এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষার মানোন্নয়নে সমৃদ্ধ পাঠাগারের বিকল্প নেই

।। মো. শহিদুল ইসলাম।।

পাঠাগার শব্দটির বিশ্লেষিত রূপ হলো পাঠ+আগার (স্থান) অর্থাৎ পাঠ করার সামগ্রী সজ্জিত আগার বা স্থানকেই পাঠাগার বলা হয় যেখানে থাকে নানা রকম বই,পুস্তিকা,ম্যাগাজিন, সংবাদপত্র ও অন্যান্য তথ্যসামগ্রীর একটি সুবিশাল সংগ্রহশালা ফলে পাঠকরা সহজেই  প্রয়োজনীয় গ্রন্থ ও তথ্য খুঁজে পেতে পারেন।  ক্যামব্রিজ ডিকশনারি অনুসারে পাঠাগার হলো, “A building, room, or organization that has a collection of books, documents, music, and sometimes things such as tools or artwork, for people to borrow, usually without payment’’

জ্ঞান অর্জনের উৎস হলো বই। বিগত, বর্তমান মানুষের চিন্তা, চেতনা, গবেষণা জমা হয়ে রয়েছে বইয়ের পাতায় পাতায়। আর বইয়ের সুশৃঙ্খল সমাবেশ স্থানই হলো পাঠাগার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লাইব্রেরি প্রবন্ধে পাঠাগার সম্পর্কে বলেছেন, ‘কত নদী সমুদ্র পর্বত উল্লঙ্ঘন করিয়া মানবের কণ্ঠ এখানে আসিয়া পৌঁছিয়াছে—কত শত বৎসরের প্রান্ত হইতে এই স্বর আসিতেছে।’ তাই শুধু একাডেমিক সিলেবাসভূক্ত পুস্তক  অধ্যয়নে সীমাবদ্ধ থাকলেই প্রকৃত জ্ঞান অর্জন সম্ভব হবে না।

বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী থেকে জানা যায়, তারা প্রত্যেকেই প্রচুর বই পড়তেন/ পড়েন, পাঠাগারেই কাটতো/ কাটে তাদের দীর্ঘ সময়। একটি কথা হয়তো সকলেরই জানা, ” লিডার্স আর  রিডার্স”। আর যে দেশের পাঠাগার যত উন্নত, সে দেশ ও দেশের মানুষ তত উন্নত। বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের পাঠাগারগুলো লক্ষ্য করলেই সেটি বোঝা যায়, কেন সেসব দেশ শিক্ষায় এত উন্নত যেমন;  ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস (আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত এই পাঠাগারে রয়েছে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ বইয়ের বিশাল সমাহার), লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বডলিন লাইব্রেরি (যেখানে ১ কোটিরও বেশি বই বিদ্যমান), ভ্যাটিকান লাইব্রেরি, ফ্রান্সের বিবলিওথিক লাইব্রেরি, মস্কোর লেনিন লাইব্রেরি, কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি, মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি যেটি পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের মধ্যেও অন্তর্ভূক্ত ছিল।

শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা দেশগুলোতে রয়েছে অনেক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি তথা পাঠাগার ফলে তারা শিক্ষার প্রতিক্ষেত্রে যেমন বিজ্ঞান, শিল্প ইত্যাদিতে সফলভাবে এগিয়ে গেছে।

উন্নত দেশগুলো আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে জ্ঞানের ভাণ্ডার পাঠাগারগুলোকে করেছে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও সময়োপযোগী। তাদের পাঠাগারগুলো অনেক বেশি আধুনিক ও সুসজ্জিত; বইয়ের সংখ্যা, পড়ার পরিবেশে, অবকাঠামো, ইন্টারনেট ব্যবস্থা সব মিলিয়ে খুবই উন্নত।

পাঠাগারই একটি জাতির বিকাশ ও উন্নতির মানদণ্ড নির্দেশ করে। সাধারণ মানুষতো বটেই জ্ঞানী, গবেষক, চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের মানুষের ক্ষেত্রেও পাঠাগারের উপযোগিতা ব্যাখ্যা করে শেষ করা সম্ভব নয় । পাঠাগার হলো জ্ঞান আহরণের অন্যতম সহজ মাধ্যম।

 আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে পাঠাগারের উপযোগিতা উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। এদেশের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র হওয়ার ফলে তাদের সবার পক্ষে খুব বেশি বই কিনে পড়া সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না অথবা একেবারেই সম্ভব হয় না। তবে অমাদের দেশে রয়েছে বই ও বইয়ের সংগ্রহশালা পাঠাগারের যথেষ্ট অভাব। দেশে পাঠাগারের সংখ্যা খুবই অল্প।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৩০০ পাঠাগার রয়েছে। বিদ্যমান ঐসব পাঠাগারও  নানারকম সমস্যায় জর্জরিত। পাঠাগারগুলোর অবকাঠামো মানসম্মত নয়, নেই পর্যাপ্ত সংখ্যক বই। অধিকাংশ পাঠাগারে নেই পর্যাপ্ত সংখ্যক বসার আসন ও বই রাখার স্থান। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো দেশের  অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পাঠাগার সুবিধা নেই, যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার রয়েছে সেগুলোর অধিকাংশই মানসম্মত বা সময়োপযোগী নয়।

বইয়ের সংখ্যা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আয়তন বিবেচনায় পাঠাগারগুলো শিক্ষাক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখতে পারছে না। সমৃদ্ধ পাঠাগারের অভাবে আমরা গবেষণা কর্মেও অনেক পিছিয়ে রয়েছি। মনে রাখা জরুরী সমৃদ্ধ পাঠাগার ছাড়া একটি উন্নত ও আদর্শ জাতি গঠনের স্বপ্ন, মেঘহীন আকাশে বৃষ্টি আশা করার মত।

“শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড”। মানবজীবনে বা কোন সমাজব্যবস্থায় মানুষের মানোন্নয়নের যত উপায় আছে শিক্ষা সেগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান উপায়। কেবল যথাযথ শিক্ষাই পারে ব্যক্তি থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক সর্বোপরি আন্তর্জাতিক টেকসই উন্নয়ন সাধন করতে।

ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়; প্রতিটি উন্নত জাতি ও সমাজব্যবস্থার মানোয়ন্নের পেছনে শিক্ষা দৃঢ় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমান সময়ে লক্ষ্য করলেও দেখা যায়, বিশ্বে সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদানকারী দেশ বা অঞ্চলসমূহ শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে এবং অনেক উন্নত।

শিক্ষা ব্যতীত কোনো জাতি পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি কখনো। পাঠাগারকে বলা হয় সেই শিক্ষার বাতিঘর। প্রমথ চৌধুরীর মতে, ‘লাইব্রেরি হচ্ছে এক ধরনের মনের হাসপাতাল।’ পাঠাগার ব্যতীত কোনো সমাজ তার নাগরিকদের যথাযথ শিক্ষা অর্জন নিশ্চিত করতে পারে না। এজন্যই পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা প্রতিটি সমাজে, প্রতি যুগেই অত্যন্ত অপরিহার্য। পাঠাগার, মানবসভ্যতার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। আর শিক্ষা অর্জনে পাঠাগারের গুরুত্ব অপরিসীম। পাঠাগার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও জ্ঞান পিপাসুদের পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে সাহায্য করে থাকে। পাঠাগার সংস্কৃতি পূর্ণরূপে চালু থাকলে তরুণ প্রজন্ম সুষ্ঠু জীবনধারার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠবে যা কোনো দেশের উন্নয়নের জন্য খুব জরুরি। মনে রাখতে হবে, মানবজীবনে পরিপূর্ণতার জন্য প্রকৃত জ্ঞানের বিকল্প আর কিছুই হতে পারে না।

একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার জ্ঞানের সেই  ক্ষুধা নিবারণ করে সফলভাবে। জনসংখ্যা বহুল বাংলাদেশে আরো অনেক বেশি পাঠাগার স্থাপন করা প্রয়োজন। কাজেই বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অঞ্চলে সরকারি, বেসরকারি, ব্যক্তিগত সমন্বিত উদ্যোগে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে সময়োপযোগি বিশ্বমানের পাঠাগার গড়ে তোলা অতিব জরুরি, একান্ত জরুরি।

লেখক- প্রভাষক (ভূগোল)

রংপুর ক্যাডেট কলেজ, রংপুর ।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.