নিউজ ডেস্ক।।
কোমলমতি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ও অপুষ্টি রোধে চালু করা ‘দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পের’ মেয়াদ চলতি মাসে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত একনেকে অনুমোদনের জন্য পাঠায়নি। অপরদিকে জাতীয় স্কুল মিল নীতি-২০১৯ অনুযায়ী ‘প্রাইমারি স্কুল মিল প্রকল্প’ একনেকে পাস হয়নি। ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) সংশোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই টনাপড়েনের যাঁতাকলে পরে ৩০ লাখ হতদরিদ্র শিশু অপুষ্টির শিকার ও ঝড়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটি চালিয়ে নেয়া।
দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দেশের দারিদ্র্যপীড়িত ১০৪টি উপজেলায় ২০১০ সালে প্রকল্পটি চালু করা হয়। প্রকল্পের অধীনে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন ৭৫ গ্রাম এক প্যাকেট বিস্কুট বিতরণ করা হয়। বিস্কুট থেকে একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন ৩৩৮ কিলো ক্যালরি শক্তি পায়। প্রকল্পটি প্রথম দফায় ২০১০ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাস্তাবায়ন করা হয়। পরবর্তীসময়ে প্রকল্প সংশোধন করে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ১৪২ কোটি ৭৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা। এর মধ্যে জিওবি ৫৯৭ কোটি ৭০ লাখ ৫৭ হাজার ও প্রকল্প সাহায্য ৫৪৫ কোটি ৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
বিস্কুট বিতরণের সফলতার অভিজ্ঞতা থেকে সারা দেশের প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের দুপুরে খিঁচুড়ি দিতে তৈরি করা ‘প্রাইমারি স্কুল ফিডিং প্রকল্প’। প্রকল্পটির অনুমোদনে বিলম্বের কারণে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পটি ব্যয় না বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আরোক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। করোনার কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা যাতে ঝরে না পড়ে সে জন্য শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিস্কুট বিতরণ করেন। ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও জিওবি খাতের ৪৭৩ কোটি ৯ লাখ টাকা বাড়তি থেকে যাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ৩০ জুনের মধ্যে ‘প্রাইমারি স্কুল মিল প্রকল্প’টি একনেকে পাস হবে। কিন্তু গত ১ জুন একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী খিঁচুড়ি বিতরণ বাদ দিয়ে যাচাই-বাছাই করে নতুন করে ডিপিপি তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। নতুন প্রকল্প তৈরি করতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে। এই সময়ে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে বিস্কুট বিতরণ না করলে অপুষ্টি ও ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যে কারণে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পের ব্যয় না বাড়িয়ে আরো এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করে ডিপিই। গত ১০ জুন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবে ডিপিই বলেছে, চলমান স্কুল মিল প্রকল্পটি ৩০ জুন শেষ হয়ে যাবে। আর নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় আগামী মাস থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা সম্ভব হবে না। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়কালীন সময়ে পুষ্টির অভাব পূরণ ও ক্ষুধা নিবারণে স্কুল মিল বিতরণ করা না হলে শিশুদের স্বাস্থ্যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এ ছাড়া চলমান প্রকল্পসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন স্কুল ফিডিং কার্যক্রম পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নযোগ্য মডেল নির্ধারণ এবং ব্যয় প্রাক্কলনের যথার্থতা যাচাই করতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে। অপরদিকে চলমান প্রকল্পের মেয়াদ শেষে ৪৭৩ কোটি ৯ লাখ টাকা বাড়তি থাকবে। এ পরিস্থিতিতে অব্যয়িত অর্থ দিয়ে চলমান প্রকল্পমের মাধ্যমে আগামী এক বছর ৩০ লাখ শিশু শিক্ষার্থীদের উচ্চপুষ্টিমান সমৃদ্ধ বিস্কুট বিতরণ করা সম্ভব হবে। সূত্র জানিয়েছে, ডিপিই ব্যয় না বাড়িয়ে চলমান প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও মন্ত্রণালয় ডিপিপি সংশোধনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠায়নি। গত বুধবার প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুল মিল চালু রাখার মতো দিলেও মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা চাচ্ছেন। তিনি বিকাশ, রকেটের মতো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসারি টাকা দিতে চাচ্ছেন। এর নেপথ্যে রয়েছে ওই কর্মকর্তার কমিশন বাণিজ্যের ধান্ধা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রুহুল আমিন বলেন, আমরা ভেবেছিলাম চলমান প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই নতুন প্রকল্পটি অনুমোদন হবে। কিন্তু সেটি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ডিপিপি সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন। ডিপিপি সংশোধন করতে সময় লাগবে। ৩০ জুন চলমান প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর স্কুল মিল অনিশ্চিত। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর মন্তব্য করে তিনি প্রতিমন্ত্রী বা সচিবের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। কিন্তু সচিবের দপ্তরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সচিব কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বিভিন্ন এনজিও কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় সভা করেন। আর প্রতিমন্ত্রীকে দপ্তরে পাওয়া যায়নি। ফোন করলেও রিসিভ করেননি।
প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় বিস্কুট বিতরণের ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি ও উপস্থিতির হার বেড়েছে। ঝরে পড়া হ্রাস পেয়েছে। সার্বিকভাবে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার উপর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দরিদ্র পরিববারের সন্তানরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ২০১১ সালে বিশ্বখাদ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতাভুক্ত এলাকায় উপস্থিতির হার বৃদ্ধি আট শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বৃদ্ধি পাওয়ায় জেন্ডার রেশিও (ছাত্রীদের বিপরীতে ছাত্র সংখ্যা) এক দশমিক শূন্য এক হতে বেড়ে ১ দশমিক ০৬ হয়েছে। এ কর্মসূচির ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পুষ্টিমান সম্পন্ন বিস্কুট খেয়ে প্রোটিন ঘাটতি কমেছে। অতিদরিদ্র পরিবারের দৈনিক খাদ্য ব্যয় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যা তাদের বার্ষিক আয় ৪ শতাংশ বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, সরকারের একটি সফল প্রকল্প আগামী মাস থেকে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে সারা দেশে স্কুল মিল চালুর অঙ্গিকার রয়েছে। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় দরিদ্র বহু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। বিস্কুটের আশায় এখনো পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিস্কুট বিতরণ হলে তাদের আর বিদ্যালয়মুখী করা যাবে না। যত দিন নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হয় ততদিন প্রকল্পটি চালিয়ে রাখার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
