নিজস্ব প্রতিনিধি।।
‘বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে কিনা তা নিয়ে বলতে গেলে আমাদের কারোরই আসলে খুব একটা মাথাব্যথা নেই। কারণ করোনার পর অন্য বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেখানে অনলাইনে ঠিকমতো ক্লাসই করতে পারছে না সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী বাড়িতে বসেই সফলভাবে শেষ করেছে পুরো একটি লেভেল বা টার্ম।
অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ঠিকমতো ক্লাসই নিশ্চিত করতে ব্যর্থ সেখানে আমাদের পুরো টার্মের ক্লাস, পরীক্ষা এমনকি পরীক্ষার রেজাল্টও প্রকাশ হয়ে গেছে। রেজাল্টের পর নতুন টার্মের ক্লাসও শুরু হয়েছে। তাই করোনার এই মহামারীতে অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো আমরা উদ্বিগ্ন নই।’ করোনার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা নিয়ে কিছু শিক্ষার্থীর দাবি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ঠিক এভাবেই নিজ প্রতিষ্ঠান বুয়েটে অনলাইনে সফল শিক্ষা কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরে কথাগুলো বলছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী রাজিব।
দিনাজপুরের প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দা রাজিব এখন নতুন টার্মের ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত। তবে কথা বলে জানা গেল, কেবল রাজিবই নন। তার মতো দেশের বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রধান এ বিশ^বিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরসহ বিভিন্ন লেভেলের সাত হাজারেও বেশি শিক্ষার্থী করোনার মধ্যেই অনলাইনে নিবিঘ্নে শেষ করেছেন তাদের পুরো একটি টার্ম।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান যেখানে ঠিকভাবে সকলের ক্লাসই নিতে পারেনি, আবার ক্লাস নিতে পারলেও নিতে পারেনি পরীক্ষা সেখানে উচ্চ শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতিষ্ঠান বুয়েট অনলাইনে পরীক্ষা নিয়ে ফলও প্রকাশ করেছে। শিক্ষার্থীরা যাতে বিসিএস পরীক্ষার আবেদনের সুযোগ পায় সে লক্ষে চূড়ান্ত টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার ফলও প্রকাশ করা হয়েছে আগেভাগেই।
প্রাণঘাতী করোনার ছোবলে শিক্ষা ব্যবস্থা যখন অনেকটাই লণ্ডভণ্ড, যখন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ সাফল্য হিসেবে কেবল অনলাইনে ক্লাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তখন টার্ম ২০২০ এর সব শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নিয়ে সফলভাবে ফলও প্রকাশ করল বুয়েট। অনলাইনে শিক্ষাদানের হালচাল নিয়ে বুয়েটের এমন সফলতার চিত্রই পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশংসায় ভাসছে দেশের বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এ প্রতিষ্ঠানটি। এখানে শিক্ষার্থীদের সামনে নেই সেশনজটের আতঙ্ক। এ অবস্থায় বলা হচ্ছে, বুয়েটের কার্যক্রম অন্যদের জন্য হতে পরে অনুকরণীয়।
পুরো কার্যক্রমের সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে যুক্ত আছেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল জব্বার খান। যিনি দায়িত্ব পালনকালে গত কয়েক বছর সার্চ ইঞ্জিন তৈরিসহ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে সরকারী কর্মকমিশনে (পিএসসি) কাজের গতি ও সচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন।
নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে এসে করোনার মধ্যেও বুয়েটের শিক্ষা কার্যক্রম সচলে সন্তোষ প্রকাশ করে অধ্যাপক ড. আবদুল জব্বার খান বলছিলেন, ‘আসলে শতভাগ সফলভাবে অনলাইনে শিক্ষাদান একটু কঠিন, তবে সত্যিকারে উদ্যোগী হলে কাজটি যে অসম্ভব নয় মোটেও তাই প্রমাণ করল আমাদের প্রতিষ্ঠান। ক্লাস হয়ত অনেকেই নিয়েছে। কিন্তু একটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে সব কার্যক্রম সফলভাবে শেষ করা ছিল বড় একটি চ্যালেঞ্জ।’
