শিক্ষায় তরল বুদ্ধিমত্তা বিকাশে করণীয়

ড. মো. নাছিম আখতার।।

একটি জাতীয় দৈনিকের খবরের শিরোনাম—‘উচ্চ মাধ্যমিকেও থাকছে না মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য।’ খবরে প্রকাশ—একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে সায়েন্স, কমার্স ও আর্টস বিভাজন থাকবে না। উচ্চশিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত বিষয় পড়ার ক্ষেত্র শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে উন্মুক্ত। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের একজন স্বনামধন্য অধ্যাপকের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাঠ্যক্রম পরিমার্জন একটি বড় পরিবর্তন।

এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে নিশ্চয়ই আলোচনা, পরামর্শ করে এ পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে দক্ষতা তৈরিতে। তিনি বলেন, এখন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ছেলেমেয়েরা পদার্থ, রসায়ন ও উচ্চতর গণিতে পড়াশোনা করে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, সেখানে তাদের দক্ষতা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই।

তিনি আরো বলেন—সায়েন্স, কর্মাস ও আর্টস বিভাজন থাক বা না থাক, কারিকুলামে যে ধরনের পরিমার্জন হোক না কেন সেটিতে যেন দক্ষতাকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমিও স্যারের সঙ্গে একমত পোষণ করি।

কেন করি তা নিম্নোক্ত আলোচনায় তুলে ধরলাম।মানুষের বুদ্ধিমত্তা প্রধানত দুইটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন মনোবিদ রেমন্ড বি ক্যাটেল। ক্যাটেলের শ্রেণিবিভাগ করা দুই ধরনের বুদ্ধিমত্তা হলো: ক্রিস্টালাইজড ইন্টেলিজেন্স বা স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা এবং ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্স বা তরল বুদ্ধিমত্তা। স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা হলো সেসব বুদ্ধিমত্তা যা আমরা সারাজীবন ধরে শিখি বা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জন করি।

আর তরল বুদ্ধিমত্তা হলো আপনার অন্তর্নিহিত সমস্যা সমাধানের বুদ্ধিমত্তা বা স্বতঃলব্ধ জ্ঞান। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত বই Intelligence: Its Structure, Growth, and Action-এ এমন নামকরণের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ক্যাটেল।

তিনি সেখানে লিখেছেন, তরল বুদ্ধিমত্তা হলো তরল, কেননা তরল পদার্থ যেমন যে পাত্রে রাখা হয় সেই পাত্রের আকৃতি ধারণ করে, অনুরূপভাবে তরল বুদ্ধিমত্তাকে নতুন ধরনের যে কোনো সমস্যা সমাধানের কাজে লাগানো যায়। অপরদিকে স্ফটিকের নিজস্ব আকৃতি আছে, তাই যে পাত্রেই রাখা হোক না কেন, সেটি নিজের আকৃতিই অক্ষুণ্ন রাখবে।

স্ফটিক বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে তাই নির্দিষ্ট কিছু সমস্যায় একই ধরনের সমাধানই করা যায়। তরল বুদ্ধিমত্তার একটি সুন্দর সংজ্ঞা দিয়েছেন লেখক ও প্রশিক্ষক ক্রিস্টোফার বার্গল্যান্ড। তরল বুদ্ধিমত্তা হলো যে কোনো অভিনব পরিস্থিতিতে যৌক্তিকভাবে চিন্তা করা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, যা পূর্বলব্ধ জ্ঞানের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন।

‘তরল বুদ্ধিমত্তায় অন্তর্ভুক্ত থাকে অভিনব সমস্যার নকশা শনাক্ত করা এবং সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পর্ক খুঁজে বের করা এবং যুক্তির সাহায্যে বিষয়গুলোকে বিশ্লেষণের ক্ষমতা।’

গবেষণায় দেখা গেছে—চর্চা ও অনুশীলনে বাড়তে পারে তরল বুদ্ধিমত্তা। সৃজনশীল চিন্তা, নতুন কাজের সন্ধান, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, নতুন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও প্রযুক্তির ওপর অতি নির্ভরশীল না হওয়া ইত্যাদি তরল বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়।

সৃজনশীল চিন্তা মানে হলো জাগতিক আটপৌরে চিন্তার বাইরে বিভিন্ন আউট অব দ্য বক্স চিন্তা করা অর্থাত্ যে ধরনের চিন্তা সচরাচর কেউ করে না এবং যেসব চিন্তার মাধ্যমে নতুন কিছু আবিষ্কার বা উত্পাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

চিন্তা কখনো এক জায়াগায় স্থির থাকে না। তাই কেউ যখন একটি নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা করবে, তারই সূত্র ধরে নতুন নতুন আরো নানা চিন্তার আগমন ঘটবে। বিভিন্ন সমস্যাও এসে উপস্থিত হবে এবং সেসব সমস্যা সমাধানের জন্য মস্তিষ্ককে ব্যবহার করা যেতে পারে। এভাবেই সৃজনশীল চিন্তার মাধ্যমে সক্রিয় রাখা যাবে তরল বুদ্ধিমত্তাকে।

