নিজস্ব প্রতিনিধি।।
২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালের শেষ প্রান্তিকে এসে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বছর শেষে সীমিত পরিসরে ক্লাসে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা। মাধ্যমিকে কয়েকটি বিষয়ে বার্ষিক পরীক্ষায় অংশও নিয়েছে তারা। তবে পরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া দাবির আন্দোলন বছরের শেষভাগে উত্তাপ ছড়ায় রাজপথে। সরকার ও পরিবহন মালিকরাও সেই দাবিতে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করেন। নতুন শিক্ষাবর্ষের সপ্তাহখানেক আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের নতুন সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছেন মো: আবু বকর ছিদ্দীক।
এ দিকে নতুন বছর শুরুর আগেই আবারো চোখ রাঙাতে শুরু করেছে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন। এই কারণে ইতোমধ্যে আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত শিক্ষা খাতে স্বাভাবিক গতি ফিরছে না বলে আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি। তিনি বলেন, আপাতত পুরোদমে ক্লাসে ফেরার কোনো সুযোগ পাবে না শিক্ষার্থীরা। সীমিত পরিসরেই ক্লাস হবে। মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারপরই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক গতিতে ক্লাসে ফেরানো যাবে কি না।
অন্য দিকে ২০২১ সালেই প্রথম শুরু হয় গুচ্ছপদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। একই বছরে বহু আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের অটোপাস। ২০২১ সালের প্রথম দিকেই ২০২০ সালের বাতিল হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফলাফলে দেয়া হয় অটোপাস। সেই ফলাফলে বিগত বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমানের ফলাফলে জিপিএ ৫ পেয়েছে।
করোনার প্রভাবে বাংলাদেশে ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হলেও ২০২১ সালের নির্ধারিত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে ও গ্রুপভিত্তিক বিষয়ে। এ বছরই প্রথম তিনটি বিষয়ের ওপর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আর এই পরীক্ষা নেয়া হয়েছে ৫০ নম্বরের এবং সময়ও ছিল অর্ধেক অর্থাৎ দেড় ঘণ্টা।
প্রচলিত শিক্ষাকাঠামো পরিবর্তনে ২০২১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নিয়ে আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। নতুন এই শিক্ষাকাঠামো ২০২২ সাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করতে দেশের ৬০টি প্রাথমিক ও ৬০টি মাধ্যমিক স্কুল বাছাই করা হয়েছে। পরে ধাপে ধাপে ২০২৫ সাল থেকে পুরোদমে নতুন শিক্ষাকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
২০২১ সালের শুরু থেকেই ঘটনাবহুল ছিল শিক্ষা খাত। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের অটোপাস ছাড়াও সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের পদোন্নতি, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি, স্কুল ভর্তির ডিজিটাল লটারি কার্যক্রম চালু এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। এ ছাড়া এ বছরই হয়েছে বেশ কয়েকটি নীতিমালা প্রণয়ন। পাশাপাশি ছিল চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষক আন্দোলন চলমান মহামারীতে অনেক সম্ভাবনা তৈরি হলেও কাজে লাগানো যায়নি তার সবটুকু।
করোনা পরিস্থিতির বছরের শুরুতেই (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশ করা হয় ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অটোপাসের ফল। জেএসসির ২৫ শতাংশ ও এসএসসির ৭৫ শতাংশ ফলের ভিত্তিতে এবার এইচএসসি অটোপাসের ফল প্রকাশ করা হয়। এতে পাস করেছে শতভাগ শিক্ষার্থী।
করোনার কারণে চলতি বছর নির্দিষ্ট সময়ের ৮ মাস পর ১৪ নভেম্বর শুরু হয় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা। এতে অংশ নেয় ২২ লাখ ২৭ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী। এরপর ২ ডিসেম্বর শুরু হয় এইচএসসি পরীক্ষা। এ পরীক্ষা চলবে চলতি বছরের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সারা দেশে এইসএসসিতে ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬৯০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে।
করোনার মধ্যেও ছাত্র আন্দোলন উত্তাপ ছড়ায় রাজপথে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা, আবাসিক হল খোলা, পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ, বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের হুমকির প্রতিবাদ, গাড়িচাপায় শিক্ষার্থী হত্যার বিচারসহ নানা দাবিতে সড়কে সরব ছিল শিক্ষার্থীরা।
চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে আয়োজন করতে আইন সংশোধন করা হয়। এর আলোকে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর সাথে নবম ও দশম শ্রেণীর কারিকুলাম অনুযায়ী সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং সমমানের পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৩ সাল থেকে পরিমার্জিত কারিকুলামে শুধু দশম শ্রেণীর কারিকুলামেই এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া নতুন শিক্ষাক্রমে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকবে না। নবম-দশম শ্রেণীতে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্যের মতো বিভাজন থাকবে না। এক্ষেত্রে সমন্বিত শিক্ষাক্রম হবে।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক সংগঠনগুলোও নানা দাবিতে সরব ছিল রাজপথে। বিশেষ করে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ, ইবতেদায়ি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ২৫ শতাংশের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ ঈদ বোনাস, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের দশম গ্রেড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবি, বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের পদ গ্রেড-৬ করাসহ নানা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সফলতা আর ব্যর্থতার মধ্যে বড় অর্জনটি ছিল ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) মূল্যায়নে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে দ্বিতীয় সেরা পুরস্কার অর্জন। আর এই অর্জনটি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