এক প্রশ্নের জবাবে ড. আবদুল জব্বার খান বলছিলেন, ‘ আমরা করোনা শুরু হলেই হুট করে অনলাইনে কার্যক্রম শুরু করিনি। বরং আগে আগে পুরো কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে তথ্য উপাচার্য যাচাই বাছাইসহ প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আগে নিশ্চিত করে তবেই শুরু করা হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের প্রয়োজনীয় ডিবাইস কিনতে লোন প্রয়োজন তাদের তথ্য আগে নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রত্যেকের জন্য প্রতিমাসে ৫০০ টাকা করে দেয়া হয়েছে ইন্টারনেট ডাটার জন্য। স্মাতকের পাঁচ হাজার ৪৩৬ জন্য ও স্নাতকোত্তরের এক হাজার ৬৯৮ শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের একটি পুরো টার্ম সফলভাবে শেষ করে বুয়েট। থিওরী, ল্যাব, ক্লাস টেস্ট, টার্ম ফাইনালসহ সব কার্যক্রম শেষ হয়েছে সফলভাবে। ফলও প্রকাশ হয়েছে। এখন নতুন টার্মের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। অর্থাৎ বুয়েটে করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার কোন ভয় থাকল না।
অনলাইনে কম বেশি ক্লাস নিশ্চিত করেছে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু অনলাইনে শিক্ষার্থীদের ল্যাব ও পরীক্ষার কাজ কিভাবে সম্ভব করলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলছিলেন, বিষয়টি ছিল আরেকটি চ্যালেঞ্জ। তবে আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারনে আমরা সেই চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি। ল্যাবের ক্লাস নিয়ে প্রয়োজনীয় সকল কিছু ভিডিও করে শিক্ষার্থীদের কাছে দেয়া হয়েছে।
তবে আমাদের ক্লাস শেষেও যে কোন সময় শিক্ষার্থীরা সেই ক্লাস দেখতে পারছে। কেবল তাই নয় গ্রামের বাড়িতে থাকার কারণে অনেক সময় থ্রিজি বা ফোরজি পেতে শিক্ষার্থীর সমস্যা হতে পারে। যা তার ভিডিও দেখার পথে বাধা হয়। এ বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা পুরো টার্মের সব ক্লাসের অডিও পাওয়াও শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করেছি।
টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা কিভাবে নিলেন? এমন প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণ কৌশল তুলে ধরে ছাত্র কল্যাণ পরিচালক বলেন, স্বাভাবিক সময়ে আমাদের পরীক্ষার সময় তিন ঘণ্টা। কিন্তু অনলাইনে পরীক্ষার সময় আমরা নির্ধারণ করেছিলাম দুই ঘণ্টা। পরীক্ষা শুরুর ৫ মিনিট আগে আমরা প্রশ্নটা আপলোড করি।
এরপর দুই ঘণ্টা শেষ হলেই আমরা জানিয়ে দেই এখন লেখা বন্ধ। ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রত্যেক পরীক্ষার সেকশন-এ, সেকশন-বি’র খাতা পিডিএফ ফাইল করে সেন্ড করে দেয় শিক্ষার্থীরা। কারও ইন্টারনেট বা অন্য কোন কারণে সমস্যা হলে আমরা বাড়তি কিছুটা সময় দেই। তবে লেখার জন্য বাড়তি সময়ের কোন সুযোগ নেই। কারণ পিডিএফ করার সময়টা ফাইল থেকেই জানা যায়। বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং তবে আমরা শতভাগ শিক্ষার্থীকে শিক্ষায় রাখতে পেরেছি।’
