সুশান্ত কুমার দে।।
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, কথাটা ধ্রুব সত্য। তবে বর্তমানের শিক্ষাব্যবস্থা পাশ্চাত্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিনিয়ত একটা প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। ছোট ছোট শিশুর পাঠ্যক্রম থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদেরও একই দশা। যেন উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করেও আমরা ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের অমূল্য সম্পদ (বর্ণপরিচয়), সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সরল ভাষা প্রকাশ (১৯৩৯), ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর (ব্যাকরণ মঞ্জুরী, ১৯৫২) কোনো কিছু আয়ত্ত করতে পারিনি। এ সবই যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ আমরা খাঁটি বাঙালি, ৩০ লাখ রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ। ভাবতে লজ্জা লাগে, বাংলা ব্যাকরণের জনক পর্তুগিজ ধর্মযাজক মানুয়েল দা আসসুম্পসাঁউ বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেন।
আমরা বাংলা ভাষা ততটা আয়ত্ত না করে বিদেশি ভাষার ওপরে অহেতুক লম্ফঝম্প করছি। আজকের শিশুরাও কী শিখছে তা বোধগম্য নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সনাতনী শিক্ষাব্যবস্থা একেবারেই অস্তাচলে। বর্তমান স্বর্ণযুগের এই ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগ করে উঠতি বয়সি কোমলমতি শিশুদের জন্য হুমকি স্বরূপ।
তারা এখন সঠিক সময়ে কিছুই করতে পারে না। সময় মতো খাওয়াদাওয়া খেলাধুলা পড়াশোনা স্কুলে যাওয়া ইত্যাদি থেকে বেরিয়ে মোবাইলের দিকে সময় বেশি অপচয় করছে। পুঁথিগত বিদ্যা থেকে বেরিয়ে ইন্টারনেট ল্যাবে এখন পড়তে চায়। অথচ ইন্টারনেট ল্যাবের নাম করে তারা গেম, ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্রোগ্রাম প্রয়োগ করে অযথা সময় নষ্ট করছে।
সঙ্গে সঙ্গে নানারকম শারীরিক সমস্যায়ও জর্জরিত। চোখে কম দেখা, ঘাড় ব্যথা হওয়া, খাওয়ায় অনীহা, কখনো মেজাজ খিটখিটে ইত্যাদি লক্ষণগুলো ধরা পড়ছে। তারপরও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের শাসন এখন অনেকটাই কমে গেছে। শিক্ষার্থীদের শাসন করতে গিয়ে অনেক শিক্ষককে অপমান অপদস্থ হতে হয়। অনেককে চাকরিচ্যুতও করা হয়।
অপমান অপদস্থের ভয়ে শিক্ষকরা প্রয়োজন বোধ করেন না শিক্ষার্থীদের শাসনভারের দায়দায়িত্ব নেওয়ার। ঠিকমতো মাসমাইনে পেলেই সবাই খুব খুশি। আমাদের দেশে বিজ্ঞান সাবজেক্টটা যেন কাল হয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে এমন ঘটনাও দেখা গেছে যে, অবৈজ্ঞানিক চিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ভাষ্যের কারণে অবমাননার শিকার হতে হয়েছে। দুই-একজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে দেশান্তরিত হয়েছেন। তাই প্রায়শই ভাবি, আমাদের শিক্ষা আলোর পথ ছেড়ে কোন পথে পা বাড়িয়েছে?
পৃথিবীতে যদি একটাই অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে কোনো সমস্যাই থাকত না। প্রতিটি দেশের সব বিশ্বাসের মানুষের শিক্ষাদীক্ষাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিপীড়িত নিষ্পেষিত হতে হতো না। জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। কে শোনে কার বাণী! আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দিনদিন অধোগতি না উন্নতি? নির্বাচনের প্রাক্কালে শিক্ষকদের আন্দোলন ধর্মঘট যেন বাধ্যতামূলক।
বিভিন্ন যৌক্তিক এবং অযৌক্তিক দাবিদাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এসব আন্দোলন, ধর্মঘট কতটা যৌক্তিক তা শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিগণই বলতে পারবেন। তবে একটা উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে কি আদৌ সম্ভব একই সঙ্গে সমগ্র বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের? ইতিমধ্যেই শুনতে পেলাম, গত ১৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার মাননীয়া শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি তেজগাঁও কলেজ কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষা পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের বলেন, আগামী বছর ২০২৪-এর এপ্রিল মাসে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। অর্থাত্ ২০২৩-এ ফেব্রুয়ারিতে এইচএসসি ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের দুই বছরের কোর্স তেরো থেকে চৌদ্দ মাসেই শেষ করতে হবে।
খুবই কঠিন একটা সমীকরণের মধ্য দিয়ে ঐ সব শিক্ষার্থীকে সময় পার করতে হবে। কেননা এইচএসসি পাশের পর ঐ সব শিক্ষার্থীকে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়ার তীব্র লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, সবকিছু একটু ভেবেচিন্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবে আপনার কাছে এইটুকুই অনুরোধ। কেননা আপনার হাতেই ভবিষ্যত্ প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণ করছে।
লেখক: কবি ও অণুগল্প লেখক
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
