মুজিববর্ষে শতঘন্টা মুজিবচর্চা’-এর আরও একটি পর্ব অনুষ্ঠিত হলো গতকাল। দেশ ও জাতির বহুল প্রতিক্ষিত মুজিব শতবর্ষ উদযাপনকালে এক অনাকাঙ্খিত মহামারি করোনার জন্য উৎসব ও অনুষ্ঠান সংকুচিত ও সীমিত হয়ে যায় তখন আমাদের জেলার অভিভাবক, মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন মহোদয়ের নির্দেশক্রমে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় অত্যন্ত দক্ষ, যোগ্য ও সৃজনশীল-মেধাবী জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ মুনসুর আলম খান এর তত্ত্বাবধানে ২০২০ সালের ৩০ আগস্ট হতে এই অনুষ্ঠান অনলাইনে শুরু হয়। দেশবরেণ্য, খ্যাতনামা, স্বমহিমায় উজ্জ্বল ,কীর্তিমান মানুষ অংশগ্রহণ করে আমাদের কৃতার্থ করেছেন। যত দিন যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে জানা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি পর্বে তাকে নব নব রূপে আমরা আবিষ্কার করছি ।
এবারের বিষয় ছিল “আগামীর বাংলাদেশ ও মুজিবচর্চার প্রাসঙ্গিকতা” এবং প্রধান আলোচক ছিলেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, লেখক, সাহিত্যিক, গবেষক, প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে জানা ও বোঝার ক্ষেত্রে অনেক নতুন সূত্র ও তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা তাঁর আলোচনায় মুগ্ধ হয়েছি-ঋদ্ধ হয়েছি। আমার এক প্রশ্নের উত্তরে স্যার বললেন, বাঙালি বড়ই বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি। প্রসঙ্গক্রমে বললেন খুলনা শহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নামে কোন সড়ক না থাকলেও পাকিস্তানপন্থী, স্বাধীনতাবিরোধী সবুর খানের নামে সড়ক ঠিকই আছে।
১৯৮০ সালের কথা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কার্জন হল থেকে প্রায়ই টিএসসি বা কলাভবনে যেতে হতো। দোয়েল চত্বরের পরই তিন নেতার মাজার চোখে পড়তো। এই মাজারে শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দীর পাশে খাজা নাজিমুদ্দীনের জায়গা কীভাবে হলো তা কোনদিনই বোধগম্য হয়নি। কারণ খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন বাংলা ভাষা ও বাঙালির আরেক শত্রু।
খাজা নাজিমুদ্দিন যদিও ছিলেন একজন বাঙালি রাজনীতিবিদ তবুও বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে ছিলেন বহদূরে। তিনি ঢাকার উদুভাষী নবাব পরিবারের সদস্য ছিলেন। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে তৎকালীন সামন্তবাদী ও রক্ষণশীল রাজনীতির ওপর ভর করে নাজিমুদ্দিন দুইবার বাংলার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তার কারণেই ভারত-পাকিস্তান বিভাগের সময় অর্থসম্পদ ভাগের কালে নায্য হিসস্যা আদায়ে ব্যর্থ হয় এবং পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়। ১৯৪৮ এর ১১ মার্চ মোহম্মদ আলি জিন্নাহর ঢাকা সফরকালে বাংলা ভাষার প্রশ্নে ছাত্রনেতাদের সাথে যে চুক্তি করেন পরবতীতে তার বরখেলাপ করেন।
১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের মৃত্যুর পর তিনি পাকিস্তানের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হন। কেন্দ্রিয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা করেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। .. পরীক্ষামূলকভাবে একুশটি কেন্দ্রে বাংলা ভাষাকে আরবি হরফে লেখার প্রচেষ্টা সফল হয়েছে”।
খাজা নাজিমুদ্দিনের এই মন্তব্যই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের দাবানল সৃষ্টির পক্ষে যথেষ্ট ছিল। এ প্রসঙ্গে ভাষা আন্দোলনের সময়ের অন্যতম নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা বলেছিলেন, নাজিমুদ্দিন সাহেব ভাষার প্রশ্নে ওই ধরনের বিবৃতি না দিলে বোধ হয় ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা না-ও ঘটতে পারত। নাজিমুদ্দিনের এ বক্তৃতার জন্য ভাষা আন্দোলন দ্রুত এগিয়ে গেছে। তার বক্তৃতা রেডিওতে সম্প্রচার হয়েছিল। ফলে সারা পূর্ববঙ্গেই এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। বলা যেতে পারে তার কারণেই রক্তাক্ত ২১ এর সষ্টি হয়েছিল এবং রফিক-শফিক-সালাম-বরকতদের জীবন দিতে হয়েছিল।
খাজা নাজিমুদ্দিন আমৃত্যু বাংলা ভাষা ও বাঙালি বিরোধী ছিলেন। একজন বাঙালি রাজনীতিবিদ হয়েও ছিলেন উর্দুভাষী । বাঙালিদের তিনি কখনো ভালো চোখে দেখেননি। বাংলা ও বাঙালির জন্য তিনি ভাল কাজ করেছেন তার একটি নজিরও নেই। সেই নাজিমুদ্দীনের অপকর্ম আমরা ভুলে গেছি এবং পরম মমতায় শেরে বাংলা ও সোহরাওয়াদীর পাশে স্থান দিয়েছি। তার নামে আজও ঢাকায় সড়কের নাম রেখে চলেছি। সত্যিই বাঙালি বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি।
লেখক- প্রফেসর হাসানুজ্জামান মালেক
সভাপতি, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ, মেহেরপুর জেলা।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
