অসঙ্গতিপূর্ণ এনআইডি কার্যক্রম

অনলাইন ডেস্ক।।

নানা অসংগতিপূর্ণ তথ্যে ভরপুর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। ছবিসহ ভোটার জাতীয় পরিচয়পত্র প্রণয়নের পরও বিপত্তি পিছু ছাড়ছে না নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। ডিজিটাল প্রযুক্তি চালুর এক যুগ পরেও ভোটার পরিচয়পত্রে নানা অসংগতি দূর করতে পারেনি কমিশন। হরেক রকমের বিভ্রান্তিকর খোঁজ মিলছে ভোটারের তথ্যে। এসব অসংগতিপূর্ণ তথ্যের কারণে বিব্রত ইসি ও ভোটাররাও। তথ্যভাণ্ডারে কোনো কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত স্ট্যাটাসে ম্যাডনেস, ইনকমপ্লিট, ম্যাচ নট ফাউন্ড, ম্যাচ ফাউন্ড, মৃত ভোটার, তথ্য ডিলিট প্রদর্শিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইসির তথ্যভাণ্ডারে ৪ হাজার ৩০০ ম্যাডনেস ভোটারের সন্ধান মিলেছে। এতে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা নিয়ে সীমাহীন ভোগান্তিতে নাগরিকেরা। তবে ওপর মহলে যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনে কেউ কেউ ভোগান্তি থেকে পার পাচ্ছেন। ১১ বছর আগে ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা করার পর থেকে এখন পর্যন্ত নাগরিকদের তথ্য হালনাগাদ করেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথম দিকে দেওয়া অনেক তথ্যই এখন পুরোনো হয়ে গেছে, যা প্রতিনিয়ত সংশোধনে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে নাগরিকদের। নাগরিক ভোগান্তি দূর করতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয় জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তির সেবা কার্যক্রম। জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, হারানো কার্ড উত্তোলন এবং নতুন কার্ড মুদ্রণে মাঠের উপজেলা অফিস, জেলা অফিস, আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস এবং পরিচয়পত্র নিবন্ধন অণুবিভাগের (এনআইডি) কার কী ক্ষমতা তা-ও নির্ধারিত করা হয় প্রজ্ঞাপনে। তার পরও যেন ভোগান্তি কমছেই না। সনদধারীরা কিছুটা সেবা পেলেও যাদের কোনো সনদ নেই, এনআইডি সংশোধনে তাদের বেশি বেগ পেতে হচ্ছে।

বিড়ম্বনার শেষ নেই:

ভোটার হওয়ার পর জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলাসহ নানা সেবা নেন অনিতা বড়ুয়া নামে এক নারী। কিন্তু অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি ভোটার হলেও তথ্যে গরমিল। এনআইডির নম্বর দিয়ে তথ্য খুঁজতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃ‌র্পক্ষ দেখতে পায় ‘ম্যাচ ফাউন্ড’ লেখা। আবার ফাতেমা আক্তার নিজের তথ্য দিয়ে ভোটার হলেও প্রয়োজনীয় সেবার জন্য আবেদন করতে গিয়ে দেখতে পান অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য তার সার্ভারে ‘প্রদর্শন’ করছে। একইভাবে মো. হাবিবুর রহমানের ছবি বদলে অপরিচিত এক নাগরিকের ছবি দেখাচ্ছে ইসির তথ্যভান্ডারে। তথ্যের অসংগতির কারণে কেউ কেউ অসংগতিপূর্ণ তথ্যে প্রথম পৃষ্ঠার পর নানাভাবে বিব্রত হচ্ছেন। মানিকগঞ্জের সিংগাইরে এ ধরনের সমস্যা পাওয়া গেছে ১৬ ব্যক্তির ক্ষেত্রে। এনআইডি পেয়েছেন সোনারগাঁওয়ের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাখাওয়াত হোসেন ভুঁইয়া। কিন্তু ইসির তথ্যভান্ডারে তিনি ভোটার নন। ইটিআই ভবনে অবস্হিত এনআইডিতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাখাওয়াত হোসেন ভুঁইয়া জানতে পারেন, ইসির ডাটাবেইজে তার কোনো তথ্য নেই, অর্থাত্ তিনি ভোটার নন। ৪ হাজার ৩০০ 

