এইমাত্র পাওয়া

যৌন-প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত বস্তির কিশোরীরা

নিউজ ডেস্ক।।

কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দিতে সারাদেশে ১২শর বেশি অ্যাডোলোসেন্ট কর্নার তথা কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র করেছে সরকার। প্রজনন স্বাস্থ্য পরামর্শ, মাসিক ব্যবস্থাপনা, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাউন্সেলিং এবং পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণের গুরুত্ব বোঝানোই এসব কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য। শহর থেকে গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা এসব সেবা সহজে পেলেও বঞ্চিত ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা তথা বস্তিতে বসবাসকারীরা

বস্তিতে থাকা স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ধারণা পেলেও শিক্ষার বাইরে থাকা কিশোরীদের ভরসা এখনো মা, দাদি, বোন ও প্রতিবেশী। সঠিক জ্ঞান না থাকায় যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য গুরুত্ব পাচ্ছে না কিশোরী ও অভিভাবকদের কাছে। হাতের নাগালে সরকারি কোনো কার্যক্রম না থাকায় সংকট আরও বাড়িয়েছে। ফলে বাল্যবিয়ে এবং ১৯ বছরের আগেই গর্ভধারণ সেখানে স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে বসবাস করা পরিবারের সঙ্গে থাকছে পান্না আক্তার। বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৮ম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী জানান, ‘কখন মাসিক শুরু হবে, হলে কী করতে হবে, কীভাবে চলতে হবে তা জানতে আমাদের এখানে কোনো ক্লিনিক নেই। হাসপাতাল অনেক দূরে। প্রথম জেনেছি স্কুলের ম্যামের কাছে। এখন স্কুল থেকে বছরে একটামাত্র স্যানিটারি প্যাড দেয়। বাকিগুলো নিজেকে কিনতে হয়।’

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পান্না প্রাথমিক ধারণা পেলেও সেই সুযোগও হয়নি একই বস্তিতে বসবাস করা ষোলো বছরের বৃষ্টির। কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। সবেমাত্র কৈশোরে পা দিলেও তার কোলে এখন এক বছরের মেয়ে নিলুফা।

বৃষ্টি জানায়, ‘বড় বোনের কাছ থেকে প্রথম মাসিক সম্পর্কে জানতে পারেন। মাসিকের সময়ে পেট ব্যথা করলে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে খান। কখনো প্যাড ব্যবহার করেননি। এতে করে বিভিন্ন সময়ে নানা জটিলতা দেখা দেয় বলেও জানায় বাল্যবিয়ের শিকার এই কিশোরী।

বৃষ্টি বলছে, ‘মাসিক ব্যবস্থাপনা ও প্রজনন সেবা কোথায় নেওয়া যায় পরিবারের কেউই জানে না। এখানে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকায় কোথাও যাওয়া হয়নি।’

শুধু এ দুই কিশোরী নয়, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে বস্তিতে বসবাসকারী অধিকাংশ কিশোরীর ধারণা নেই। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বলছে, বস্তিতে বসবাসকারী কিশোর-কিশোরীদের ৪২ শতাংশের কাছে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাচ্ছে না। ৩০ শতাংশ কিশোরী জানে না তাদের মাসিক কখন শুরু হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আরও ১৭টি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, প্রজননস্বাস্থ্য, পুষ্টিসেবা, মাসিক ব্যবস্থাপনা ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করছে এসব বিভাগ। পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস সরকার, জাতিসংঘের উন্নয়ন তহবিল তথা ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ দেশি বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে।

ঢাকার ঘন বসতিপূর্ণ ৩০টি ওয়ার্ডের ১০০টি এলাকায় রি-প্রোডাক্টিভ হেলথ নিয়ে কাজ করছে সিরাক- বাংলাদেশ। স্থানীয় সরকারের ‘আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিস ডেলিভারি প্রোগ্রামের’ (ইউপিএইচসিএসডিপি) অধীনে মোহাম্মদপুর, উত্তরা এবং উত্তর ও দক্ষিণখানের মতো ঘন বসতি এলাকগুলোতে ‘ইম্প্রুভিং এসআরএইচআর ইন ঢাকা’ কর্মসূচি চালু রয়েছে সিরাকের।

এই কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার তাসনিয়া আহমেদ বলেন, ‘সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকাগুলোতে ৪৬ লাখ কিশোরী বসবাস করে, যার মধ্যে বস্তি ?ও নিম্নআয়ের কিশোরীরাও আছে। বস্তি এলাকার মানুষ অনেক কিছু এড়িয়ে যায়। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কিশোররা তো নেয়ই না, কিশোরীদের মূল উৎস মা-বোন। তাদের মাঝে সচেতনতার অভাব অনেক বেশি। অনেকে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়, মাদকাসক্ত ও অন্য অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে। তবে প্রধান কারণ হলো- সঠিক জায়গা থেকে সঠিক তথ্য না পাওয়া।’

