ফরিদ আহমেদঃ সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় উঠেছে আমাদের নতুন শিক্ষা কারিকুলম সম্পর্কে। অভিযোগকারীদের অভিমত- আমাদের সন্তানদেরকে স্কুলে পাঠাচ্ছি তাদের কাজের বুয়া বানানোর জন্য নয়। সমালোচকরা এটা স্বীকার করেন শিক্ষা হওয়া উচিত মজাদার ও আনন্দের। আর ডিম ভাজি করা একটি মজাদার বিষয় ভেবে কি কারিকুলামে ডিমভাজিও যোগ করা হয়েছে? না, আসলে তা নয়। তাদেরকে চা বানানো শেখাতে, ভাত রান্না করা শেখাতে কারিকুলামে ঐসব বিষয় যুক্ত করা হয়নি। না জেনে না বুঝে এসব সমালোচনা করা হচ্ছে। আমার সন্তান অনুরূপ একটি শিক্ষা কারিকুলামে পড়াশোনা করেছে। আমার কাছের কিছু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ঐ শিক্ষা কারিকুলামে পাঠদান করে যাচ্ছেন। আর সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমি আজকের এই লেখাটি উপস্থাপন করছি।
এ কথা তারা মানতে রাজি, শিক্ষা হবে প্রয়োগমুখী বা বাস্তব জীবনের উপযোগী। তবে পরীক্ষাবিহীন শিক্ষা ভাবতেই যেন শিহরিত হয়ে ওঠেন তারা। একসময় অবশ্য আমিও এই আতঙ্কে ছিলাম। তখন মনে হতো- আমার সন্তান কিছু শিখছে তো! আজ সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে; সেখানে সে যে ফলাফল অর্জন করছে তাতে আমি সন্তুষ্ট। পরীক্ষার ভীতিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে সরকারের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাতে তাদের কষ্ট হচ্ছে যেমনটি আমারও হয়েছিল। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য তা নয়, তারকাখচিত একটি নম্বরপত্রী কামনা তখন আমার মাঝেও বিদ্যমান ছিল। আজ আমার ধারণা বদলেছে এবং আজ আমি আমার আপত্তি সেই নম্বরপত্রী ও সনদপত্রভিত্তিক শিক্ষার অবসানকল্পে যারা অবস্থান নিয়েছেন তাদের সমালোচনা-পর্যালোচনাতে।
আমরা ছোটোবেলায় পড়েছি পানির তিনটি অবস্থা। এটি বিজ্ঞানের বিষয়। পানি ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বাস্প হয়। সে বাষ্প দিয়ে ইঞ্জিন চালানো হয়। সেই ইঞ্জিন দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। আর বিদ্যুৎ আমাদের আলো বাতাস যেমন দিয়ে থাকে তেমনি আমাদের রান্না-বান্না করতেও বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়।
ডিম-এর সাদা অংশ কী এবং হলুদ অংশ কী এবং এসবের গুণাগুণ আমাদের জানা প্রয়োজন। ডিমভাজি আর ভাত রান্না কেবল কাজের বুয়া বানানোর শিক্ষা নয়। এখানে মূলত বিজ্ঞান বিষয়টিকেই শেখানো হবে।
আমরা আরও একটি গল্প পড়েছি- যেখানে লেখা হয়েছে কীভাবে পানির স্রোতধারকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। সেদিন পানির স্রোত সম্পর্কে হয়তো গভীর জ্ঞান অর্জন করিনি- তবে নদী ও নদীভাঙন গবেষণায় স্রোত সম্পর্কিত সেই জ্ঞান আমাদের নিশ্চয়ই অনেক কাজে আসছে। ব্যাবহারিক ক্লাসে পানিতে কৃত্রিম স্রোত সৃষ্টি করে স্কুলগুলোতে শিক্ষকরা যখন পাঠদান করবেন তখন আমাদের সমালোচক-অভিভাবকরা হয়তো খেলা মনে করবেন। বিষয়টি আসলে দৃষ্টিভঙ্গিগত।
