ঢাকাঃ সারাদেশে অনুমোদনবিহীন হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধের অভিযান চলছে। যশোরে আরো দুই হাসপাতাল বন্ধ, চার মালিককে জরিমানা করা হয়েছে। ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি ও নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় বরগুনার সুন্দরবন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিককে গ্রেফতার করেছে র্যাব-২। হাসপাতালের মালিক বামনা উপজেলার ডৌয়াতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
এ ছাড়া গোপালগঞ্জে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিকে জরিমানা করা হয়েছে। এর আগে গত চার দিনে চাঁদপুর, নোয়াখালী, যশোর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করা হয়েছে।
সারা দেশে নিবন্ধনহীন হাসপাতাল বন্ধের কার্যক্রম শুরু করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সারা দেশের সব বিভাগীয় পরিচালক স্বাস্থ্য, সব জেলার সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের নিবন্ধনহীন হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, সারা দেশের অনিবন্ধিত হাসপাতালের তালিকা চেয়েছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন অনিবন্ধিত হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশনার আলোকেই দেশের নিবন্ধনহীন হাসপাতাল বন্ধ করা হচ্ছে। এটা একটা রুটিন ওয়ার্ক। ঢাকায় এখনো এই কার্যক্রম শুরু হয়নি।
যশোরের চৌগাছায় স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযানে লাইসেন্স না থাকায় পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নোভা এইড ও মধুমতি প্রাইভেট হাসপাতাল নামে দুটি বেসরকারি হাসপাতালকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া অনুমতির অতিরিক্ত রোগী ভর্তি, ভঙ্গুর অবকাঠামো, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, সার্বক্ষণিক পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স না থাকা, হাসপাতালে ফ্রিজে ওষুধের সাথে নরমাল খাবার রাখাসহ নানা অভিযোগে ৪টি বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
নোভা এইড হাসপাতাল ও মধুমতি প্রাইভেট হাসপাতাল পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। একইসাথে নোভা এইডে ২০ শয্যার অনুমতি নিয়ে ১৬টি বেড এবং ১০টি কেবিন পরিচালনাসহ অধিক সংখ্যক শয্যা পরিচালনা করা, অভিযানকালে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও নার্স না থাকা, হাসপাতালের ফ্রিজে ওষুধের পাশাপাশি নরমাল খাবার রাখার অভিযোগে ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং মধুমতি হাসপতালে ১০ শয্যার অনুমতি নিয়ে অধিক শয্যা পরিচালনা করা, সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এছাড়া পল্লবী ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১০ শয্যার অনুমতি নিয়ে ১৫-১৬টি শয্যা পরিচালনা করা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা প্রদান, সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও নার্স না থাকার অভিযোগে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং মায়ের দোয়া প্রাইভেট হাসপাতালে ভঙ্গুর অবকাঠামো, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা প্রদান, ১০ শয্যার অনুমতি নিয়ে অধিক শয্যা পরিচালনা করা, সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও নার্স না থাকা এবং চিকিৎসা প্রদানের হিসাব না দিতে পারায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, অভিযানকালে প্রায় সবকটি হাসপাতালের ফ্রিজেই দেখা গেছে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সাথে সাধারণ খাবার রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোছা. লুৎফুন্নাহার বলেন, হাসপাতালগুলোতে নানা অনিয়ম দেখা যায়। লাইসেন্স নবায়ন না থাকায় দুটি হাসপাতাল পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ এবং চারটির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুস্মিতা সাহা বলেন, অভিযানে দুটি বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ এবং চারটির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে। তিনি বলেন এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
আমাদের বরগুনার সংবাদদাতা জানান, গত ১৫ জানুয়ারি বিকেলে উপজেলার উত্তর রামনা গ্রামের মো. রফিকুল ইসলামের স্ত্রী প্রসূতি মেঘলা আক্তারকে ভর্তি করানো হয়। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সবুজ কুমার দাস, পরিচালক মো. রেজাউল ইসলামসহ পাঁচ থেকে ছয়জন মিলে প্রসূতি মেঘলা আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশন শুরু করেন। রাত পৌনে ১১টায় অপারেশন থিরিটারে অপারেশনের সময় প্রসূতি মেঘলা আক্তার ও নবজাতকের মৃত্যু হয়। এরপর হাসপাতালের মালিক, ডাক্তার ও নার্সসহ সব স্টাফরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ১৬ জানুয়ারি প্রসূতি মেঘনার বাবা ছগির হোসেন বামনা থানায় ডাক্তার সবুজ কুমার দাসকে প্রধান আসামি করে হাসপাতালের তিন মালিকসহ আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
র্যাব-২ এর একটি দল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে হাসপাতালের মালিক মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বামনা উপজেলার ডৌয়াতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকায় অবস্থিত ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি বন্ধ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। কোনো নিবন্ধন ছাড়াই চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি।
ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু আয়ান আহমেদের (৫+ বছর) মৃত্যুতে তার বাবার অভিযোগের প্রেক্ষিতে অধিদফতরের পরিচালকের (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) নেতৃত্বে ১০ জানুয়ারি হাসপাতালটি পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনকালে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইসেন্স দেখাতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া দফতরের অনলাইন ডাটাবেজ পর্যালোচনা এবং পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা যায় যে, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নামে কোন প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিকট নিবন্ধন/লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য কখনোই অনলাইন আবেদন করেনি।
পাঁচ বছর বয়সী আয়ানকে খতনা করানোর জন্য গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার সাঁতারকুল এলাকার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল তার পরিবার। অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর আর জ্ঞান ফেরেনি তার। পরে তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গত ৭ জানুয়ারি সেখানেই মৃত্যু হয় শিশুটির।
১৯৮২ সালের মেডিকেল অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনেস্টিক সেন্টার চালানোর সুযোগ নেই। করোনা মহামারীর মধ্যে ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসার নামে প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনা উদঘাটিত হওয়ার পর জানা গিয়েছিল, অনুমোদন ছাড়াই চলছিল ওই হাসপাতাল। ২০২০ সালের নভেম্বরে ঢাকার আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে বরিশাল মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর জানা যায়, ওই হাসপাতালও সেবা দেওয়ার অনুমোদন পায়নি।
এরপর সারা দেশে অনুমোদিত এবং অনুমোদনহীন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠাতে বিভাগীয় পরিচালকদের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। বিভাগীয় কার্যালয়গুলো পাঠানো তথ্য নিয়ে লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একটি তালিকা তৈরি করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ওই তালিকায় সারা দেশের ১১ হাজার ৯৪০টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের নাম আসে, যারা স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদন এবং যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২১/০১/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
