হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা শিক্ষার্থীরা হতাশ

আদনান চৌধুরী।।

করোনা প্রায় স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসলেও করোনার শুরুর দিকে লকডাউনে বন্ধ হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো খোলা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে পিএসসি, জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছে। এমনকি এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ন্যূনতম মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে পূর্ববর্তী রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করে রেজাল্ট প্রকাশের ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। সামনে আসছে এসএসসি পরীক্ষা, করোনা নিশ্চয়ই তখনো থাকবে; দেখার বিষয় তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের কি চমক উপহার দেয়।

এছাড়া নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে, সেশন জট তৈরির সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এমতাবস্থায় হল/বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া, পরীক্ষা নেওয়ার দাবি উঠেছে ছাত্রদের থেকে। সেই দাবিকে প্রশমিত করতে হল/বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে পরীক্ষা নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ, অসন্তোষ হতাশা তৈরি করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের চরমভাবে হতাশ করেছে। হল না খুলে পরীক্ষা নিতে হলে ছাত্ররা পনেরো থেকে বিশ দিনের জন্য নিশ্চয়ই বাসা ভাড়া পাবে না, অসংখ্য শিক্ষার্থীর ঢাকায় থাকার মতো কোনো আত্মীয় নেই, এমতাবস্থায় হোটেল ভাড়া দিয়ে থাকা খাওয়ার সামর্থ্য, সক্ষমতা যে অনেকের নেই, তা আমরা কীভাবে ভুলে যেতে পারি! ছাত্ররা এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরতে চায়, আক্ষেপের সুরে অনেকে বলে ‘করোনা কি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে?’ আমরা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছি, আমরা করোনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বুঝতে হয় চেষ্টা করিনি নতুবা ব্যর্থ হয়েছি। এক মাস এক মাস করে ছুটি বাড়ছে, ছাত্ররা আশা করছে এই বুঝি খুলছে, তখন আবার এক মাসের ছুটি ঘোষণা হয়। এভাবে ছাত্ররা অনিশ্চয়তায় ভুগছে।

দ্বিতীয়ত, করোনার প্রথম থেকে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা হয়েছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু অনলাইনে ক্লাস পরীক্ষা চালিয়ে যাবার মতো যে ধরনের প্রযুক্তিগত জ্ঞান, দক্ষতা, উন্নতি দরকার তা আমাদের মধ্যে যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যেখানে অনলাইন ক্লাস চালাতে অনেকক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হয়, যেখানে কলেজ মাদ্রাসার শিক্ষকদের একাংশ এন্ড্রোয়েড, অনলাইন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত নয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের বিশাল একটা অংশের এন্ড্রোয়েড মোবাইল নেই, করোনার দুরবস্থায় উচ্চমূল্যে নেট কিনার সামর্থ্য নেই, এমনকি সব ব্যবস্থা হওয়ার পরও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্বল নেট দ্বারা অনলাইন ক্লাস চালিয়ে যাওয়া অনেকের জন্য অসম্ভব। ফলে অনলাইন ক্লাস যেখানে উচ্চবিত্তের জন্য সুবিধা সেখানে নিম্নবিত্তের জন্য বিলাসিতা।

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস করার জন্য মোবাইল, ল্যাপটপ, ডেটাপ্যাক দেবার কথাও শুনেছিলাম, তালিকাও নেওয়া হয়েছে, ইতিমধ্যে বছর চলে যাচ্ছে, সেসবের কি অবস্থা কে জানে!

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন কোর্সের ম্যাটেরিয়ালসগুলো বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, ডিপার্টমেন্ট লাইব্রেরি, সেমিনার থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে দুষ্প্রাপ্যতা, অধিক দাম কিংবা আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন অনেকের জন্য এসব বই-পত্র কিনাও সম্ভব নয়। এ ধরনের এক বাস্তবতায় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নামমাত্র অনলাইন ক্লাসের ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করছে বিশ্ববিদ্যালয় বা হল না খুলেই!!

এ বাস্তবতা এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই যে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত অধিকাংশ ছাত্র প্রাইভেট, টিউশন, পার্টটাইম জব করে নিজেদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় নির্বাহ করে। করোনার কারণে তারা উপার্জনহীন অধিকন্তু কিছু ক্ষেত্রে পরিবারের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে আছে। হল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খুলে পরীক্ষা নেওয়াটা সেসব ছাত্রদের জন্য, অবিচার, অমানবিক-ই বটে।

করোনাকালীন দীর্ঘ বন্ধে আমরা কার্যকর কোনো পদ্ধতি বের করতে পারিনি, যার মাধ্যমে অনলাইনে সব শিক্ষার্থীকে ক্লাসের আওতায় আনা যায়, পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যায়। আমরা সবাই বসে বসে অপেক্ষা করছি কবে করোনা বিদায় হবে, তারপর আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলব, আমরা পরীক্ষা নিব বা দিব!

আর সব ধরনের প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড সর্বত্র যখন অবাধে চলছে, তখন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা অযৌক্তিক। যেহেতু শিক্ষার্থীরা (কম বয়স্ক) করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কম, যেহেতু দেশের সবচেয়ে সচেতন এবং সতর্ক অংশ শিক্ষার্থীরা এবং যেহেতু সহসা পৃথিবী করোনামুক্ত কোনো নিশ্চয়তা নেই, সেহেতু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। সেটা করতে ব্যর্থ হলে অন্তত সব শিক্ষার্থীকে অনলাইন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অনলাইনে মূল্যায়নের সর্বজনীন পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত।

 লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.