হাইকোর্টের আদেশও মানছেন না প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুজ্জামান

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ নিয়োগ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে ট্রাস্টের ভুয়া চেয়ারম্যান দেখিয়ে কমিটি করে এবং সেই কমিটি বোর্ড থেকে অনুমোদন নিয়ে চার পদে নিয়োগ দিয়ে অন্তত চল্লিশ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এক প্রধান শিক্ষক এবং ভুয়া সেই ম্যানেজিং কমিটি। ঘটনা শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার তাতিহাটি আইডিয়াল স্কুলের। বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে সেই কমিটি অবৈধ ঘোষণা করে এবং ট্রাস্টের মাধ্যমে কমিটি করার নির্দেশ প্রদান করার ৬ মাস অতিবাহিত হলেও তা প্রতিপালন করছেন না প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুজ্জামান। এমনকি হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিষয়ে কোন গুরুত্ব দেয়নি ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রীবরদী উপজেলার তাতিহাটী গ্রামে ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম “আল-ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদী” প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে উক্ত ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম ট্রাস্টের অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং এলাকায় উন্নয়ন ও সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে একটি মসজিদ, মুন্সি মফিজ উদ্দিন ইয়াতিম খানা, তাতিহাটী আইডিয়াল স্কুল, আলহাজ্ব আলেছা খাতুন নূরাণী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা অন্যতম। সম্প্রতি ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম শারিরীক অসুস্থতা ও বার্ধক্যজনিত কারনে দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করে তার পদ থেকে অব্যহতি চাওয়ায় ট্রাস্ট কমিটির বিগত ০৭ জানুয়ারি ২০২৩ ইং তারিখের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিষ্ঠাতা জয়েন্ট সেক্রেটারী এ.ওয়াই.এম আমিনুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে আল-ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদীর একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়। তারই ধারাবহিকতায় প্রতিবারের ন্যায় ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত তাতিহাটি আইডিয়াল স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের জন্য প্রধান শিক্ষক মোঃ নূরুজ্জামানকে গত ৫ মার্চ ২০২৩ ইং তারিখে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রধান শিক্ষক ট্রাস্টের চিঠিকে গুরুত্ব না দিয়ে তথ্য গোপন করে, অবৈধভাবে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে আব্দুল মোমেনকে ট্রাস্টের চেয়ারম্যান দেখিয়ে তার মনোনয়ন নিয়ে মোঃ আব্দুর রহমানকে সভাপতি করে প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুজ্জামান ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড থেকে গত ১৩ এপ্রিল ২০২৩ ইং তারিখে কমিটির আবেদন করেন যা গত ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ইং তারিখে শিক্ষা বোর্ড অনুমোদন করে।

অবৈধ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সহায়তায় বেশ তড়িঘড়ি করে প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুজ্জামান ৩১ মে ২০২৩ ইং তারিখে একটি স্থানীয় পত্রিকায় অতি গোপনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ৪ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে নিয়োগ প্রদান করে। নিয়োগে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন। নিয়োগ দিয়ে তাদের এমপিওভূক্তির জন্য আবেদন করেন। অবৈধ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি কর্তৃক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, গোপনে নিয়োগ পরীক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও এ সম্পর্কে এলাকার কেউ অবগত নেই।

“আল-ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদী” এর যে চেয়ারম্যান দেখিয়ে কমিটি অনুমোদন করেছে সেই চেয়ারম্যান তিনি নন এবং এটি জালিয়াতি করে করা হয়েছে জানিয়ে এর প্রতিকার চেয়ে গত ৬ জুলাই ২০২৩ ইং তারিখে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন “আল-ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদী” এর চেয়ারম্যান এ.ওয়াই.এম আমিনুল ইসলাম। লিখিত অভিযোগের কোন সুরাহা না পাওয়ায় তিনি তিনি হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন, যার নম্বর ১০০৮৩/২০২৩। হাইকোর্ট উক্ত রিটের প্রেক্ষিতে গত ২০ আগস্ট ২০২৩ ইং তারিখে  উক্ত অবৈধ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ০৬ মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুজ্জামান এবিষয়ে সুপ্রীম কোর্টে আপীল করলে আপীল বিভাগ তা খারিজ করে করে  হাইকোর্ট বিভাগকে বিষয়টি ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির আদেশ প্রদান করে।  যার প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ গত ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ ইং তারিখে  উক্ত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি অবৈধ ঘোষণা করে একটি পূর্নাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন এবং রায়ের নোটিশ প্রাপ্তির ৪ সপ্তাহের মধ্যে “আল ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদী” এর অধীনে বেসরকারী প্রবিধানমালা ২০০৯ এর ৪৯ ধারা মোতাবেক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রদান করেন।

কিন্তু প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুজ্জামান রায়ের নোটিশ পাওয়া সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠন না করে সময় ক্ষেপন করে হাইকোর্টের আদেশ অবমাননা করছেন। “আল-ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদী” এর চেয়ারম্যান এ.ওয়াই.এম আমিনুল ইসলাম এর পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুজ্জামানকে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠনের জন্য শিক্ষক ও অভিভাবক সদস্য মনোনীত করার লক্ষ্যে শিক্ষক ও অভিভাবক সদস্যদের নামের তালিকা চেয়ে বার বার পত্র প্রেরণ করা হলেও তিনি কোন জবাব প্রদান করেন নাই ৷

