শিশির ভট্টাচার্য্য: নতুন শিক্ষাক্রমের বিরুদ্ধে পঞ্চম অভিযোগ এই শিক্ষাক্রমে বিজ্ঞান কম পড়ানো হবে যখন কিনা ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষাক্রমে বিজ্ঞান আগের মতোই ‘বেশি/উপযুক্ত পরিমাণে’ পড়ানো হবে। সুতরাং শিক্ষার্থীরা ইংলিশ মিডিয়ামকেই বেছে নেবে। এটা ইংলিশ মিডিয়ামকে অধিকতর জনপ্রিয় করানোর একটা আওয়ামী ধান্দা। সরকার এই শিক্ষাক্রম চালু করছে। কারণ মন্ত্রী-সচিবদের সন্তানেরা যেহেতু বাংলা মিডিয়ামে পড়ে না। সেহেতু বাংলা মিডিয়ামে বিজ্ঞান কম পড়ানো হলে তাদের কিছু যায় আসে না। তার উপর কম বিজ্ঞান পড়ে হাভাতে জনগণ পিছিয়ে পড়বে এবং মন্ত্রী-সচিবদের ছেলেমেয়েরা তরতরিয়ে এগিয়ে যাবে।
শিক্ষাক্রমের সিলেবাসে কী আছে বা নেইÑএই বিচার করে শিক্ষার্থীরা মিডিয়াম বেছে নেয় কিনা বা নেবে কিনা সেটা গবেষণাসাপেক্ষ। ইংলিশ মিডিয়ামে যারা পড়ে, প্রাণ গেলেও তাদের পিতামাতারা নিজেদের সন্তানকে বাংলা মিডিয়ামে পড়াতে চায় না।
এর সঙ্গে স্ট্যাটাস কিছুটা যুক্ত। আমি যখন নব্বইয়ের দশকে আমার ছেলেকে ইউনিভার্সিটি ল্যাবোরেটরি স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম, তখন সহকর্মীরা আমাকে বলেছিলেন, ‘দারোয়ানের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশতে দিয়ে ছেলের ভবিষ্যৎ আপনি নষ্ট করে দিচ্ছেন। আপনার ছেলেতো ওখানে বিশ্রী গালাগালি শিখবে! কমপক্ষে উদয়নে দিতে পারতেন।’ আমি যে শহরেই থেকেছি, ঢাকা-প্যারিস-মন্ট্রিয়ল, আমার ছেলেকে আশেপাশের সরকারি স্কুলে ভর্তি করেছি। এতে আমার অর্থ ও সময়ের সাশ্রয় হয়েছে এবং অন্য অনেক কিছুর মতো আমার ছেলে ভালো গালাগালিও শিখেছে বটে। গালাগালি ভাষার ভোকাবুলারির অংশ এবং জীবনের খুবই দরকারি একটা যন্ত্র বা টুল। মনে যখন রাগ থাকে, সেই রাগ ঝাড়ার জন্য যুৎসই গালি দিয়ে দারুণ এক শান্তি পাওয়া যায়। গালি দিতে যারা শেখেনি, তাদের ‘ক্যাথারসিস’ হয় না বলে তারা বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগার সম্ভাবনা থাকে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি বড় অংশ তাদের সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়ামে পাঠান, কারণ তাদের পরিকল্পনাই থাকে, দেশে নয়, তাদের সন্তান পড়বে বিদেশে। সুতরাং প্রথমত, ইংরেজি ভাষার ভিত পাকা হওয়া অপরিহার্য এবং অন্যান্য বিষয়ের ভিতও ইংরেজি ভাষাতেই পাকা হওয়া শ্রেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বাংলাদেশের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর গুণগত গবেষণা করলেই এই প্রবণতাটা পরিষ্কার হবে। এই মানসিকতা নতুন নয়, মধ্যযুগে ইউরোপে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার শুরু থেকেই এমনটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে: শিক্ষাক্রমে যাই থাক, জনগণের এলিট বা অভিজাত অংশ তাদের সন্তানদের ছোট লোকের বাচ্চাদের সঙ্গে পড়াতে চায় না, চাইবে না। আশার বিষয়, কেনিয়া আর দিল্লিতে নাকি এই প্রবণতা বদলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
লেখক: ভাষাবিজ্ঞানী।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২০/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
