এইমাত্র পাওয়া

৩৮ মাস বেতন বন্ধ সরকারি চাকরিজীবী যমজ দুই ভাইয়ের

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

যমজ দুই ভাইয়ের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) লক করে রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এনআইডি লক রাখার কারণে ৩৮ মাস বেতন বন্ধ রয়েছে ঐ দুই ভাইয়ের। বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় সরকারি চাকরিজীবী দুই ভাই মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

আদালতের রায়েও বলা হয়েছে, ২০১০ সালের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইনের কোথাও কোন ধারায় জাতীয় পরিচয়পত্র পাসওয়ার্ড দিয়ে ব্লক করা যাবে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। তারপরও যমজ দুই ভাইয়ের এনআইডি ব্লক রাখা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থানার সন্তোষপুর ইউপির কুটি নাওডাঙ্গা (পূর্ব) এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আইনুল হকের দুই যমজ পুত্রের ক্ষেত্রে।

এই দুই ভাই হলেন মো. আনিসুর রহমান ও মো. আনিছুর রহমান (আজিজুল হক)। আনিসুর বর্তমানে অফিস সহায়ক হিসেবে বাংলাদেশ বেতারের রংপুরে কর্মরত আছেন। আর আনিছুর ওরফে আজিজুল বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাটে ওয়েম্যান হিসেবে কর্মরত আছেন।

জালিয়াতির অভিযোগ এনে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে দুই ভাইয়ের এনআইডি ব্লক রাখা হয়। এনআইডি ব্লক রাখার পর থেকে দুই ভাইয়ের বেতন বন্ধ করে দেয় সরকারি দুই প্রতিষ্ঠান। ইসির হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে যমজ দুই ভাই এখনো পর্যন্ত বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনিসুর রহমানের সার্টিফিকেট ও এনআইডি কার্ড ‘জালিয়াতি’ করে আজিজুল হক (আনিছুর রহমান) মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরি নিয়েছেন—এমন অভিযোগ এনে ২০২১ সালে জালিয়াতির মামলা করেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার তৎকালীন নির্বাচন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন।

একই সঙ্গে দুটি কার্ড নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে লক (বন্ধ) করে দেওয়া হয়। বিষয়টি হাইকোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়ালে তিন বিচারপতির বেঞ্চ বন্ধ থাকা এনআইডি দুটি খুলে দিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেন।

ইসির দাবি, ২০১৬ সালের ৭ জুন আজিজুল হক বড় ভাই আনিছুর রহমানের নাম, জন্ম তারিখ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং অন্যান্য কাগজ দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদন করেন এবং তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করেন।

বিষয়টি পরবর্তী সময়ে নজরে এলে আনিসুর রহমান ও আজিজুল হকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। যদিও আনিছুরের দাবি তিনি বড় ভাই আনিসুরের কোনো কাগজপত্র ব্যবহার করেননি। তার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত সন্তান সনদ, টিকা কার্ড, জন্ম সনদ দিয়ে তার নাম পরিবর্তন করেন। এর মধ্যে ২০২০ সালে যমজ বড় ভাই তার এনআইডিও সংশোধন করেন। আনিছুরের স্থলে আনিসুর করেন।

এদিকে নির্বাচন কর্মকর্তার দেওয়া মামলায় কুড়িগ্রাম জজকোর্টের সিনিয়র দায়রা জজ মো. আব্দুল মান্নান আনিসুর রহমান (এনআইডি নম্বর ১০১১৫০৮৩৯৫) এবং আজিজুল হকের (এনআইডি নম্বর ৮২২২৯৯২৩২৬) লকড রাখা কার্ড খুলে দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু জজ আদালতের ঐ আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আপিল করে ইসি।

উচ্চ আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৯ মার্চ বিচারপতি মো. আকরাম হোসেন চৌধুরী ও বিচারপতি শাহেদ নূরুদ্দীনের বেঞ্চ ঐ দুই ভাইয়ের আইডি কার্ড সচল করতে নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, কুড়িগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশনের সচিবকে নির্দেশ দেন।

বিষয়টি নিয়ে ইসি উচ্চ আদালতের রায়কে আবারও চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে যায়। সেই শুনানিতে অংশ নেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান (বর্তমান প্রধান বিচারপতি), বিচারপতি বোরহানুদ্দীন এবং বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দীক। শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১০ জুলাই হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগও। একই সঙ্গে এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্টদের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে আদালত। লক থাকা আইডি কার্ড খুলে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

মামলার আসামি আনিসুর রহমান বলেন, বিষয়টি পুলিশ সুপার নিজে তদন্ত করেছেন। প্রয়োজনীয় সব কাগজ তাকে দেখানো হয়েছিল। তিনিও আমাদের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। বিষয়টি নির্বাচন কর্মকর্তাকে সব খুলে বলার পরও তিনি আমাদের কথা না শুনে হয়রানি করেছেন।

এ বিষয়ে আনিসুর রহমানের আইনজীবী তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, এটা আদালত অবমাননার শামিল। আমরা নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছি। এখনো তারা কোনো উত্তর দেয়নি। আমরা বিষয়টি আদালতকে অবগত করব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির আইন শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা  বলেন, আদালত যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে সেভাবে আমরা এনআইডি লকড খুলে দিয়েছি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই ভাইয়ের সংশোধন হওয়ার আগের এনআইডির লক খুলে দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত এনআইডি খুলে দেওয়া হয়নি। ফলে তারা এখনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।ইত্তেফাক
শিক্ষাবার্তা ডট কম/জোমান/২০/০৩/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.