ড. মো. মোয়াজ্জম হোসেন।।
উচ্চশিক্ষা জাতির বিবেক সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম; সে কারণে প্রত্যেক জাতি উচ্চশিক্ষা বিস্তার ও এর গুণগত উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে তৎপর থাকে। শুধু তা-ই নয়, উচ্চশিক্ষা একাডেমিক উন্নয়নের পাশাপাশি টেকনিক্যাল, প্রকৌশল, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্প উন্নয়নের মাধ্যমে জাতিকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করে।
সাধারণভাবে উচ্চশিক্ষা হলো উচ্চমাধ্যমিক/সমমান পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা। ইউনেসকো উচ্চশিক্ষা বলতে দ্বাদশ শ্রেণি পরবর্তী যে কোনো সাধারণ বা টেকনিক্যাল শিক্ষাকে বুঝিয়েছে, যা একটা রাষ্ট্রের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দ্বারা সম্পন্ন হয়। উচ্চশিক্ষাকে বিশ্বব্যাংক (২০০০) সাধারণ, মেডিক্যাল, কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষা হিসেবে বুঝিয়েছেন। বাংলাদেশের শিক্ষা কমিশনের বর্ণনায়ও উচ্চশিক্ষাকে সাধারণ, প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তবে কবির চৌধুরী কমিশন (২০০৯) উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষায়িত শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম বদ্বীপ। এ বদ্বীপের উচ্চশিক্ষার অনানুষ্ঠানিক ইতিহাস অতীব প্রাচীন। অতীতে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারের মাধ্যমে এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহোত্তর ইংরেজ শাসকেরা এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার প্রতি একটু মনোযোগী হয় এবং কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বেতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করে। ১৮৫৭ সাল-পরবর্তী ভারতীয়দের সিভিল সার্ভিসে অংশ গ্রহণসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের আইন প্রণয়ন করা হয়।
পরবর্তীকালে ১৮৯৮ সালে লর্ড কার্জন ভারতের বড় লাট নিযুক্ত হওয়ার পর এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার অনুসন্ধানের ব্যাপারে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনে এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার ত্রুটি নিরসনের মাধ্যমে এর যথাযথ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ১৯১৭ সালে মাইকেল সেডলারের নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যায়ল কমিশন শুধু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পটভূমিকা তৈরি করেনি বরং এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের পথ প্রস্তুত করে। তারই হাত ধরে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা বিকাশের পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অর্পিত কলেজভিত্তিক উচ্চশিক্ষার দায়দায়িত্বও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করে।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে সমগ্র পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র প্রসারিত হয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে। উচ্চশিক্ষা ছিল তদানীন্তন সময় প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্বে। তাই পূর্ব পাকিস্তানের সরকার আকরাম খান কমিশন গঠন করে। এ কমিশনের সুপারিশে ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এ অঞ্চলের ২য় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। ১৯৫৯ সালে আতাউর রহমান কমিশন উচ্চশিক্ষার উন্নয়নের ব্যাপারে ব্রিটেন ও আমেরিকার তুলনামূলক ভিত্তিতে অধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬১ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬২ সালে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৯ সালে নুরখান কমিশনের সুপারিশের আলোকে ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কমিশনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ছয়টা বিশ্ববিদ্যালয় (চারটা সাধারণ, দুটি টেকনিক্যাল) ও রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী; রংপুর কারমাইকেল কলেজ, রংপুর; ভিক্টোরিয়া কলেজ, কুমিল্লা; ঢাকা কলেজ, ঢাকা; চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম; এমসি কলেজ, সিলেট; বিএল কলেজ, বরিশাল; এমএম কলেজ, যশোরসহ কিছু প্রতিষ্ঠিত কলেজ নিয়ে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে।
বাংলাদেশের বর্তমান উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার দিক থেকে দুই ধরনের। যেমন—ক) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খ) প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকৃতিগতভাবে বাংলাদেশে বর্তমানে পাঁচ ধরনের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে যেমন—সাধারণ শিক্ষা, মেডিক্যাল শিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা ও বিশেষায়িত শিক্ষা—যা পাবলিক ও প্রাইভেট দুই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে। নিম্নে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার কাঠামো তুলে ধরা হলো :
শিক্ষামন্ত্রী ১৩ জুন ২০২১ থেকে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রাথমিক থেকে কলেজভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশনা দিলেও পরবর্তীকালে তা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়টি আবারও অনির্দিষ্টকালের গণ্ডিতে চলে যায়। উল্লেখ্য, ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার দরুন এইচএসসি/সমমান পরীক্ষা না নিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী অটো পাশ করে। যাদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও বুদ্ধিজীবী মহল চিন্তিত হলেও সম্প্রতি মঞ্জুরি কমিশনের মার্চ ২০২১ বুলেটিনে সব ধরনের উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নের জন্য পর্যাপ্ত আসনের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বেশ আশার আলো সঞ্চার করে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে ভর্তি কার্যক্রমেও দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবত্ ক্যাম্পাসভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ঘরে বসে থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হচ্ছে। শুধু তা-ই নয় তারা ফেসবুকসহ ইন্টারনেট-ভিত্তিক নানা অপরাধমূলক কার্যক্রমে অনেকে জড়িয়ে পড়ছে। যার ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্য। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ২০২০ সালে ভালো রেজাল্ট নিয়ে অটোপাশ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা প্রথমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ছাড়া সরাসরি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে অনীহা দেখাচ্ছে। ফলে অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ই বর্তমানে শিক্ষার্থীসংকটে ভুগছে এবং আর্থিক সংকটহেতু, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। সম্প্রতি ঘোষিত ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিষয়টি একে আরো জটিলতর করে তুলবে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় আর্থসামাজিকসহ নানামুখী সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা টেকসই উন্নয়নের (Sustainable Development) পথে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পাঁচ ধরনের প্রকৃতিগত শিক্ষা কার্যক্রমে পরিচালিত হচ্ছে। তাই এ বহুমুখী উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নের জন্য ক্যাম্পাস-ভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষাকে সমগুরুত্ব প্রদান করতে হবে। এছাড়া ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে উল্লিখিত কর্মমুখী ও বিশেষায়িত শিক্ষার ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। ২০১২ সালের ১৪ মার্চ একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় ও পর্যায়ক্রমে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় ভারত ও পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিসিন প্রোগ্রাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা প্রোগ্রাম হিসেবে স্নাতক পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছে। তবে করোনা মহামারির এ দুর্যোগে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে অব্যাহতি প্রদান করলে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও এতে অধ্যয়নরত লক্ষাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি করোনা মহামারির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অভিভাবকেরা উপকৃত হবে এবং তাদের দ্বারা জাতিকে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী উপহার দেওয়ার প্রচেষ্টাও সফল হবে। একইভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কার্যক্রম চালু করলে সাধারণ জনগণের মধ্যে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও গন্তব্য নিয়ে পুনরায় আশার সঞ্চার হবে।
লেখক:উচ্চশিক্ষা গবেষক ও হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ-এর রেজিস্ট্রার।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
