সুনামগঞ্জঃ চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রতারগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ও রতারগাঁও মাদ্রাসা এলাকার শিক্ষার্থী সুমাইয়া বেগম। ভাইবোনের পাঁচজনই কমপক্ষে এসএসসি পাস করেছে। তবে সুমাইয়ার পড়ালেখা এগিয়ে যাওয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে শঙ্কা।
জানা যায়, গত বছর পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয় সুমাইয়া। ভর্তি হওয়ার জন্য অন্যদের চেয়ে কয়েকদিন পরে স্কুলে গিয়ে জানতে পারে, তার আর ভর্তি হওয়ার সুযোগ নেই। বাড়ির পাশের মাদ্রাসায়ও একই অবস্থা। এখনও তার ভর্তির কোনো সুরাহা হয়নি।
সরকারি বিধান অনুসারে ভর্তির নির্ধারিত কোটার নিয়ম মানতে গিয়ে সুমাইয়ার মতো ভাগ্য বিড়ম্বনায় পড়েছে হাওরাঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী।
রতারগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহসিন আহমদ ইয়াছিন জানান, এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কিছু করার নেই। সরকারি নির্দেশনা মানতে হবে। সরকারি নির্দেশনা অনুসারে তিন শাখায় ১৬৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করেছেন তারা। আরও ৩১ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে এসেছিল। তাদের ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।
সুমাইয়ার ভাই শাকিল জানান, তার বোনটির পড়াশোনা হবে না আর। অন্য কোথাও নিয়ে পড়াশোনা করানোর ক্ষমতাও নেই তাদের।
জামালগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিধান চক্রবর্তী জানান, প্রতিবছর ২২৫ থেকে ২৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করেন তারা। এবার করেছেন ১৬৫ জন। তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে ফিরে আসা ৭০ থেকে ৭৫ জন শিক্ষার্থী কোথাও ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। কেউ কেউ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছে। বেশির ভাগই ড্রপআউট হবে। এই নীতিমালা মানতে গিয়ে বিদ্যালয় আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন বিষয়টি।
শান্তিগঞ্জের পাগলা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সদ্য বিদায়ী প্রধান শিক্ষক রমিজ উদ্দিন জানান, দুই সেকশনে তারা ১১০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করেছেন। ভর্তি হওয়ার জন্য ঘুরছে ৩৫০ জন। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত তারা। সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের ডিও লেটারসহ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজি বরাবর আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, হাওর এলাকায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে স্কুল আছে, ওখানে এই আদেশ শিথিল করা জরুরি। তবে কোনো উত্তর বা নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এ সিদ্ধান্তটি হাওর এলাকার জন্য যুক্তিযুক্ত নয় বলে মন্তব্য করেন সদ্য বিদায়ী এই প্রধান শিক্ষক। এলাকার বিশিষ্ট এই শিক্ষক আরও জানান, শহর এলাকায় বা ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা যেখানে আছে, সেখানে এক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলে আরেক বিদ্যালয়ে গিয়ে ভর্তি হওয়া যায়। হাওরাঞ্চলে সেই সুযোগ নেই। এতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ভয়াবহভাবে বাড়বে।
পলাশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইকবাল হোসেন জানান, তাঁর বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরিপত্র মেনে তিনটি শাখায় ১৬৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। ভর্তি হতে আগ্রহী ৮২ জন এখনও ঘুরছে। তারা ভর্তির সুযোগ না পাওয়ায় ষষ্ঠ শ্রেণির বইও পায়নি।
শহরের এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ২০-৩০ জন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার জন্য অভিভাবকরা এখনও বিদ্যালয়ে ঘুরছেন। তবে পরিপত্র অনুযায়ী তাদের ভর্তির সুযোগ নেই। চার সেকশনে ২২০ শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়েছেন তারা।
শিক্ষকরা জানান, গত ২৩ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের
যুগ্ম সচিব জহিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পরিপত্রে জানানো হয়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে প্রতি সেকশনে ৫৫ জনের বেশি নেওয়া যাবে না। এই নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটানো হলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পাঠদানের অনুমতি বা একাডেমিক স্বীকৃতিসহ প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি বাতিল করা হবে।
একাধিক প্রধান শিক্ষকের দেওয়া তথ্যমতে, সুনামগঞ্জ জেলায় ২৩৩টি মাধ্যমিক স্কুল ও ৯২টি দাখিল মাদ্রাসার বেশির ভাগেই ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বিদ্যালয়ে ২০ জন করে হিসাব করলেও এ জেলায় কমপক্ষে ছয় হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি বঞ্চিত হয়েছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, জেলা প্রশাসক এই বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, সেকশন বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। তবে এখনও এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
জেলা প্রশাসক রাশেদ ইকবাল চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে কথা হয়েছে। তারা বলেছেন, সেকশন সংখ্যা বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা আসেনি। বিষয়টি নিয়ে আবারও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসবেন। সমকাল
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৬/০২/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
