শিক্ষাবার্তা ডেস্ক, ঢাকাঃ শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র একে অন্যের পরিপূরক। শিক্ষা যদি হয় দক্ষতা অর্জনের পথ, তবে তার প্রয়োগের জায়গাটি আসলে কর্মক্ষেত্র। একটি দেশের কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত জনশক্তি কতটা দক্ষ, তাই বলে দেয় দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা কতটা ভালো। এই বিবেচনায় ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে হালে বেশ সমালোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার পুরোটাই ফাঁপা কি-না।
গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হওয়া নানা জরিপের ফল বেশ কিছু বিস্ময়কর তথ্য জানাচ্ছে। প্রথমত, দেশটির স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটা অংশ পড়তে পারে না ঠিকঠাক। আর একটি বড় অংশ গণিতে ভীষণ দুর্বল। আবার বড় ওই দেশটির একেক অঞ্চলে শিক্ষার হার ও মান একেক রকম। আবার ধনীরা নিজেদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলেও দরিদ্রদের জন্য তা অনেক কঠিন। আর দক্ষ জনবল তৈরিতে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে।
বিষয়টি স্পষ্ট করতে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কর্মীদের দক্ষতা ও শৃঙ্খলাবোধ কম থাকায় ভারতের উত্তর প্রদেশে নিজেদের কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয় মুম্বাইভিত্তিক একটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জানান, এ সিদ্ধান্ত তিনি রাতারাতি নেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সব উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ দিই। তবে এসব লোকজনকে প্রয়োজনীয় দক্ষতার স্তরে নিয়ে আসতে গেলে আমাদের সময় নষ্ট হয়।’
এ সমস্যা শুধু মুম্বাইভিত্তিক ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই ঘটেনি। এটি এখন ভারতের অন্যতম সমস্যা। মানুষজনকে দক্ষ করে তুলতে পারছে না ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা। ভারতের জনসংখ্যা এখন ১৪০ কোটি, যা চীনের চেয়েও বেশি। সেই সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দ্রুত বাড়ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের উচিত হবে দেশটির সবচেয়ে জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল রাজ্য উত্তর প্রদেশের লাখ লাখ তরুণকে কর্মযোগ্য করে তোলা। তা না হলে রাজ্যটির প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কমবে, তরুণরা হতাশ হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হবে।
ভারতের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের সেরা ফার্মগুলোতে জায়গা করে নিচ্ছে। কিন্তু ভারতে সাড়ে ২৬ কোটির বেশি স্কুলে পড়া শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই পড়তে পারে না। তাদের গণিতেরও প্রাথমিক ধারণা নেই। গ্রামীণ শিক্ষা নিয়ে জরিপ করা ভারতের সরকারি সংস্থা এএসইআরের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া (দশ বছর বয়সী) এক-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী ভাগ অঙ্ক করতে পারে না।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও উন্নতি হচ্ছে না। সম্প্রতি ভারতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামগত উন্নয়ন হয়েছে। অনেক স্কুলেই টয়লেট, পানি ও কম্পিউটারের ব্যবস্থা হয়েছে। তবে এর সঙ্গে শিক্ষার মান বাড়েনি। গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক দশকে ভারতীয়দের অঙ্ক করার, পড়তে পারার দক্ষতা কমেছে। এ ছাড়া করোনা ভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির সময় অনেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়েছে। তবে ভারতের সব রাজ্যের চিত্র এক নয়। দেশটির অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় শিক্ষার হার বেশি, আবার উত্তরাঞ্চলে কম।
ভারতে অভিজাত শ্রেণির পড়ালেখার প্রতি ঝোঁক ব্রিটিশ আমল থেকেই। কারণ, দেশভাগের আগে ব্রিটিশরা এ শ্রেণির লোকজন দিয়েই দেশ পরিচালনা করেছে। আবার স্বাধীন ভারতেও ওই শ্রেণির মানুষকে দেশ গড়ার কাজে লাগানো হয়।
এ নিয়ে ভারতের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের (সিপিআর) প্রধান যামিনি আইয়ার বলেন, এটি একটি শ্রেণীবিভাজন প্রক্রিয়া।
এ শিক্ষাপদ্ধতির সংকীর্ণতা বড় উদাহরণ হলো এর সিলেবাস। খুব কম শিশুই সময়মতো এটি শেষ করতে পারে। আর এতে দরিদ্র বা কম খরুচে স্কুলে পড়া শিক্ষার্থীদের তেমন কোনো উপকার হয় না।
যদি ভারত সরকার উৎপাদন ও চাকরির বাজার বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হয়, তাহলে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির জিডিপি ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫ শতাংশে দাঁড়াবে।
অবশ্য ইদানীং কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারের গ্রাম বোধগয়াতে গিয়ে দেখা যায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক বৈজন্তি কুমারীকে ঘিরে আছে এক ডজনের মতো শিশু। তারা বৈজন্তির কাছ থেকে বর্ণমালা শিখছিল। গ্রীষ্মের ছুটিতে শিশুরা শেখে কীভাবে গল্প করতে হয় এবং অঙ্ক করতে হয়। এগুলো শিশুরা চার বছরেও স্কুলে পড়ে শিখতে পারেনি।