অনুরূপভাবে কৃষক-মালি-চাষা বানাতে গাছ লাগানো শেখানো হবে না। তাদেরকে মেকানিক্স বানাতে ইঞ্জিন নিয়ে শেখানো হয় না। আমরা বিজ্ঞান ক্লাসে ব্যাঙ কেটেছি, কেঁচোর স্নায়ুতন্ত্র খুঁজেছি, তেলাপোকার পরিপাকতন্ত্র দেখেছি বিজ্ঞান শেখানোর জন্য এবং আগামীতে ডাক্তার হব সেই স্বপ্ন থেকে এসব করেছি।
আমরা খুব করে বলি আমাদের শিক্ষার উন্নতি হয়েছে। আজ কারিকুলাম নিয়ে যে মতবিরোধ ও ঝগড়া করা হচ্ছে সেটা বলছে আমাদের শিক্ষার মান বাড়েনি, বরং কমেছে।
যখন ভাত রান্না করা হয় তখন ঢাকনা নড়তে থাকে। এরপর সেখান দিয়ে বাষ্প উঠে। সেটা দেখে কীভাবে গতি সৃষ্টি হয় সেটা শিখতে পারে একজন শিশু। সেটাকে বিজ্ঞানের আলোকে শিক্ষক শেখাবেন তাতে কোনো ত্রুটি নেই। আশা করি সমালোচকরা বিষয়টি বুঝবেন।
শিক্ষক-ছাত্রের খেলা কেবল খেলা নয়। ভিটগেস্টিনের ভাষাবিজ্ঞান যাদের জানা আছে তারা ভাষা নিয়ে খেলা বলতে কী বোঝায় তা ভালো করেই জানেন। এ সময়ে আমার এমিরিটাস অধ্যাপক প্রয়াত আব্দুল মতীন স্যারকে মনে পড়ছে। স্যারের সঙ্গে বাসে বসে ক্যাম্পাস থেকে ঢাকা ফিরছিলাম। সেদিন তিনি একটি গল্প বলেছিলেন। তিনি বললেন- ঐ যে নদী, ঐ যে ধান খেত, ওই যে মাঠ সবই আমি তোমাকে দিলাম। তবে তুমি সেটা বেচতে, ভোগ করতে বা দান করতে পারবে না। স্যারের ওই কৌতুক ছিল ভিটগেনস্টাইনের ভাষাদর্শন বোঝাতে। গল্পে গল্পে খেলা। খুবই মজাদার খেলা। স্যার আমাকে কিছু শেখাতে চেয়েছিলেন। সুতরাং, নতুন শিক্ষা কারিকুলাম-এর মর্মার্থটা কী সেটা বুঝতে হবে।
কিছু ব্যাঙ্গাত্মক ভিডিও আমরা দেখছি কারিকুলামের সমালোচনায়। সেটাকে আমরা বেশ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করছি। আমরা যে অপরের কিংবা কোনো বিষয়ের সমালোচনা করায় সেরা, সেটা আর বলবার অপেক্ষা রাখে না। সমালোচনা আমি করবার বিপক্ষে নই, তবে সমালোচনা আসতে হবে ঐ বিষয়ের অভিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। কিন্তু সেটা কি হচ্ছে? একটি আদর্শ আমাদের থাকা প্রয়োজন। সেটা হয়তো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। কিন্তু আমরা চেষ্টা করতে পারি। একজন মানুষের জীবনে যেসব মৌলিক জ্ঞান লাগে তার সবই শেখানো হবে নতুন পদ্ধতিতে। ‘পরীক্ষা নেই’, ‘পরীক্ষা নেই’ বলে চিৎকার করা কি ঠিক? শিক্ষার্থীরা সারা বছর ধরেই শিখবে এবং তারা ঐ আগের মতো হয়তো বাৎসরিক পরীক্ষা আর দেবে না। আমি অভিজ্ঞতার আলোকেই বলছি- নতুন শিক্ষা কার্যক্রম একটি মহতী উদ্যোগ। তাকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত।
নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে দর্শনের এক শিক্ষার্থী কঠোর সমালোচনা করেছেন। অপরদিকে আরেক দর্শন শিক্ষার্থী জনাব আবুল খায়ের লিখেছেন- ‘নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের মাঝে এই ১০টি যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করা হয়েছে। এই গাইড লাইন অনুযায়ীই পাঠ্যবই প্রণয়ন করা হচ্ছে।’ তিনি সেই দশটি বিষয়ের বিবরণ দিয়েছেন। সেগুলো হলো:
১. অন্যের মতামত ও অবস্থানকে সম্মান ও অনুধাবন করে, প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নিজের ভাব, মতামত যথাযথ মাধ্যমে সৃজনশীলভাবে প্রকাশ করতে পারা।