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতারক প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুজ্জামান হাইকোর্টের রায়ের পরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড ময়মনসিংহে “আল-ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদী” এর একটি ভূয়া কমিটি গঠনপূর্বক একটি তালিকা তৈরী করে ট্রাস্টের সকল সদস্যকে অনির্বাচিত দেখিয়ে তার মনগড়া একটি কমিটি করে সেখানে মোঃ মকবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান দেখান। অথচ ময়মনসিংহ শিক্ষাবোর্ডে গতবছর কমিটি অনুমোদনের জন্য পাঠানো তালিকায় তিনি “আল-ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদী” এর চেয়ারম্যান দেখান আব্দুল মোমেনকে। জালিয়াতি করতে গিয়ে প্রধান শিক্ষক নিজেই দুই জায়গায় দুই জন ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান দেখিয়েছেন। অথচ ট্রাস্টের প্রকৃত চেয়ারম্যান এ.ওয়াই.এম আমিনুল ইসলাম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে “আল ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদী” এর চেয়ারম্যান এ.ওয়াই.এম আমিনুল ইসলাম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমার বড় ভাই অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম আল ইসলাম ট্রাস্ট শ্রীবরদী প্রতিষ্ঠা করেন, আমি ফাউন্ডার জয়েন্ট সেক্রেটারী.  ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসেবে আমার বড় ভাই এতদিন স্কুলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তার শারিরীক অসুস্থতা ও বার্ধক্যজনিত কারনে তিনি অব্যহতি চাইলে ট্রাস্টের বিগত ০৭/০১/২০২৩ খ্রিঃ এর এজিএম সভায় তাকে অব্যহতি প্রদান করা হয় এবং আমাকে চেয়ারম্যান করে ট্রাস্টের কার্য্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। আমি দায়িত্ব গ্রহন করে বিগত ০৫/০৩/২০২৩ খ্রিঃ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে প্রবিধানমালা ২০০৯ এর ৪৯ ধারা মোতাবেক কমিটি গঠনের জন্য নির্দেশ প্রদান করি, কিন্তু প্রধান শিক্ষক ০৮/০৩/২০২৩ খ্রিঃ পত্রের মাধ্যমে আমার কাছে কিছু কাগজপত্র চায়। আমি বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করে প্রধান শিক্ষককে দিলেও সে তা প্রতিপালন না করে ভিন্ন একটি কমিটি যেখানে আব্দুল মোমেনকে ট্রাস্টের চেয়ারম্যান দেখিয়ে তার মনোনয়ন নিয়ে আব্দুর রহমানকে সভাপতি করে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে কমিটি অনুমোদনের জন্য আবেদন করলে শিক্ষাবোর্ড ১৭/০৪/২০২৩ একটি কমিটি অনুমোদন করেন। বিষয়টি আমি অবগত হওয়া মাত্রই শিক্ষাবোর্ডে লিখিত অভিযোগ দেই, তারা কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় হাইকোর্টে রিট করি, হাইকোর্ট উক্ত কমিটি  ৬ মাসের জন্য স্থগিত করে। স্থগিত থাকা স্বত্ত্বেও সেপ্টেম্বরে ওদের ১ জনের এমপিও আসে কিভাবে। পরবর্তীতে বিগত ২৩/০১/২০২৪ খ্রিঃ হাইকোর্ট উক্ত কমিটি অবৈধ ঘোষণা করেন এবং নোটিশ প্রাপ্তির ৪ সপ্তাহের মধ্যে আল ইসলাম ট্রাস্টের অধীনে ২০০৯ এর ৪৯ ধারা মোতাবেক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। প্রধান শিক্ষককে আমি বার বার কমিটি গঠনের জন্য শিক্ষক ও অভিভাবক সদস্য মনোনীত করার জন্য তাদের নামের তালিকা চেয়ে নোটিশ প্রদান করলেও সে কোন জবাব প্রদান করেন নি।সে হাইকোর্টের রায়কে কোন তোয়াক্কাই করছেন না, এবিষয়ে আমি ময়মনসিংহ শিক্ষাবোর্ডে অবহিত করলেও তারা এবিষয়ে এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

জানতে চাইলে “আল ইসলাম ট্রাস্ট, শ্রীবরদী” এর সেক্রেটারী এস.এম ফারুক আজাদ শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, প্রধান শিক্ষক প্রথমত ট্রাস্টের সাথে প্রতারণা করেছেন, তারপরে, জালিয়াতি করে বোর্ডে ভূল তথ্য দিয়ে কমিটির অনুমোদন নিয়ে বোর্ডের সাথেও প্রতারণা করেছেন। এখন আবার জালিয়াতি করে আল ইসলাম ট্রাস্ট শ্রীবরদীর একটি ভুয়া কমিটির তালিকা তৈরী করে শিক্ষা বোর্ডে জমা দিয়ে তিনি আবারো প্রতারণা করেছেন। বিশেষ করে হাইকোর্টের রায় অবমাননা করায় তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তাতিহাটি আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুজ্জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

জানতে চাইলে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ড. মোঃ দিদার হোসেন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন,  বিষয়টি যখন মহামান্য আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়। আমরা আদালতের রায় মোতাবেক দ্রুত ব্যবস্থা নেব।

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১১/০৮/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.