তথ্য মাউশি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে অনেকের চাকরি জীবনে সমস্যা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে (এসিআর) সমস্যা থাকায় ডিপিসি সভায় অনেকেই পদোন্নতিযোগ্য হতে পারেননি। সর্বশেষ সভায় ২৩৪ জনের পদোন্নতি দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয় । শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সূত্র বলছে, নাহিদ সুলতানার চাকরি জীবনে সমস্যা ও একাধিক অনিয়ম এবং  বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে (এসিআর) সমস্যা থাকায় ডিপিসি সভায় তিনি পদোন্নতিযোগ্য হতে পারেননি। সচিবের নিকট শুনানীর পরে তার আর্থিক জালিয়াতি প্রমানিত হওয়ায় পদোন্নতি সভায় মাউশির ডিজি নেহাল আহমেদ ও শিক্ষা সচিব চেষ্টা করলেও অর্থ মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধি রাজি হননি । ফলে এনামুল হক শামীমের নির্দেশে প্রতিশোধ নিতে ডিজি নেহাল ও মন্ত্রনালয় সাবেক প্রধান শিক্ষককের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে শাস্তি প্রদান করেন। সেই নাহিদ সুলতানার কথায় এখনও মাউশি ও সচিবালয় নিরাপরাধ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

এ বিষয়ে মাউশির উপ-পরিচালক আজিজ উদ্দিন সে সময় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, কোনো শিক্ষক যদি তার অধিস্থন শিক্ষকের এসিআর খারাপ দেন সেক্ষেত্রে আরেকটি সুযোগ থাকে। সেটি হলো ওই এসিআরে যিনি প্রতিস্বাক্ষর করেছেন। আমার জানা মতে তার তিন বছরের এসিআরে দুজন ডিডির প্রতিস্বাক্ষর রয়েছে।

তদন্তে প্রমাণিত হলেও এবং শত অভিযোগ থাকলেও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ থেকেই পিআরএল-এ গেলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয় বর্তমানে তিনি তার ভুতাপেক্ষা পদন্নোতি নেওয়ার জন্যও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিন মাউশি এবং মন্ত্রণালয়ে তার বিচরণ লক্ষণীয়। 

প্রধান শিক্ষক, আঞ্চলিক উপ-পরিচালক এবং জেলা শিক্ষা অফিসার পদে বদলি-পদায়নে নাহিদ সুলতানার দাপট 

কে কোন সরকারি হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে বদলি হবেন এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার আঞ্চলিক পরিচালক পদে কে পদায়ন পাবেন তা ঠিক করে দেয়ার তদবির নিয়ে মন্ত্রণালয়ে এবং মাউশিতে প্রতিদিন যাচ্ছেন এবং মন্ত্রণালয়ে পতিত সরকারের দোসর ও নাহিদ সুলতানার বন্ধুদের যোগসাজশে এই পদায়ন বাস্তবায়নও হচ্ছে। সম্প্রতি একটি আঞ্চলিক উপ পরিচালককে পদায়নের ২৫ দিনের মাথায় বদলি করান নাহিদ সুলতানা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) সৈয়দ মামুনুল আলম নাহিদ সুলতানার প্রেসক্রিপশনে উপরক্ত পদে পদায়ন করছেন। এই তালিকায় বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক) পদে পদায়নের জন্য হবিগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল্লাহ এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মোঃ ইউনুছ ফারুকীর নাম রয়েছে। অচিরেই নাহিদ সুলতানার প্রেসক্রিপশনে ও অতিরিক্ত সচিবের কার্যক্রমে এই পদে দুইজনের যে কোন একজন পদায়ন হতে চলেছেন। 

হাসিনা সরকার পালালেও সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী নাহিদ সুলতানার ক্ষমতার উৎস যারা 

মাউশির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক গোলাম ফারুখ নাহিদ সুলতানার বন্ধু, মাউশির সাবেক মহাপরিচালক  জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অধ্যাপক নেহাল আহমেদ তার ঘনিষ্ঠজন। এছাড়াও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনির পদায়ন করা মাউশির মাধ্যমিকের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বেলার হোসাইন অন্যতম। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) সৈয়দ মামুনুল আলম অন্যতম। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ঢাকার আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মজিদও নাহিদ সুলতানার অন্যতম ঘনিষ্ঠজন। 

 এস. এম. মেজবাহ্ উদ্দীনের নানা অপকর্ম ও ক্ষমতার উৎস 

২০১৮ সালের ১৯ জুলাই থেকে তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত  এস. এম. মেজবাহ্ উদ্দীন নাহিদ সুলতানার ডান হাত। নাহিদ সুলতানার কোচিংয়ের অন্যতম শিক্ষক ও গাইড বই বিক্রেতা, প্রশ্নফাঁস, শিক্ষার্থীদের সাথে অসাদাচরণ, কোচিংয়ে না পরলে নম্বর কম দেয়া এবং নানাভাবে শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করার একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ক্ষমতার দাপটে তিনিও টানা সাত বছর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। জানা গেছে,  এস. এম. মেজবাহ্ উদ্দীনের গ্রামের বাড়ী কুমিল্লায়। বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল ·এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বাড়ি কুমিল্লা হওয়ায় তিনি মন্ত্রণালয় এবং মাউশিতে উপদেষ্টাদের দাপট দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ধাপাচাপা দিয়ে রেখেছেন। এমনকি তার মনোপুত না হলেও তিনি বিভিন্ন শিক্ষককে অবৈধ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হয়রানি করে বেড়াচ্ছেন। এছাড়াও তার আপন শ্যালক প্রশাসন ক্যাডারের হওয়ায় তাকে দিয়ে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন। সম্প্রতি শিক্ষা উপদেষ্টার পিএসকে দিয়ে বদলিকৃত মাউশির এক কর্মকর্তা কেন যোগদান করছেন না তাকে যোগদান করার জন্য মাউশির ভারপ্রাপ্ত ডিজিকে তিনি ফোন করে চাপ দেওয়ান। 

জানতে চাইলে নাহিদ সুলতানা এবং মেজবাহ উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। 

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির কোন কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজী হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন কর্মকর্তা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, নাহিদ সুলতানা পিআলএ চলে গেলেও তার ক্ষমতার দাপট এখনও চলমান রয়েছে। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে গেলে তাকেই বদলি করানোর হুমকি দিয়ে বসেন তিনি। তাছাড়া একটি পেইড পত্রিকায় নিউজ করানোর হুমকি প্রদান করেন তিনি। তাই তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে চাননা। 

শিক্ষা সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বর্তমানে মন্ত্রীপরিষদ সচিব হওয়ায় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের নতুন সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন সিদ্দিক জোবায়ের। তিনি এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত যোগদান না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

এ বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি মুঠোফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।  

উল্লেখ্য, নাহিদ সুলতানা এবং মেজবাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে একাধিক লিখি অভিযোগের কপি শিক্ষাবার্তা’র হাতে রয়েছে। 

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৬/১০/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.