কথা বলে জানা গেছে, গত বছর মার্চ মাসে করোনা শুরুর পর একটু সময় নিয়ে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করলেও বুয়েটে উদ্যোগ সফল করতে নেয়া হয়েছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না নিয়ে হুট করে অনলাইনে ক্লাস শুরু করে যেখানে থমকে গেছে বুয়েটে সেটা ঘটেনি। অনলাইনে ক্লাস থেকে শুরু করে পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রত্যেকটি কাজে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বিনা সুদে ল্যাপটপসহ ডিবাইস (যাদের প্রয়োজন) কিনতে লোন, মোবাইল সিম ইন্টারনেট সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করেই উদ্যোগে বাস্তবায়নে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
পুরো টার্মের শিক্ষা কার্যক্রম শতভাগ সফল করতে ‘জুম’ ‘মাইক্রোসফট টিম’ ও ‘মডিউল’র মতো প্রয়োজনীয় প্লটিফর্মের সহায়তা নেয়া হয়। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট খরচও দিয়েছে বিশ^বিদ্যালয়। ইন্টারনেট খরচের জন্য দেয়া হয়েছে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে। তবে কাদের কাদের ল্যাপটপসহ ডিবাইস কিনতে লোন, সিম, ইন্টারনেট সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দরকার তা শিক্ষা কার্যক্রম শুরু আগেই যাচাই বাছাই করে নেয়া হয়।
করোনার মধ্যেও শিক্ষা কার্যক্রম বড় ধরনের সঙ্কটমুক্ত রাখতে পেরে খুশি উপাচার্য অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদার। তিনি বলছিলেন, আমরা অনলাইনে ক্লাস থেকে শুরু করে পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রত্যেকটি কাজে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ল্যাপটপসহ ডিবাইস কিনতে সফট লোনের ব্যবস্থা করেছি। মোবাইল সিম ইন্টারনেট সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করেছি। প্রত্যেকের কোন না কোন সিম, ইন্টারনেট প্যাক নিশ্চিত করা হয়েছে। কেউ যদি করোনায় আক্রান্ত হয় তার চিকিৎসা সেবাসহ আর্থিক সহায়তা, পরিবারে কেউ আক্রান্ত হলেও আর্থিক সহায়তা দিয়েছি।
উপাচার্য আরও বলেন, ২৪ ঘণ্টা টেলিমেডিসিন সেবার জন্য আমরা চিকিৎসক রেখেছি। যারা প্রত্যেকে আট ঘণ্টা করে ডিউটি করেছেন। সব কিছু মিলিয়েই আমরা আসলে সফলভাবে শতভাগ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রকাশ করে নতুন টার্মের ক্লাসও শুরু করতে সক্ষম হয়েছি। বিসিএস পরীক্ষার আবেদনের সময় চলে যাবে এমন চিন্তা থেকে আমরা তার আগেই ফল প্রকাশ করেছি যাতে শিক্ষার্থীরা সুযোগটা পেতে পারে।
এদিকে কিছু বিশ^বিদ্যালয়ে যেখানে করোনার মধ্যেই শিক্ষার্থীরা সাভাবিক ক্লাস ও হল খোলার জন্য আন্দোলন করছেন। কোথাও কোথাও হলের তালা ভেঙ্গে ঢুকে পরছেন সেখানে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা আছেন স্বস্তিতে। তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই মত হচ্ছে, হল বন্ধ হলেও আমাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না। বন্ধের কারণে শিক্ষা কার্যক্রমও আটকে নেই।
পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ হয়ে গেছে তাই ঝুঁকি নিয়ে হল খোলা নিয়ে তারা চিন্তিত নয়। কেবল তাই নয়, শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে বলছেন, শিক্ষাগ্রহণ স্বাভাবিক সময়ের সমান ফলপ্রসূ না হলেও অন্য সময়ের তুলনায় এখন তাদের পড়ালেখার ব্যয় অনেক কমে গেছে। হলে থেকে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে শিক্ষা ব্যয় বেশি হলেও এখন সেই ধকল তাদের পরিবারকে সহ্য করতে হচ্ছে না।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা কেন্দ্র হলেও বুয়েট যদি করোনায় শিক্ষার্থীদের ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে পারে তাহলে অন্য পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় কেন পারছে না? বঙ্গবন্ধু ডিজিটাল ইউনিভার্সিটিসহ তুলনামূলকভাবে ছোট দু‘একটি বিশ^বিদ্যালয় এক্ষেত্রে সফল হলেও অধিকাংশই কেন এ উদ্যোগে নেই? যদিও এর জন্য উদ্যোগ ও নেতৃত্বের অভাবকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
