কুষ্টিয়াঃ ঘড়ির কাটায় সকাল ৯টা বেজে ২৫ মিনিট। উত্তোলন করা হয়নি জাতীয় পতাকা। কয়েকজন কোমলমতি শিক্ষার্থী মিলে বারান্দার গ্রিল, অফিসকক্ষ ও শৌচাগারের তালা খুলছে। তখনও আসেনি শিক্ষক-কর্মচারী কেউ। এরপর ৯টা ৩৪ মিনিটের সময় বিদ্যালয়ের নৈশ্যপ্রহরী কাম দফতরি এসে পতাকা উত্তোলন করেন। আর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের জন্য অপেক্ষা করছে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির অর্ধশত শিক্ষার্থী। তবে সাংবাদিকের উপস্থিতির ফোন পেয়ে অবশেষে শিক্ষকরা এলেন ১০ টারও পরে।
রবিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ৫৩ নম্বর এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিন গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। অথচ নিয়মানুযায়ী সকাল ৯টা ১৫ মিনিটের মধ্যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারীর উপস্থিত থাকার কথা।
অফিসকক্ষের তালা খোলার সময় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সিয়াম ও সম্রাট জানায়, বাচ্চু চাচা (দফতরি) একটু পরে আসে। সেজন্য তার বাড়ি থেকে চাবি এনে তারা নিজেরা তালা খুলছে। সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই শিক্ষার্থীরা তালা খুলে শ্রেণিকক্ষে বসে থাকে। পরে দফতরি ও শিক্ষকরা আসেন।
শিক্ষকদের অপেক্ষায় বসে থাকা দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র মো. আজিব বলে, ‘আমাদের স্কুলে মাত্র দুইজন শিক্ষক আছেন। ১০টার দিকে ক্লাস শুরু হয়। আমিও মাঝে মাঝে বিদ্যালয়ের তালা খুলি।’
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অস্বীকার বিদ্যালয়ের নৈশ্যপ্রহরী কাম দফতরি মো. তারিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, ‘আমি নিজেই প্রতিদিন বিদ্যালয়ের তালা খুলি। কিন্তু আজ বৃষ্টির কারণে আসতে দেরি হয়েছে। সেজন্য শিক্ষার্থীরা তালা খুলেছে। শিক্ষকদের ফোন দেয়া হয়েছে।’
তদারকির অভাবে ৮ নং যদুবয়রা ইউনিয়নে অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে এমন অনিয়মের চিত্র নিত্যদিনের বলে জানায় স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুল পাড়ার এক বাসিন্দা বলেন, ‘স্কুল খোলার ঠিক ঠিকানা নেই। শিক্ষকরা ৯ টায়ও আসেন, ১০ টায়ও আসেন। দিনে দিনে স্কুলটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।‘
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বিঘা জমির উপর ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ওই বিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১২ জন। বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুইজন। এরমধ্যে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন। যিনি অফিসিয়াল কাজে ব্যস্ত থাকেন। আর একজন সহকারী শিক্ষক চালিয়ে নিচ্ছেন পাঠদান কার্যক্রম। এতে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ২০২০ সাল থেকে এভাবেই চলছে বিদ্যালয়টি।
এসব বিষয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. তারেক রহমান বলেন, ‘বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট। প্রধান শিক্ষক ব্যস্ত থাকেন অফিসের নানান কাজে, সারাদিন আমি একাই ক্লাস নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি কুষ্টিয়া শহর থেকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াত করি। আজ আমার মোটরসাইকেলটি পথে নষ্ট হওয়ায় বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দেরি হয়েছে।’
আর বৃষ্টির দোহায় দিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি গতকাল শ্বশুর বাড়িতে ছিলাম। বৃষ্টির কারণে সেখান থেকে আসতে দেরি হয়েছে। বিদ্যালয়ে সাংবাদিক এসেছে- এমন খবরে দ্রুত চলে এলাম।’
তবে শিক্ষার্থীদের তালা খোলার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে মাত্র দুইজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় চলছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এভাবে যথাযথ পাঠদান সম্ভব না। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।’
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সকাল ৯টা ১৫ মিনিটের মধ্যেই বিদ্যালয় খুলতে হবে এবং শিক্ষক-কর্মচারী-শিক্ষার্থীদের উপস্থিত হতে হবে। আর তালা খুলবেন দফতরি। যদি এর কোনো ব্যত্যয় ঘটে তাহলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৫/০৯/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