২০২২ সালে প্রকাশিত আরবান হেলথ সার্ভের তথ্য বলছে, গ্রামে বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি বলা হলেও অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের হার বস্তিতে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে ১৫ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে গর্ভধারণের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে বস্তিতেই ২২ দশমিক ১ শতাংশ। যা গ্রামাঞ্চলের ১০ দশমিক ৯ শতাংশের দ্বিগুণ। এ ছাড়া শহরাঞ্চলে এই হার ২০ দশমিক ৩ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের গবেষণা দলের প্রধান ড. কামরুন নাহার বলেন, ‘সরকারের নানা কর্মসূচির ফলে কৈশোরকালীন সেবার হার বেড়েছে। যদিও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছেনি। বিশেষ করে বস্তিতে এখনো পিছিয়ে। এখানকার পরিবেশ গ্রামের চেয়েও নাজুক। পানি, স্যানিটেশন ও থাকার পরিবেশসহ অনেক সমস্যা রয়েছে। কিন্তু আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে না তারা। শিক্ষা ও আর্থিক অবস্থা সংকটের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকে ছেলে-মেয়েদের আগেই বিয়ে দিচ্ছে। ফলে বুঝে ওঠার আগেই তারা গর্ভবতী হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বস্তি এলাকায় সরকারের যৎসামান্য কার্যক্রম বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। তাতেও চরম সমন্বয়হীনতা। এগুলো দেখার দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। বিচ্ছিন্নভাবে বেসরকারি সংস্থাগুলো কাজ করলেও জনসংখ্যা ও চাহিদার তুলনায় তা একেবারে অপ্রতুল। স্থানীয় পর্যায়ে কাঠামো অনেক ভালো, কিন্তু বস্তিতে বসবাস করা মানুষদের নিয়ে সমন্বয়হীনতার কারণে তারা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ সার্ভিসেস ট্রেনিং অ্যান্ড এডুকেশন প্রোগ্রামের (আরএইচস্টেপ) উপ-পরিচালক ডা. এলভিনা মোস্তারী  বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচি থাকলেও বস্তিতে বসবাসরতদের অধিকাংশই জানে না সেই সেবা কোথায় পাবে। তথ্যগুলো যাতে ঠিকমতো পায় সেই উদ্যোগ নেওয়া দরকার। অন্যদের থেকে এসব এলাকার যেহেতু পরিবেশ অনেকটা খারাপ, আবার জনসংখ্যার ঘনত্বও বেশি তাই কার্যক্রম আরও জোরালো হওয়া উচিত। বেসরকারি সংস্থা কাজ করলেও তাদের কার্যক্রম ফান্ডভিত্তিক। নির্দিষ্ট সময় পর তাদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তাই সরকারকেই এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

এদিকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বলছে, তাদের কার্যক্রম মূলত প্রান্তিক পর্যায়ে। শহরাঞ্চলে কাজ করার সুযোগ নেই। শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী ও শিশু এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এসব সেবা দিচ্ছে। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কাভারেজ করতে পারছে সরকারের এই বিভাগ।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মনজুর হোসেন বলেন, ‘প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বস্তির মতো ঘন বসতিপূর্ণ জায়গাগুলোতে আমাদের কোনো কার্যক্রম নেই। এখানে যেসব ছেলে-মেয়ে স্কুলে যায়, তারা সামান্য পেলেও বড় অংশই বাইরে থাকছে। বস্তির মতো এলাকায় সরাসরি সরকারের কার্যকরী প্রোগ্রাম ছাড়া বেসরকারি সংস্থার দ্বারা পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই পঞ্চম সেক্টর প্রোগ্রামে স্থানীয় সরকারের পাশাপাশি আমরা কাজ করতে চাই। সেই অনুযায়ী প্রস্তাবনাও পাঠানো হয়েছে।’

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের অ্যাডোলোসেন্টদের নিয়ে কাঠামো অনুযায়ী নানা কর্মসূচি থাকলেও গুরুত্ব পাচ্ছে না বস্তিতে বসবাসকারীরা। এর দায়িত্বে¡ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় হলেও তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। দায়িত্ব না পাওয়ায় এড়িয়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও। এসব এলাকার জন্য ‘মাল্টি মিনিস্ট্রিয়াল প্রকল্প’ দরকার। যার তত্ত্বাবধানে থাকবে সরাসরি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।’আমাদের সময়

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৩/১২/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.