নিজস্ব প্রতিবেদক।।
শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই আবারো হোঁচট খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। নতুন বছর শুরু হলেও কোনো স্কুলেই ক্লাস শুরু করতে পারেনি। অনেক জেলা উপজেলায় এখনো শতভাগ পাঠ্যবইও পৌঁছানো হয়নি। স্কুল বন্ধ হলেও শুধু এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া শুরু হলেও ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কোনো অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হচ্ছে না।
অনলাইনে ক্লাস চালুর ঘোষণা দেয়া হলেও শহরের কিছু স্কুল ছাড়া গ্রামের অধিকাংশ স্কুলের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসের সুযোগের পুরোপুরি বাইরে রয়েছে। আর এভাবেই শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরীক্ষার বাইরে রেখে অলস ও অশিক্ষিত একটি জাতি গঠনের পাঁয়তারা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন শিক্ষাবিদরা।
বিগত দুই বছর ধরে করোনার প্রভাবে শিক্ষা খাতের যে ধীরগতির সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইন কিংবা ইউটিউব ক্লাসের সহায়ক হিসেবে কাগজে মুদ্রিত পাঠ্যপুস্তকের বিকল্প ই-ট্যাপ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আর এটা সম্ভব হলে কাগজে মুদ্রিত বই বাতিল করে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে শ্রেণিভিত্তিক পাঠ্যসূচি ওই ট্যাবে ডাউনলোড করে নিতে হবে। পাশাপাশি ডিভাইসে (ই-ট্যাব) ইন্টারনেট কানেকশনও থাকবে।
এতে প্রতি বছর পাঠ্যপুস্তক ছাপতে যে ১১ শ’ কোটি টাকা ব্যয় হয় সেই টাকাতেই সব ট্যাব কেনা যাবে। শিক্ষার্থীরা বিনা পয়াসায় ট্যাব পাবে। ওপরের ক্লাসে প্রমোশন পাওয়ার পর এনসিটিবির মূল সফটওয়্যার থেকে ক্লাসভিত্তিক পাঠ্যসূচি পুনরায় ডাউনলোড করারও সুযোগ থাকবে ই-ট্যাবে। এর মধ্যে গত ২১ জানুয়ারি থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সশরীরে ক্লাস বন্ধ রয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় এই ছুটি বাড়িয়ে আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্লাস বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। করোনার পরিস্থিতি উন্নতি হলে ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ক্লাস চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২১ জানুয়ারি থেকে করোনার ঊর্ধ্বগতির কারণে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে ক্লাস বন্ধ রয়েছে। কিন্তু অনলাইনে ক্লাস চালু করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর থেকে নির্দেশনা দেয়া হলেও সেখানেও আশানুরূপ কোনো ফল আসছে না।
বিশেষ করে গ্রামের স্কুলগুলোতে অনলাইনে ক্লাস নেয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের যুক্ত হওয়ারও তেমন সুযোগ নেই। ফলে মাউশির ভালো উদ্যোগ থাকলেও ফলাফল তেমন আশানুরূপ হচ্ছে না। সম্প্রতি অনলাইন ক্লাসের এই ঘাটতিজনিত বিষয়টি মাউশির নজরেও এসেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মাউশি থেকে মাল্টিমিডিয়া ও অনলাইন ক্লাসের তথ্য এমএমসি ড্যাশবোর্ডে এন্ট্রি নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মাউশির পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশান উইং) অধ্যাপক মো: আমির হোসেন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি আদেশও জারি করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বিষয়ক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দেশের সব মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (সরকারি ও বেসরকারি) শ্রেণী কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে।
এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকেও পরিপত্র জারি করা হয়েছে। উল্লিখিত নির্দেশনা মোতাবেক যথাযথভাবে শ্রেণী কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন করতে হবে এবং অনলাইনে গৃহীত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের তথ্য যথাযথভাবে ড্যাশবোর্ডে এন্ট্রি নিশ্চিত করতে হবে।
এতে আরো বলা হয়, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে যে ক্লাসগুলো অনলাইনে শিক্ষকরা নিচ্ছেন তার তথ্য এমএমসি অ্যাপের মাধ্যমে ড্যাশবোর্ডে এন্ট্রি নিশ্চিত করতেও অনুরোধ জানানো হয়।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষক গতকাল জানান, আমরা স্কুল বন্ধ হওয়ার পর থেকেই নির্দেশনা অনুযায়ী অনলাইনে ক্লাস শুরু করেছি। তিনি জানান, গত বছরের মতো নতুন শিক্ষা বছরে আমরা ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের অ্যাসাইনমেন্ট দিতে পারছি না। কেননা আমরা তো কোনো ক্লাসই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করতে পারিনি।
এ ছাড়া শুধু গ্রামের স্কুলই নয় শহরের অনেক স্কুলেও সব ক্লাসের শতভাগ পাঠ্যবই এসে পৌঁছেনি। তাই ক্লাস শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না। বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক সব স্কুলে এখনো না পৌঁছানোর বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য অধ্যাপক মো: ফরহাদুল ইসলাম জানান, পাঠ্যপুস্তক ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। সব জেলা উপজেলায় সব বই পৌঁছে গেছে।
কিছু বই বাকি থাকলেও আশা করছি ২১ ফেব্রুয়ারির আগেই সব স্কুলের শতভাগ শিক্ষার্থী বই হাতে পাবে। মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন ইউংয়ের সহকারী পরিচালক লাইলুন নাহার গতকাল সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদককে জানান, নতুন শিক্ষা বছরের শুরুর দিকেই সশরীরে ক্লাস বন্ধ হলেও আমরা শুধু এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া শুরু হয়েছে।
কিন্তু ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া না হলেও তাদের অনলাইনে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। সরকার যদি শিক্ষার্থীদের বছরের শুরু থেকেই শিক্ষাক্রমে যুক্ত করতে না পারে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা আর শিক্ষিত জাতি পাবো না। এটা অনেকটা সুকৌশলে মেধাহীন জাতি গঠনের ষড়যন্ত্র বলেও মনে করছেন অনেকে। সাবেক শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, করোনায় অনেক কিছুই আমাদের সামনে নতুন করে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু আমরা আমাদের করণীয় নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। তিনি বলেন, আমরা যদি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে না পারি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে মেধাহীন ও অশিক্ষিত জাতি উপহার পাবো। করোনা আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছে তার আলোকেই পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাকাঠামো সাজানোরও পরামর্শ দেন এই শিক্ষাবিদ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