কিন্তু আমাদের দেশে কী হচ্ছে? সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে শত শত গাইড বই। তরল বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে অজানা বিষয়ের গ্রহণযোগ্য সমাধানের যোগ্যতা উন্নয়নের মধ্য দিয়ে; কিন্তু গাইড বইয়ের কল্যাণে শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকগণও মূল বই ছেড়ে গাইডবই-নির্ভর হয়ে পড়েছেন। ফলে সৃজনশীল মেধা বিকাশের নামে যে পদ্ধতি চালু আছে তা কতটুকু কার্যকর তা ভেবে দেখা দরকার।

আগের শিক্ষা পদ্ধতিতে আর যা-ই হোক ভিত্তি জ্ঞানগুলোর পুনঃপুন অনুশীলনের মাধ্যমে স্ফটিক বুদ্ধিমত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছে। তাই তো জানা বিষয়ে প্রশ্ন করলে তখন ছাত্ররা প্রত্যয়ের সঙ্গে উত্তর দিত; কিন্তু এখন যেহেতু বইয়ের মতো প্রশ্ন হয় না, তাই পুনঃ অনুশীলনের মাধ্যমে প্রস্তুতি দরকার হয় না। আর তরল মেধাবৃদ্ধির জন্য যে সৃজনশীল প্রশ্ন তাও গাইডবইয়ের বদৌলতে আর অজানা কিছু নয়। তাই স্ফটিক ও তরল উভয় জ্ঞানের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে নতুন প্রজন্মের মধ্যে।

প্রযুক্তির ওপর অতি নির্ভরশীলতা তরল বুদ্ধিমত্তা কমায়। বলুন তো, ১৮৪৫-এর সঙ্গে ২৪১ যোগ করলে কত হয় অথবা ২৫ কে ১৬ দিয়ে গুণ করলে কত হয়? উত্তরটি বের করার জন্য আপনি সম্ভাব্য দুইটি কাজ করতে পারেন। প্রথমত, নিজের মনেই হিসাব করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন।

একবিংশ শতকের মানুষ হিসেবে আপনি হয়তো ক্যালকুলেটরে হিসাব করাকেই বেশি প্রাধান্য দেবেন। কারণ তাতে আপনার সময় বাঁচবে, আর শতভাগ সঠিক হওয়ার নিশ্চয়তাও মিলবে; কিন্তু এটি এমন কঠিন কোনো গাণিতিক হিসাব নয়, যেটি করার জন্য আপনাকে মস্তবড় গণিতজ্ঞ হতে হবে। একটু মনোযোগী হলে সর্বোচ্চ ১০ সেকেন্ডেই আপনার পক্ষে উত্তরটি বের করে ফেলা সম্ভব। আর শতভাগ সঠিক হওয়ার নিশ্চয়তা চাইছেন?

সেটিই বা কেন? এমন সহজ একটি হিসাবেও আপনার ভুল হয়ে যেতে পারে, নিজের প্রতি এতটা অনাস্থা থাকলে জীবনে বড় কিছু করবেন কীভাবে! তাই এখন থেকে শুধু গাণিতিক হিসাবই নয়, দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আগে নিজের মস্তিষ্ককেই কাজ করতে দিন।

যদি না পারেন, তাহলে প্রযুক্তি তো আছেই আপনাকে সাহায্য করতে; কিন্তু শুরুতেই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাবেন না, এতে করে একদিন পুরোপুরি প্রযুক্তির দাসে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া মস্তিষ্ক কোনো বিলাসদ্রব্য নয় যে, ব্যবহার করলে তাড়াতাড়ি নষ্ট হবে বরং এটি সেই নিত্যব্যবহার্য জিনিস, যা অব্যবহারে জং ধরে যায়।

বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখলাম পাটিগণিত অঙ্কের সাংখ্যিক মানগুলোকে বেশ বড় সংখ্যায় দেওয়া হয় যা সমাধানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পরীক্ষার হলে ক্যালকুলেটর ব্যবহারের অনুমতি আছে। ফলে শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছে তরল বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির নিরন্তর সুযোগ।

আমার মতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাটিগণিতের সাংখ্যিক মানগুলোকে ছোট রেখে ক্যালকুলেটরের পরিবর্তে কাগজে-কলমে হিসাব করানোর অভ্যাস শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে তোলা উচিত। এতে নিজের অজান্তেই শিক্ষার্থীদের তরল বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। এর সঙ্গে অনুশীলনের পরিমাণ বাড়িয়ে স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। তবেই ঘটবে জাতির সার্বিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশ।

 লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.