এইমাত্র পাওয়া

চট্টগ্রামের শাহী কমার্শিয়াল কলেজ: ৬১ বছর বয়সেও অধ্যক্ষ জিয়াউদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের প্রধানদের বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হলে দায়িত্ব ছাড়তে হবে। এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামো অনুসারে সহকারী প্রধান, উপাধ্যক্ষ বা জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের কাছে অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক পদের ভার ছাড়তে হবে। দায়িত্ব না ছাড়লে প্রতিষ্ঠান প্রধানের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের সুবিধা বাবদ প্রাপ্য টাকা বাতিল করা হবে। শিক্ষা প্রশাসনের এমন কঠোর নির্দেশনা থাকলেও ৬১ বছর বয়সে জোড়পূর্বক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের চেয়ার আঁকরে আছেন চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন নুর আহমদ সড়কে ১৯৬০ সালে গড়ে উঠা শাহী কমার্শিয়াল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন চৌধুরী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  শাহী কমার্শিয়াল কলেজে দীর্ঘ চব্বিশ বছর যাবত নেই অধ্যক্ষ। কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন শাহ মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন চৌধুরী।  তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষক নন। তবু তিনিই একাধারে ২৪ বছর যাবত চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটি গত ১৪ বছর ধরে চলছে এডহক কমিটি দিয়ে। এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামো (কারিগরি) অনুযায়ী, অধ্যক্ষ হতে হলে প্রভাষক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ১২ বছর এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে অধ্যক্ষ পদ শূন্য থাকলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হতে হলে নিয়োগপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ প্রভাষকই ভারপ্রাপ্ত হবেন।

প্রকৃতপক্ষে শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন চৌধুরী নিয়মবহির্ভূতভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে আসীন হলেও বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর শিক্ষক ডাটাবেইজে তিনি অধ্যক্ষ। ব্যানবেইসের শিক্ষক ডাটাবেইজে তার জন্ম তারিখ ১২ এপ্রিল ১৯৬৩ ইং এবং যোগদানের তারিখ ০১ জানুয়ারি ১৯৯৯ ইং। জন্ম তারিখ অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স ৬১ বছর ২ মাস ১ দিন।  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শুধু অধ্যক্ষ কিংবা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নয় যে কোন এমপিও, ননএমপিও শিক্ষকের বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করলে তার আর শিক্ষক পদে থাকার কোন সুযোগ নেই। তার স্বাক্ষর অকার্যকর।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, যেহেতু তিনি নন এমপিও শিক্ষক সরকারি কোন অংশ তিনি পাননা এমনকি অবসর ও কল্যাণ সুবিধাও তিনি পাবেন না তাই তিনি মন্ত্রণালয়ের কোন নির্দেশনা মানেননা। জোরপূর্বক তিনি এই পদ ধরে রেখেছেন। সকল কাগজপত্রে তিনি স্বাক্ষর করছেন। কমিটি জেনেও কোন ভ্রূক্ষেপ করছে না।

জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রতিবাদ করতে যেয়ে শাহ আলম নামে এক এমপিওভুক্ত শিক্ষক কলেজটিতে যেতে পারছেননা। ডিসি অফিস, বাংলাদেশ কারীগরি শিক্ষা বোর্ডে শিক্ষক শাহ আলম বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ দিলেও রহস্যজনক কারনে এসব অভিযোগের তদন্ত বা সুরাহা এখন পর্যন্ত হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০০ সালে কারিগরি এই কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটি ৫জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও মাত্র দু একজন কর্মচারী রয়েছে । তারমধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষক শাহ আলম ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের অনিয়মের কারনে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করে প্রতিষ্ঠানে আসতে পারছেন না।  আর বাকী ৪জন শিক্ষক, ১জন কম্পিউটার ল্যাব এসিস্ট্যান্ট ও ১জন টাইপিং ল্যাব দিয়ে ৩ শাখার কোর্স সমূহ পরিচালনা করছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। অসংখ্য পদে নিয়োগ না থাকায় ছাত্ররা পাচ্ছেনা সঠিক পাঠ। কলেজটির হিসাব বিজ্ঞান প্রভাষক ২০০০ সাল থেকে শুন্য, শাচিবিক বিদ্যা ২০১০ সাল থেকে শুন্য, গণিতের ২০১৮ সাল থেকে শুন্য, অফিস সহকারী, হিসাবরক্ষক, লাইব্রেরিয়ান, ল্যাব এসিটেন্ট, পিয়নের ২০০০ সাল থেকে শুন্য। এই পদগুলোতে কোন নিয়োগ দেয়া হচ্ছেনা। নয়ন রায় চৌধুরী নামে একজনকে নিয়োগ না দিয়েই একাউন্টিং ক্লাস করানো হয়। অথচ এমপিওভুক্তি শিক্ষকদের হাজিরা খাতায় তিনি প্রতিদিনের হাজিরা দেন। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলেও জোড়া তালি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন জিয়াউদ্দিন।

