জাতীয়করণ: বিপাকে অর্ধশতাধিক কলেজের নন-এমপিও শিক্ষকরা

শিক্ষাবার্তা ডেস্ক, ঢাকাঃ  জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি সরকারীকরণের জটিলতার নিরসন হচ্ছে না। বছর-ছয়েক আগে প্রধানমন্ত্রী জাতীয়করণে সম্মতি দেওয়া শুরু করলেও এখনো অর্ধেকের চাকরি সরকারি হয়নি। উপরন্তু শিক্ষকদের চাকরি সরকারীকরণে ভিন্ন নিয়ম চালু হয়েছে।

শিক্ষা, জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয় পার হয়েও প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে গিয়ে অধিকতর যাচাইয়ের ফাঁদে আটকা পড়েছেন নন-এমপিও শিক্ষকরা। সরকারের মেয়াদ শেষের পথে থাকায় প্রায় ২০০ কলেজের নন-এমপিও শিক্ষকরা চাকরি সরকারি হওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন।

প্রত্যেক উপজেলায় অন্তত একটি কলেজকে সরকারি করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে জাতীয়করণে সম্মতি দিতে শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন পর্যন্ত ৩২৪টি কলেজকে সরকারি করার (জাতীয়করণ) গেজেট জারি হয়েছে। তবে নানা প্রতিকূলতা পার করে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া কলেজের সংখ্যা ১৩৩। বেতন উত্তোলনকারী কলেজের সংখ্যা ৬৩। প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে অনুমোদিত কলেজের সংখ্যা ১৬৪। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নামের ২৯টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক-কর্মচারীর পদ অনুমোদিত হয়েছে আর অন্য কলেজগুলোর আংশিক পদ অনুমোদিত হয়েছে।

আগে সচিব কমিটি শিক্ষা, জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয় পার হয়ে আসা কলেজগুলোতে বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষকদের চাকরিও সরকারীকরণে সম্মতি দিয়েছে। ১২১টি কলেজ এভাবে পার হয়ে যাওয়ার পর কমিটির মনে হয়েছে, নন-এমপিও শিক্ষকদের আরও যাচাই প্রয়োজন। ফলে অর্ধশতাধিক কলেজের নন-এমপিও শিক্ষকরা আটকে রয়েছেন। বিশেষ করে যেসব কলেজে অনার্স-মাস্টার্স রয়েছে, সেখানে শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও হওয়ার সুযোগ নেই। অথচ তাদের নিয়োগ বৈধ। তারাই এখন মহাবিপদে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) আবদুন নুর মুহম্মদ আল ফিরোজ  বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয়করণকৃত কলেজে চাকরি আত্মীকরণের কাজ করছি। সচিব কমিটি থেকে কোনো জিজ্ঞাসা বা যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকলে সেটাও দ্রুততার সঙ্গে করার চেষ্টা করছি। কাজ শেষ হতে খুব বেশি সময় লাগবে না।’

মৌলভীবাজার জেলার একটি জাতীয়করণকৃত কলেজের অনার্সের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমাদের জেলায় পাঁচটি কলেজকে জাতীয়করণ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্মীকরণের বিষয়টি সচিব কমিটিতে গেলে নন-এমপিও শিক্ষকদের অধিকতর যাচাইয়ের জন্য ফাইল আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শুধু আমাদের জেলাই নয়, সচিব কমিটিতে যাওয়া আরও অনেক কলেজের ফাইল আটকে আছে। অথচ কয়েক মাস আগে যেসব কলেজের ফাইল সচিব কমিটিতে গেছে, সেসব কলেজের নন-এমপিও শিক্ষকদের চাকরি সরকারি হয়েছে। তারা এখন সরকারি বেতন পাচ্ছেন। আমার প্রশ্ন, একই দেশে একই শিক্ষকদের চাকরি সরকারীকরণে দুই নিয়ম কেন? আমরা আতঙ্কে দিন পার করছি যাচাই শেষে আমাদের আবার বাদ দেওয়া না হয়।’

জাতীয়করণের গেজেট জারির পর শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য যাচাইয়ের কাজ শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। তারা এ কাজে তিন বছর সময় নেয়। এরপর যাচাই করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই কাজ দুই দপ্তর থেকে দুবার করায় অনেক সময় লেগে যায়। এরপর ফাইল যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। পরে যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সবশেষে ফাইল যায় সচিব কমিটিতে। এরপর ফাইল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফেরত এলে শিক্ষক-কর্মচারীদের অ্যাডহক নিয়োগ দিয়ে চাকরি সরকারীকরণের আদেশ জারি হয়।

সূত্র জানায়, ১২১টি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের পদ অনুমোদনের পরই দেখা দেয় নতুন জটিলতা। বর্তমান সচিব কমিটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পদসংখ্যা ৪০-এর বেশি হলেই ‘অধিকতর যাচাই’ শব্দ সংযোজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফাইল ফেরত পাঠিয়েছে। তারাই আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের দ্বিগুণ জনবল অনুমোদন করেছে। এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষকরা মাঠে নামলে একটি কলেজে এমপিও এবং নন-এমপিও শিক্ষকদের আলাদা করা হয়েছে। এতে আটকা পড়ছেন নন-এমপিও শিক্ষকরা।

জানা যায়, জাতীয়করণকৃত কলেজে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ-নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রায় ২১২টির অধ্যক্ষ ও ১৯৩টির উপাধ্যক্ষ এবং অনেক বিষয়ের শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। অনেক কলেজে করণিক এমনকি অফিস-সহায়কের পদও শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এত প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কিছু কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে শিক্ষা ক্যাডারের লোক পাঠানো হলেও বেশির ভাগ কলেজে পদ শূন্য রয়েছে।

সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির (সকশিস) সভাপতি জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘জাতীয়করণকৃত কলেজে সপ্তম গ্রেডে কর্মরত প্রভাষক, নবম গ্রেডে কর্মরত প্রদর্শক ও শরীরচর্চা শিক্ষক, সপ্তম গ্রেডে কর্মরত লাইব্রেরিয়ান, দশম গ্রেডে কর্মরত সহকারী লাইব্রেরিয়ানদের বেতন পদের প্রারম্ভিক ধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সবার বেতন আগের চেয়ে কমে গেছে, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে জীবনযাপন কষ্টকর। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে আগের গ্রেড নির্ধারণের দাবি জানিয়েছি। এর পক্ষে অভিমত এলেও তা ফাইলবন্দি।’

সকশিসের তথ্যানুযায়ী, জাতীয়করণকৃত ৩২৪ কলেজের এমপিও ও নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ১৯ হাজার ২০৬। শিক্ষকের সংখ্যা ১৩ হাজার ২১৭ ও কর্মচারীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯৮৯। ছয় বছরে চার হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে গেছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরে গেলেও যেদিন জাতীয়করণের গেজেট জারি হয়েছে, সেদিন থেকে বৈধ নিয়োগপ্রাপ্তরা সরকারীকরণের সুবিধা পাবেন, যদি সেদিন তাদের বয়স ৫৯ বছরের মধ্যে হয়ে থাকে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১২/০৭/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.