এইমাত্র পাওয়া

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ শ্লোগান নিয়ে বিতর্কে ঢাবির সিনেট

ওবায়দুল ইসলামের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ভিন্নমতাবলম্বী কারও কথা বলার জায়গা নেই। তাঁরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার সমান সুযোগ পাওয়া উচিত।

এরপর সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান কাম্য হতে পারে না। সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) মুহাম্মদ সামাদ বলেন, সিনেটে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি। এটি এখানে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

পয়েন্ট অব অর্ডারে বিএনপিপন্থী শিক্ষকনেতা মামুন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ স্লোগান বাংলাদেশে কবে থেকে বন্ধ করা হয়েছে?’ এ প্রশ্নের পর শুরু হয় দুপক্ষের মধ্যে হট্টগোল। মিনিট পাঁচেক হট্টগোল চলে। এরপর বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের উদ্দেশে উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ পাকিস্তানি ভাবধারার স্লোগান। পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ভাবধারার অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা। সিনেটে এটি গ্রহণ করা হলো না। এই সভা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

শিক্ষক-আমলা বিতর্ক

সরকারি কর্মকর্তা ক্যাটাগরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবে বৃহস্পতিবারের অধিবেশনে অংশ নেওয়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু ইউসুফ মিয়ার সঙ্গেও তুমুল বিতর্কে জড়ান শিক্ষকেরা। বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে শিক্ষকদের সম্পর্কে তাঁর কিছু মন্তব্যের পরই উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর তাঁর বক্তব্যের যে অংশ নিয়ে আপত্তি সেই অংশটুকু প্রত্যাহার করেন উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান।

অধিবেশনে অংশ নিয়ে আবু ইউসুফ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে কোনো প্রভিশন বাজেটে নেই। এটি মনে হয় থাকা উচিত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ব্যানবেইসের মাধ্যমে প্রতিবছর গবেষণার জন্য ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। আমি এর স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য। সেই ৩০ কোটি টাকা কিন্তু আমরা দিতে পারছি না। মানে, আপনারা চাইতে পারছেন না। অনেক উপাচার্য আমাকে বলেছেন, তাঁদের যে তহবিল থাকে, সেটাও ব্যয় হয় না। বাজেটে বরাদ্দ থাকার পরও কেন খরচ হচ্ছে না, এটা আমাদের ভাবতে হবে।’

আবু ইউসুফ আরও বলেন, ‘আমাদের অনেক শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন। আমাদের ছাত্রজীবনে শিক্ষকেরা যেভাবে ক্লাস নিতেন, এখন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া আমার ছেলে ও মেয়েরা বলে, যখন যে কয়টা ক্লাস নেওয়া দরকার, শিক্ষকেরা তা সব একদিনে নিচ্ছেন।’

এ সময় জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন এ কে এম মাহবুব হাসান চিৎকার করেন। পয়েন্ট অব অর্ডারে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি যে, শিক্ষকেরা যথাসময়ে যথাযথভাবে ক্লাস নিচ্ছেন। কোনো শিক্ষার্থী বলতে পারবে না যে শিক্ষকেরা সময়মতো ক্লাস নিচ্ছেন না। শিক্ষকদের নিয়ে আবু ইউসুফ মিয়ার ওই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করা হোক।’

সিনেট সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজামুল হক ভূঁইয়া ও অন্যরা এ সময় বলতে শুরু করেন, আপনারা আমাদের জ্ঞান দিতে আসবেন না। আপনি আপনার বক্তব্য প্রত্যাহার করুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলে। মিনিট পাঁচেক উত্তেজনা চলার পর উপাচার্য আবু ইউসুফের বক্তব্যের ওই অংশ প্রত্যাহার করেন। একপর্যায়ে আবু ইউসুফ আবারও কথা বলতে গেলে উপাচার্য তাঁকে থামতে বলেন। তখন তিনি থেমে যান।