ম্যাডনেস ভোটার:

ইসির তথ্যভান্ডারে বর্তমানে ৪ হাজার ৩০০ ম্যাডনেস ভোটারের সন্ধান মিলেছে। সংশ্লিষ্ট ভোটারদের তালিকা করে জেলা নির্বাচন অফিসে পাঠিয়েছে ইসি। আদালত কতৃ‌র্ক কাউকে ম্যাডনেস ঘোষণা না করলে তার এনআইডি অটো ঠিক করে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কেন এবং কী কারণে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ভোটারের স্ট্যাটাসে ম্যাডনেস উল্লেখ আছে, তা স্পষ্ট করে বলতে পারেনি ইসি।

অসহায় ইসির কর্মকর্তারাও:

গত ১৫ মার্চ বান্দরবানের লামা উপজেলা নির্বাচন অফিসার আলমগীর হোসেন এনআইডি মহাপরিচালক বরাবর সংশ্লিষ্ট উপজেলায় পাঁচ জন ভোটারের স্ট্যাটাস ইনকমপ্লিট থাকার বিষয়টি অবগত করে চিঠি দেন। তার এখনো কোনো সমাধান হয়নি। মাঠ পর্যায়ের সুপারিশ ইসিতেই পড়ে আছে। 

১১ বছরেও তথ্য হালানাদ করেনি ইসি:

সর্বশেষ গত মার্চের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী দেশের ভোটারসংখ্যা ১১ কোটি ১৭ লাখ ২০ হাজার। এই ভোটারদের কমপক্ষে অর্ধেকের মতো অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত—কোনো সনদধারী নন। ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা এবং ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেওয়া শুরু হলেও এ বিষয়ে দেওয়া সব তথ্য সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে কি না, তা ভোটাররা আজও জানতে পারেননি। বর্তমানে ভোটারদের কাছ থেকে ৪৬ ধরনের তথ্য নেওয়া হচ্ছে। অশিক্ষিত ভোটারদের এনআইডিতে কোনো ধরনের ত্রুটি থাকলে সংশোধনে চরম বিপাকে পড়তে হয়। এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের কয়েক জন কর্মকর্তা বলেন, ১১ বছর আগে দেশে ৮ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৮ জন নাগরিক ভোটার হন। তাঁদের ব্যক্তিগত অনেক তথ্যই এখন পালটে গেছে। বিশেষ করে সেই সময়ের তরুণ ভোটারদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা—এসব তথ্য স্বাভাবিকভাবেই পালটে যাওয়ার কথা। অনেকের বাবা-মায়ের মৃতু হয়েছে, ঠিকানা বদল হয়েছে, কিন্তু এসব তথ্য হালনাগাদ করার সুযোগ কেউ পাননি। 

তদবির ছাড়া ফাইল নড়ে না:

কোনো ধরনের তদবির বা যোগাযোগ না থাকলে এনআইডি-সংক্রান্ত যে কোনো আবেদন বছরের পর বছর পড়ে থাকে ইসি সচিবালয়ে। ফলে সেবা পাওয়া দূরের কথা, সংশোধনের সঙ্গে সংযুক্ত মুল এনআইডিও ফেরত পান না ভুক্তভোগীরা। অনেক ক্ষেত্রে সেই সংশোধন আবেদনে যুক্ত এনআইডির প্রয়োজন হলে বিপদ বাড়ে বহুগুণ। কোভিড মহামারির কারণে বর্তমানে অনলাইনে এনআইডি সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইসি। কিন্তু অনলাইনে স্বাভাবিক সেবা মেলে না। সংশোধনের জন্য তদবির করতে হয়। পরিস্হিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, তদবির ছাড়া এনআইডির ফাইল নড়েই না। এ বিষয়ে এনআইডির মহাপরিচালক কে এম হুমায়ুন কবীর ইত্তেফাককে সম্প্রতি বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্রে নানা ধরনের অসংগতি আবেদন যাচাই করে পাওয়া গেছে। আমরা সবগুলো আবেদন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। যত দ্রুত সম্ভব এসব আবেদন নিষ্পত্তি করা যায়, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। কমিশন এসব বিষয়ে খুবই আন্তরিক।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.