এ কর্মসূচিটি আয়োজন করেছে ভারতের অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা ‘প্রথমা’। বিহার রাজ্য সরকারের সঙ্গে মিলে সংস্থাটি প্রায় ১৫ লাখ শিশুকে নিয়ে কাজ করছে, যাতে তারা নতুন শিক্ষাবর্ষে আর পিছিয়ে না থাকে। একই রকম ক্যাম্পেইন দেখা গেছে উত্তর ও মধ্যপ্রদেশেও।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে স্বাগত জানাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। তবে এটি পুরো সমস্যার সমাধান করতে পারবে না বলেও মনে করছেন তাঁরা। এখনও বিহারের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম। পুরো ভারতের শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসার হার ৭০ শতাংশ। সেখানে বিহারে ৫০ শতাংশের মতো।
ভারতে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ভালো দিলেও শিক্ষার্থীরা কিছু না শিখতে পারলে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, পরিদর্শন করা স্কুলগুলোতে প্রায় এক-চতুর্থাশ শিক্ষক অনুপস্থিত ছিলেন।
এ ধরনের সমস্যার পরিবর্তনের জন্য জটিল সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছে বিশ্লেষকেরা। ভারতের একটি রাজ্য শিক্ষায় বেশ উন্নতি সাধন করেছে। সেটি হলো দিল্লি। রাজ্যটিতে ক্ষমতায় আছে আম আদমি পার্টি (এএপি)। দলটি ২০১৫ সাল থেকে শিক্ষা খাতে বেশ খরচ করছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের মান বাড়াতে চাইছে এএপি সরকার। এ ছাড়া দলটি প্রাথমিক স্কুলের জন্য কারিকুলাম সংস্কার, প্রশিক্ষণ ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে চাইছে। এর ফলও পেয়েছে এএপি। দিল্লিতে গত আট বছরে বেসরকারি স্কুলের চেয়ে সরকারি স্কুলের ফলাফল ভালো ছিল।
এ সমস্যা সমাধানে মোদি সরকার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেনি। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে এখন পর্যন্ত ভারত নিজেদের জিডিপির ৩ শতাংশই শিক্ষায় ব্যয় করতে পারেনি। এর মধ্যে তাঁর সরকার পাঠ্য আধেয়কে (কনটেন্ট) যৌক্তিক করার নামে মুসলিম ঐতিহ্য থেকে শুরু করে বিবর্তন তত্ত্ব পর্যন্ত সরিয়ে দিয়েছে। এটিকেই মোদি সরকার শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হিসেবে দেখাচ্ছে।
ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পড়া ও গণিতের বেসিক দক্ষতা থাকতে হবে। দিল্লিতে শিক্ষকদের কারিকুলামের ওপর জোর না দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি কম খরচে শেখানোর অন্যতম একটি পদ্ধতি। এ নীতিতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, অন্যান্য দায়িত্ব কমানো ও কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতিবিদ কার্তিক মুরালিধরন বলেন, এ ধরনের নীতি বেশি খরচ করার চেয়ে ঢের ভালো। এ ধরনের কম খরুচে পদক্ষেপ অনেক ফলপ্রসূ হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকেরা পরিপূরক প্রশিক্ষক হিসেবে খুব কার্যকর হতে পারে। কারণ, তারা স্থানীয় এবং তাই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও ভালো যুক্ত থাকতে পারে।
বিষয়টি প্রমাণ করে দিয়েছেন ২৪ বছর বয়সী স্নাতক ডিগ্রিধারী দীপক কুমার। তিনি বিহারের গয়ায় একটি ক্যাম্পের মাধ্যমে কিছু শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেন। দীপকের ইচ্ছা, তাঁর শিক্ষার্থীরা সরকারি পরীক্ষায় আগামী বছর অংশগ্রহণ করবে। তাঁর শিক্ষার্থীরাও তাঁর ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে না।
ভারতের অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা ‘প্রথমা’র প্রধান রুকমিনি ব্যানার্জি বলেন, ‘করোনা মহামারিতে দুই বছর স্কুল বন্ধ ছিল। সে সময় বোঝা গেছে, শিক্ষায় বাবা-মায়ের সংশ্লিষ্টতা কত গুরুত্বপূর্ণ। এখন স্কুলে পড়ুয়া এক-তৃতীয়াংশই প্রাইভেট পড়ে, যা পাঁচ বছর আগের চেয়ে এক-চতুর্থাংশ বেশি।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নীতিনির্ধারকেরাও এখন পদ্ধতিগতভাবে সন্তানদের শিক্ষায় বাবা-মায়ের সংশ্লিষ্টতাকে বাড়াতে চাইছে। এ জন্য মায়েদের শিশুদের স্কুল যাওয়ার প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হবে, তা অনলাইনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট পুনের এমনই একটি স্কুল পরিদর্শন করে। সেখানে ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর মা সুস্মা দেশমুখ বলেন, ‘আমি এতদিন জানতাম না আমার সন্তান স্কুলে কী করে। তবে এখন আমার মনে হয় তার পড়াশোনায় আমার বড় ভূমিকা রয়েছে।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতের অনেক কোম্পানি প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা খাতে অবদান রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ রয়েছে। গত এপ্রিলে ব্যাঙ্গালুরুভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক স্টার্টআপ বাইজু জানায়, তারা ১৫ কোটি শিক্ষার্থীর জন্য অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিল। তবে বোর্ডের তিনজন সদস্য পদত্যাগ করায় এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
কোন পথ শেষ পর্যন্ত ভারতের শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে, তা বের করতে কয়েক বছর সময় লাগবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষাবীদ মুরলীধরন বলেছেন, সরকারকে লেগে থাকতে হবে। কোন পদক্ষেপ কাজে লাগে, তা খুঁজে বের করতে হবে। নানা পথে চেষ্টা করে তার ফলাফলগুলো গ্রহণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী নীতি তৈরি করতে হবে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৪/০৭/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