সংসদ সদস্য ক্যাটাগরিতে সিনেট অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এই উত্তেজনাকে ইঙ্গিত করে আর এ এম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী বলেন, ‘জাতীয় সংসদ আর এই সংসদের মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি। একটু পার্থক্য বোধ হয় থাকা উচিত।’

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ২০২১-২২ অর্থবছরের ৮২২ কোটি ৪১ লাখ টাকার সংশোধিত বাজেট ও ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৯২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার নতুন বাজেট অনুমোদিত হয়েছে। নতুন বাজেটটি টাকার অঙ্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে এই সংশোধিত ও নতুন বাজেট অনুমোদিত হয়।

সিনেট অধিবেশনে বাজেট উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। প্রায় ৮ ঘণ্টা বাজেটের ওপর আলোচনা হয়। তাতে অংশ নেন সিনেটের অর্ধশতাধিক সদস্য। এরপর রাত পৌনে ১১টায় বাজেট অনুমোদিত হয়।

২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য পাস হওয়া বাজেটে বেতন, ভাতা, পেনশন, অবসর সুবিধা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ৭২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ ২৭৩ কোটি টাকা, ভাতা বাবদ ২১৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা এবং পেনশন ও অবসর সুবিধা বাবদ ১৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ ছাড়া গবেষণায় বরাদ্দ (মঞ্জুরি) করা হয়েছে ১৫ কোটি ৫ লাখ টাকা (মোট বাজেটের ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ)।

এবারের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ৭৮১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব খাতে আয় হবে ৮৩ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ৫৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল বাজেট ছিল ৮৩১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়িয়েছে ৮২২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে ইউজিসির অনুদান ৭৩১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় ৬৫ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ২৭ লাখ (প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ)। নতুন অর্থবছরে ইউজিসির কাছ থেকে গতবারের চেয়ে এবার ৫০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পদ্মা সেতুর জন্য শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ

পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য সিনেটে প্রস্তাব উত্থাপন করেন সিনেট সদস্য ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন আবদুস ছামাদ। তাঁর প্রস্তাব সমর্থন করেন সিনেট সদস্য নিজামুল হক ভূঁইয়া ও আবদুর রহিম। পদ্মা সেতুকে বাংলাদেশের মানুষের অহংকার, মর্যাদা, শক্তি ও সাহসের প্রতীক এবং মাইলফলক উল্লেখ করে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান।

ডাকসু নির্বাচনসহ নানা দাবি

৪৮ জন সিনেট সদস্য অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনায় ডাকসু নির্বাচনের দাবি করেন সিনেট সদস্য চন্দ্রনাথ পোদ্দার ও ডাকসুর সাবেক এজিএস সাদ্দাম হোসেন। শিক্ষার্থীদের পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার নিশ্চিত করার দাবিও জানান সাদ্দাম হোসেন।

আবাসিক হলগুলোতে গণরুম-গেস্টরুম নির্যাতনের অবসান দাবি করেন বিএনপিপন্থী শিক্ষকনেতা মো. লুৎফর রহমান। অধ্যাপক পদে পদোন্নতিতে পিএইচডির বাধ্যবাধকতা ২০২৫ সাল থেকে কার্যকর করার দাবিও জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের আধুনিকায়ন করার দাবি জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য শারফুদ্দিন আহমেদ।

উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ক্যাম্পাস পুলিশ বা নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্স প্রতিষ্ঠার দাবি জানান সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন জিয়া রহমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সরকারের কাছে বিশেষ মর্যাদা দাবি করেন সিনেট সদস্য খন্দকার বজলুল হক। এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানান নিজামুল হক ভূঁইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি সরানোর উদ্যোগ নেওয়ার দাবিও তোলেন নিজামুল হক।

সিনেট সদস্য আফতাব আলী শেখ গবেষণা বাজেট কমপক্ষে ১০ শতাংশ করার আহ্বান জানান।

ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার, শব্দদূষণ রোধ ও শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রীড়াক্ষেত্রে বাজেট বাড়ানোর দাবি জানান মিহির লাল সাহা। এ ছাড়া, আরও দুটি ছাত্রী হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান সিনেট সদস্য লাফিফা জামাল।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.