ঢাকাঃ সে রাতে আমরা কেউ ঘুমাইনি। আমি পাশের সেলে সারা রাত জেগেছিলাম। তাহেরকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সময় ভোর ৪টায় আমরা বন্দিরা একসঙ্গে মুহুর্মুহু সেøাগানে কারাগার মুখর করে তুলেছিলাম।
১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই তাহের বিদায় নেন। আর আমি সেই স্মৃতি নিয়ে জেনারেল জিয়ার কারাগারে বন্দি থাকি। ১৯৮১ সালের ১৩ জুন পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর। ১৭ জুলাই মামলার রায়ে কর্নেল তাহেরের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কর্নেল তাহেরের সঙ্গে সামরিক আদালত আমাকেও দণ্ডিত করে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কিছু টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই বছর, আমার নামের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত অর্থাৎ মোট ১২ বছরের সাজা। ওই সামরিক আদালতের প্রতিটি ঘটনার আমি জীবন্ত সাক্ষী। আমি দেখেছি তাহেরের সাহস ও ধৈর্য। ১৯ জুলাই দুপুরে যখন স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনরা কারাগারে দেখতে যান তখন সবার সামনে তাহের এলেন। হাসলেন। খুবই স্বাভাবিক। তারা প্রাণভিক্ষা চাইতে বলেছিলেন। কর্নেল তাহের তা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমি তো চোর নই যে ক্ষমাভিক্ষা করব। আমার ফাঁসি হতে পারে না।’ স্ত্রী লুৎফা যখন ছেলেমেয়ের কথা বলে ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারে শেষ চেষ্টা করেন, তাহের হাসিমুখেই বললেন, ‘আমার ছেলেমেয়েদের দেশের মানুষ দেখবে।’
এর আগে হয়েছিল প্রহসনের বিচার। একদিকে সেনাশাসকের লিখে দেওয়া রায় বিচারক পড়ছেন আর কর্নেল তাহের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছেন। রায় পড়া শেষে বিপ্লবী স্লোগান তোলেন তাহেরসহ সবাই। তারপর হ্যান্ডশেক করলেন সবার সঙ্গে। বললেন, ‘এটাই তো স্বাভাবিক ঘটনা, তোমরা মন খারাপ করছ কেন? এক জীবনে সবকিছু পাওয়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এর ভেতরেই বেঁচে থাকব আমি তাহের। স্বপ্ন ব্যর্থ হতে পারে না। সব চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র ডিঙিয়ে সফল হবই আমরা।’ ফাঁসির আদেশ পেয়ে কার্যকরের কয়েক ঘণ্টা আগে সহকর্মী-অনুসারীদের আরও বলেন, ‘মন খারাপ কেন? আমার কাছে এটাই স্বাভাবিক।’ দুশ্চিন্তা তারপর এলো ২০ জুলাই, ১৯৭৬। সন্ধ্যা। বার্তাবাহক এসে জানিয়ে দিল পরদিন কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা। তাহের শুনলেন এবং ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় দিলেন বার্তাবাহককে। কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী একজন মৌলবি আসেন এবং তাহেরকে ‘কৃত অপরাধের’ জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুরোধ জানান। তাহের যা বিশ্বাস করতেন তা বলতে দ্বিধা করতেন না। এবারও তাই করলেন। তাহের মৌলবির উদ্দেশে শুধু বললেন, ‘আপনাদের সমাজের কালিমা আমাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। কখনো না। আমি সম্পূর্ণ শুদ্ধ। আপনি এখন যান। আমি এখন ঘুমাব।’ এরপর তাহের সত্যি সত্যি ঘুমুতে যান এবং গভীর নিদ্রায় ডুবে যান। স্বাধীন বাংলাদেশে বীর তাহেরের সেটাই ছিল শেষ ঘুম। আশ্চর্য মানুষ তাহের।
২১ জুলাই। রাত ৩টা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ৮ নম্বর সেল। ঘুম থেকে তাহেরকে ডেকে তোলা হয়। উপস্থিতরা তাকে সাহায্য করতে চাইলে তাহের মৃদুস্বরে শুধু বলেন, ‘আমার নিষ্পাপ শরীরে তোমাদের স্পর্শ লাগুক আমি তা চাই না।’ এ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, নিজেই তিনি দাঁত মেজে, দাড়ি কেটে, গোসল করে, নকল পা, জুতো, প্যান্ট-শার্ট… নিজেই পরে নেন। আম কাটেন। নিজে খান, অন্যদের দেন। চা পান করেন। সিগারেট ধরান। তাহেরের এই শান্ত প্রকৃতি দেখে উপস্থিত কারা কর্র্তৃপক্ষের লোকরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়ে। পরে বেদনায় মুষড়ে পড়ে। তাহের যেন দেশপ্রেমে মোড়া এক জীবন্ত শরীর। অন্য কোনো কথা নয়, শুধুই দেশের কথা। সবাইকে উদ্দেশ্য করে তাহের বলেন, ‘সবাই এত বিষন্ন কেন? আমি দুর্দশাগ্রস্তদের মুখে হাসি উদ্ভাসিত করতে চেয়েছিলাম। মৃত্যু আমাকে পরাজিত করতে পারবে না।’
গোপন বিচারের সময় যা বলেছেন, ঠিক তেমনি আচরণ করেছেন কর্নেল তাহের ফাঁসির আগে। ফাঁসির কয়েক দিন আগে তার জবানবন্দি শেষে কর্নেল তাহের বলেছিলেন, ‘এ জাতির প্রাণে আমি মিশে রয়েছি। কার সাধ্য আছে আমাদের আলাদা করবে। নিঃশঙ্কচিত্তের চেয়ে জীবনে আর কোনো বড় সম্পদ নেই। আমি তার অধিকারী।’ সত্যিই তিনি নিঃশঙ্কচিত্তের অধিকারী বলেই দৃঢ়পায়ে ঠিক ভোর ৪টায় এগিয়ে যান ফাঁসির মঞ্চে বিদায় বাংলাদেশ, বিদায় দেশবাসী, বিশ্ব দীর্ঘজীবী হোক বলে।
ঠিক ভোররাত ৪টা, ২১ জুলাই, ১৯৭৬ কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাহের ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। তাহের ফাঁসির দড়ি এত স্বাভাবিকভাবেই গলায় পরেছেন যে, মঞ্চে উঠে বললেন, ‘ফাঁসির দড়িটা এত ঢিল কেন? দেরি করছ কেন? আমি প্রস্তুত, তোমরা তোমাদের কর্তব্য করো।’
মৃত্যুর আগে লুৎফাকে লেখা শেষ চিঠিতে তাহের বলেছেন, ‘আমাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। আমি আমার সমগ্র জাতির মধ্যে প্রকাশিত। আমাকে হত্যা করতে হলে সমগ্র জাতিকে হত্যা করতে হবে।’ কিন্তু তাহেরকে কি জেনারেল জিয়া হত্যা করে সফল হয়েছিলেন?
লেখক : হাসানুল হক ইনু, জাসদ সভাপতি
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২১/০৭/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