২. যেকোনো ইস্যুতে সূক্ষ্মচিন্তার মাধ্যমে সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে সকলের জন্য যৌক্তিক ও সর্বোচ্চ কল্যাণকর সিদ্ধান্ত নিতে পারা।
৩. ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে সম্মান করে নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক হয়ে নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শনপূর্বক বিশ্ব নাগরিকের যোগ্যতা অর্জন করতে পারা।
৪. সমস্যা প্রক্ষেপণ, দ্রুত অনুধাবন, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ তাৎপর্য বিবেচনা করে সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে যৌক্তিক ও সর্বোচ্চ কল্যাণকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধান করতে পারা।
৫. পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্মান ও সম্প্রীতি বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারা।
৬. নতুন দৃষ্টিকোণ, ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগের মাধ্যমে নতুনপথ, কৌশল ও সম্ভাবনা সৃষ্টি করে শৈল্পিকভাবে তা উপস্থাপন এবং জাতীয় ও বিশ্বকল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারা।
৭. নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ে নিজ অবস্থান ও ভূমিকা জেনে ঝুঁকিহীন নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং বৈশ্বিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ তৈরি করতে ও বজায় রাখতে পারা।
৮. প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পারা এবং নিরাপদ, সুরক্ষিত জীবন ও জীবিকার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে পারা।
৯. পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে দৈনন্দিন উদ্ভূত সমস্যা গাণিতিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা ব্যবহার করে সমাধান করতে পারা।
১০. ধর্মীয় অনুশাসন, সততা ও নৈতিক গুণাবলি অর্জন এবং শুদ্ধাচার অনুশীলনের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারা।
এগুলো অনুধাবন করতে আমাদের সময়ের প্রয়োজন। সেই সময় না দিয়ে আমরা যে পরিমাণে সমালোচনায় ঝাঁপিয়ে পড়েছি তা বলে শেষ করা যাবে না। যারা সমালোচনা করছেন তারা উপরিউক্ত ১০টি মৌলিক বিষয় বুঝতে চেষ্টা করবেন তারপর সমালোচনার ঝুড়ির ঝাঁপি খুলবেন। তাহলেই আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করে আনন্দ পাবো।
আমি লেখাটি সম্পন্ন করবার আগে বিজ্ঞ অধ্যাপকদের লেখা ও সাক্ষাৎকারগুলোকে পড়েছি ও বুঝতে চেষ্টা করেছি। তাদের কথার মাঝে কিছু আশঙ্কা আছে। সেগুলোকে আমরা বিবেচনায় নিয়ে সতর্কভাবে অগ্রসর হতে পারি। সেসব সমালোচনা খুবই নির্দয়ভাবে করা হয়েছে। তার সঙ্গে প্রোপাগান্ডা যুক্ত করে একটি ভালো কাজকেও বিতর্কিত করে দেয়া হচ্ছে। আমার মনে হয় এসব বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণে আমাদের শিক্ষার আমূল পরিবর্তনের স্বপ্নকে স্বাগত জানাতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৯/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
