অনির্দিষ্টকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ :পথ কী

অধ্যাপক ডা. মো. শাহাদাত হোসেন।।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক সভ্যতার প্রধান ভিত্তি। আমাদের দেশে করোনা এখানেই বেশি আঘাত হেনেছে। প্রায় দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি আমাদের ভাবাচ্ছে। ইউনিসেফের মতে, বিশ্বের মাত্র ১৩টি দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে অব্যাহতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। দেশে বিভিন্ন সময় পর্যায়ক্রমে সবকিছু খুলে দিলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে।

করোনা যে সহজে বিদায় নেবে না, তা মোটামুটি অনুমেয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আশঙ্কাও অনুরূপ। তাই যারা বলছেন সংক্রমণ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে এবং শিক্ষার্থীদের টিকাদান সম্পন্ন হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেবেন, সেটা কতটা বাস্তবসম্মত?

বাংলাদেশ-ভারতসহ অনান্য দেশের করোনা সংক্রমণের গ্রাফ দেখলে সহজেই অনুমেয় যে, করোনার ধারাবাহিক সংক্রমণের হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভর করে কোনো একটা অতিসংক্রামক ধরনের (ভ্যারিয়েন্ট) প্রাধান্য বিস্তারের ওপর। সাধারণত একটি ভ্যারিয়েন্ট প্রাধান্য বিস্তার করলে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকে এবং নির্দিষ্ট চূড়ায় উন্নীত হওয়ার পর পুনরায় কমতে থাকে।

ভারতে সাম্প্রতিক ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট বিস্তারের ফলে করোনার ঊর্ধ্বগতি ও পরবর্তী সময়ে হ্রাস পেতে প্রায় ১০০ দিনের মতো সময় নিয়েছিল। আমাদের দেশেও এই ভ্যারিয়েন্টের কারণে দুই মাস ঊর্ধ্বগতির পরে বর্তমানে কিছুদিন সবকিছু খোলা থাকা সত্ত্বেও নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। লকডাউনের কারণে ঊর্ধ্বগতির সময় সুফল মিললেও আমাদের অবশ্যই নিম্নমুখী প্রবণতা হলেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া উচিত।

আমরা যদি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ৫ শতাংশের নিম্নে সংক্রমণ নিশ্চিত করে স্কুল-কলেজ খুলতে চাই সেক্ষেত্রে ঐ সময় খোলার সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই আরেকটি ঢেউ এসে পড়ার আশঙ্কা থাকায় সংক্রমণ ঊর্ধ্বগতির হলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। তাই এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিয়ে চলমান থাকা অবস্থায় সংক্রমণ পুনরায় বাড়লে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকবে এবং কয়েক মাস শিক্ষা পাঠক্রম চালানো সম্ভব হবে। তা না হলে আমরা এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারব না।

শিক্ষার্থীদের টিকাদান সম্পন্ন করে ক্লাসে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত বাস্তবতা ও বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ যৌক্তিক নয়। করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের মধ্যে পঞ্চাষোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ৭১ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং ১০ বছরের নিচে মাত্র শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ। অনেকে বলতে পারেন সংখ্যা কম হলেও শিশুদের বিষয়টি স্পর্শকাতর এবং তারা স্কুলে আক্রান্ত হলে বয়স্কদের আক্রান্ত করবে। করোনার টিকা আপনাকে পুনরায় আক্রান্ত না করার গ্যারান্টি দেয় না বরং আক্রান্ত হলেও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশেই কমিয়ে দেয়।

ফলে আমাদের টিকা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো মৃত্যু হ্রাস এবং রোগের জটিলতা ও হাসপাতালে ভর্তি কমিয়ে আনা। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের টিকাদানের মাধ্যমে এ লক্ষ্য খুব বেশি অর্জন সম্ভব নয়। বরং যদি প্রথম থেকেই পঞ্চাষোর্ধ্ব ব্যক্তির টিকাদান সম্পন্ন করে স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া হবে বলা হতো—তা অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত ও যৌক্তিক হতো এবং আমাদের টিকা কর্মসূচির লক্ষ্যও তাই হওয়া উচিত।

মানুষের জীবন-জীবিকাভিত্তিক কর্মকাণ্ড বন্ধের ক্ষতি দৃশ্যমান হলেও শিক্ষার বহুমাত্রিক দিক থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষতি সহজে পরিমাপ করা যায় না। একজন শিশুর দিনে অন্তত এক ঘণ্টা মুক্ত পরিবেশে শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, তার স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অন্যথায় তার শারীরিক গঠন বাধাগ্রস্ত হয়।

বেশির ভাগ স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী সহপাঠীদের সঙ্গেই খেলাধুলা ও শারীরিক পরিশ্রম করে থাকে যা বর্তমানে স্কুল বন্ধ থাকায় প্রায় অনুপস্থিত। যার ফলে ভবিষ্যতে যথেষ্ট শারীরিক সক্ষমতাসম্পন্ন প্রজন্ম থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিশুদের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়া প্রবণতার পাশাপাশি দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাদের চোখ ও মস্তিষ্কের ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে।

দীর্ঘ দিন স্কুল বন্ধ থাকার কারণে শিশুরা বাড়ি থেকে বের হওয়ার বা অন্যদের সঙ্গে মেশার সুযোগ একদমই পাচ্ছে না। বন্দি এই সময়ে ছাত্রছাত্রীরা মোবাইল ও ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মনিটরিং চলে স্কুলের মাধ্যমেই যা এখন নেই বলে অনেক অভিভাবকই বিড়ম্বনার মধ্যে আছেন। বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে, যার সুনির্দিষ্ট ক্ষতিকর দিকগুলো আমরা সবাই জানি।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে অনেক শিশুর মধ্যেই আচরণগত পরিবর্তন ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অনভ্যস্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে তাদের সামাজিক হয়ে বেড়ে ওঠা যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি স্কুল খুললে অন্যদের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো বা ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে উঠবে।

বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উত্তীর্ণ হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ বিলম্বিত হওয়ায় ব্যক্তি জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক সমস্যা ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশব্যাপী ৩ হাজার ৯৯৭ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে শতকরা ৫২ দশমিক ৮৭ শতাংশের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ এবং শতকরা ৪০ দশমিক ৯১ শতাংশের মধ্যে মানসিক বৈকল্যের উপসর্গ ছিল। ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সি ৩ হাজার ৩৩১ শিক্ষার্থীর মধ্যে চালানো আরেক জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ১২ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় এই হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।

স্কুল-কলেজ বন্ধ রেখে করোনায় আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচালাম—এটি ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করার সুযোগ নেই বরং সৃজনশীলতা হ্রাস, অসামাজিক, অমানবিক ও স্বার্থপরতায় বেড়ে ওঠার জন্য সমাজকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। জাতির কাছে ভবিষ্যতের সুদক্ষ বিচক্ষণ প্রজন্ম পাওয়ার জন্য যা অপরিহার্য ছিল তা থেকে অনেক দূরে সরে গেল শিক্ষাব্যবস্থা।

বিরূপ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে ভালো ম্যানেজমেন্ট দেখা ও শেখা থেকে বঞ্চিত হলো শিক্ষার্থীরা, যা তাদের বাস্তব প্রায়োগিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একজন শিক্ষক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা অনুধাবনযোগ্য নয়। জাতি ও দেশ গড়ার কারিগর ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে রক্ষা করতে অনতিবিলম্বে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া প্রয়োজন।

লেখক :উপাধ্যক্ষ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.