কলেজটির বেশ কিছু অডিট ও তদন্ত রিপোর্ট শিক্ষাবার্তা’র হাতে এসেছে। এরমধ্যে  ২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে কলেজটিতে অডিট করা হয় সেই অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের আগের কমিটির মেয়াদ শেষ, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ৬জন, সংরক্ষিত তহবিল, সাধারণ তহবিল, ভবিষ্যত তহবিল না থাকায় খোলার পরামর্শ দেন। নিয়োগ রেজিষ্টার, ছুটি রেজিষ্টার, ডেসপাচ রেজিষ্টার, ফাইল রেজিষ্টার ও সাবসিডিয়ারী রেজিষ্টার চালু ও সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।

ঐ প্রতিবেদনে দেখা যায়, শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, প্রভাষক মইন উদ্দিন, জিয়াউদ্দিনের স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়া নিয়োগ সংক্রান্ত কোন রেকর্ড পত্র প্রদর্শন করতে পারেননি। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে নিয়মিত অধ্যক্ষ নাই। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্য সুষ্ঠ ভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী কাম্য যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অধ্যক্ষ নিয়োগ দানের জন্য পরিচালনা কমিটিকে পরামর্শ দেয়া হয়।  ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন এবং প্রভাষক মইন উদ্দিন শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারেন নাই। অবিলম্বে শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল সনদ জেলা শিক্ষা অফিসারকে ও নিজ প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হয় ঐ প্রতিবেদনে।

এছাড়াও অভিযোগের প্রেক্ষিত ২০১০ সালে তদন্ত করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়, সেই প্রতিবেদনে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন চৌধুরীর অনিয়ম দুর্নীতি ও বিধিবহির্ভূতভাবে ভারপ্রাপ্ত পদে আসীন থাকার বিষয়টি উঠে আসে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে আজ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জিয়াউদ্দিন স্বপদে বহাল আছেন এবং প্রতিষ্ঠানটিতে ৬১ বছর বয়সেই সকল কাগজপত্রে স্বাক্ষর করছেন।

কিভাবে ৬১ বছর বয়সেও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন, করছেন স্বাক্ষর জানতে চাইলে নন এমপিও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন চৌধুরী শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমি কমিটির নির্দেশেই এই দায়িত্ব পালন করছি। আসলে প্রতিষ্ঠানটি আমার জায়গা (প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানটির জমি ওয়াকফ স্টেটের)। আমি প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া। যে মাধ্যমেই নিয়োগ পান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী ৬০ বছর অতিক্রম করলে পদে থাকার কোন সুযোগ নেই কিভাবে আরও এক বছর দুই মাস ধরে এই পদে আছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি কোন সুদত্তর না দিয়ে বলেন, এখন নিউজটা করেন না। ঈদের পরে কমিটির মিটিং আছে এরপর নিউজ প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত  জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ও কলেজটির এডহক কমিটির সভাপতি (ডিসির প্রতিনিধি হিসেবে) মোঃ সাদি উর রহিম জাদিদ এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান জানান তিনি মিটিংয়ে আছেন। এ বিষয়ে এখন কথা বলতে পারবেন না। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।

জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক জয়নুল আবেদিন জানান, বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করলে পদে থাকার কোন সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চলবে……

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৩/০৬/৩০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.