নিজস্ব প্রতিবেদক।।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (এওপিও) পদে পদোন্নতিতে সিনিয়রিটি নির্ধারণ নিয়ে ব্যাপক জটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রশাসনে এ সিনিয়রিটি নির্ধারণের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (এওপিও) পদে পদোন্নতি দেয়া হবে।
কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত সিনিয়রিটির তালিকা বিদ্যমান রয়েছে। বিদ্যমান সিনিয়রিটির তালিকা অনুসারে ১০ম গ্রেডের পদে ইতোপূর্বে কয়েক দফা পদোন্নতি প্রদান করা হলেও বর্তমানে নতুন করে সমন্বিত সিনিয়রিটি তালিকা প্রণয়ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের (প্রশাসন অধিশাখা) যুগ্মসচিব রিপন চাকমা নিয়োগবিধি লঙ্ঘন করে নিজেদের লোকজনদেরকে নিয়োগ প্রদান এবং পদোন্নতি ও সিনিয়রিটি নির্ধারণে তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য বিদ্যমান সিনিয়রিটি ভেঙ্গে নতুন করে সিনিয়রিটি করার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সংক্ষুব্ধরা।
এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে অর্ধশতাধিক কর্মচারী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু সেসব আবেদন আমলে না নিয়ে নতুন করে খসড়া সিনিয়রিটি তালিকা প্রকাশ করার জনপ্রশাসনের কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এছাড়া ইতঃপূর্বে কয়েক দফার মতো পদোন্নতি দেয়া না হলে মামলা করবে বলে জানিয়েছে প্রশাসনের কর্মচারীরা।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (এওপিও) পদে পদোন্নতিতে সিনিয়রিটি নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা থাকলে তা সমাধন করা হবে। এ সিনিয়রিটি নির্ধারণের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (এওপিও) পদে পদোন্নতি দেয়া হবে।কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত সিনিয়রিটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২০১৭ সালে কিছুসংখ্যক ৩য় শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের নিয়োগপত্রে মেধা অনুযায়ী সিনিয়রিটি নির্ধারণ করতে হবে মর্মে উল্লেখ করা হয় এবং যোগদানের জন্য ১ মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়। একই সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের আরো ৩ মাস পরে নিয়োগপত্র প্রেরণ করা হয়।
ফলে সিনিয়রিটি বিধিমালা ২০১০ অনুযায়ী সিনিয়রিটি তালিকা প্রণয়ন করতে নানাবিধ সমস্য সৃষ্টি হয়। তার প্রেক্ষিতে প্রশাসন অনুবিভাগ বিধি অনুবিভাগের সাথে পরামর্শক্রমে গত ২০২০ সালে মেধা অনুযায়ী সিনিয়রিটি তালিকা প্রণয়ন করে। যা চূড়ান্ত করে ১৪.০৯.২০২০ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। তালিকার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের কোনো আপত্তি, অভিযোগ কিংবা পরামর্শ না থাকায় এ তালিকা থেকে ২০১৭ সালে যোগদানকৃতদের একাংশকে পদোন্নতি প্রদান করা হয়।
পৃথক নিয়োগ বিধিতে নিয়োগপ্রাপ্ত কম্পিউটার অপারেটর পদ থকে ১ জন এবং ডাটা এন্ট্রি কন্ট্রোল অপারেটরদেরকে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি প্রদান করার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। কম্পিউটার অপারেটর থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির জন্য আবেদনকারী তার আবেদন উঠিয়ে নেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে এবং প্রয়োজনে লিখিতভাবে জমা দেওয়ার কথা বলার পরেও তা আমলে নেওয়া হচ্ছে না। কমিটি দীর্ঘসূত্রিতা অবলম্বন করে জানুয়ারি মাসে কয়েকটি সভার মাধ্যমে পরবর্তীতে ১৯ ফেব্রুয়ারি খসড়া সিনিয়রিটি তালিকা প্রকাশ করা হয়।
সভায় অধিকাংশ সদস্য বিদ্যমান সিনিয়রিটি ভেঙ্গে নতুন সিনিয়রিটি করার বিপক্ষে এবং ইতোপূর্বে এ ধরনের সমস্যা উত্তরণে গৃহীত পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে নতুন করে সিনিয়রিটি করার জন্য গঠিত কমিটির সভাপতি অতিউৎসাহী বলে অভিযোগ রয়েছে। সচিবালয়ের বিদ্যমান নিয়োগবিধিতে অজস্র অসঙ্গতি ও জটিলতা থাকায় এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পদোন্নতি নিয়ে জটিলতা লেগেই থাকে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবের সভাপতিত্বে গত ২০২৩ তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় অর্থ বিভাগের জন্য বিদ্যমান মেধাভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা বহাল রেখে আনুপাতিক হারে পদোন্নতি প্রদানের সুপারিশ করা হয়। যেখানে তৎকালীন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব অনুমোদন দিয়েছেন। একইভাবে আরও অনেক মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেও অনুরুপ মতামত প্রদান করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ সচিবালয় (ক্যাডার কর্মকর্তা এবং নন-গেজেটেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা-২০১৪ সংশোধিত ২০২০ এ ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ এবং ‘ব্যক্তিগত কর্মকর্তা’ পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় সুস্পষ্ট না থাকায় উক্ত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রশাসন অনুবিভাগ বিধি সংশোধনের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। সভায় সুপারিশ করা হয় এবং প্রশাসন অনুবিভাগে ইউ.ও. নোট প্রেরণ করা হয়।
এই সুপারিশের ২ বছর অতিক্রান্ত হলেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করে বরং বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলা হচ্ছে। এছাড়া সচিবালয় নিয়োগবিধি ২০১৪ প্রণয়নের সময় সাঁট মুদ্রাক্ষরিক পদধারীদের পদোন্নতির সুযোগ কম থাকায় অফিস সহকারী পদে মঞ্জুরীকৃত পদের অতিরিক্ত পদ সাঁট মুদ্রাক্ষরিক হতে পূরণ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যা নিয়োগবিধিতে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে।
তারপরও প্রশাসনিক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে সমন্বিত সিনিয়রিটি করার উদ্যোগ পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২য় ও ৩য় শ্রেণির কর্মচারীদের সংগঠনের এক নেতা বলেন, সিনিয়রিটি ভেঙ্গে নতুন করে করা হলে সবার কমবেশি ক্ষতি হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রহস্থ হবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীরা। আমরা আপত্তি জানিয়েছি।
তা না মানা হলে আদালতে মামলা করবো। ইতোপূর্বে গত ২০২২ সালেও অফিস সহকারী থেকে প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তার (এওপিও) শূন্যপদে পদোন্নতি দেওয়ার সময়ও মুক্তিযোদ্ধার কোটায় নিয়োগ প্রাপ্তদেরকে পদোন্নতি বঞ্চিত করার গভীর ষড়যন্ত্র করা হলেও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর (বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রী) হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় তারা রক্ষা পায়। সচিবালয় নিয়োগবিধি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও অন্যান্য কোটার তথ্য যাচাই করার সুষ্পষ্ট বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০১৭ সালে নিয়োগপ্রাপ্তের মধ্য হতে শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধার কোটায় নিয়োগ প্রাপ্তদেরকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ যাচাই করে নিয়োগ প্রদান করা হয়।
নিয়োগপ্রাপ্ত অন্যান্য কর্মচারীদেরকে কোন ধরনের যাচাই বাছাই না করেই নিয়োগ প্রদান করা হয়। মুক্তিযোদ্ধার সনদ ও অন্যান্য তথ্য ২০১৬ সাল থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত ও যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া এ ধরনের সমস্যা উদ্ভব হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের যাতে সিনিয়রিটির দিক থেকে এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য একই সাথে মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য কোটায় নিয়োগ প্রাপ্তদেরকেও নিয়োগ প্রদান করে যাচাইয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করার জন্য ২০১৪ সালের এক অফিস স্মারকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগের সচিব পত্র প্রদান করা হয়।
এখানে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কোনো অপশক্তি কাজ করছে কিনা তা খূঁজে দেখার জন্য উক্ত কর্মচারী পরামর্শ দেয়া হয়। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের (প্রশাসন অধিশাখা) যুগ্মসচিব রিপন চাকমার সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশিক্ষণে রয়েছেন। এর বাহিরে বক্তব্য দিতে পারবে না বলে জানান।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১১/০৩/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
