ঝুম ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে চারিদিকে। পুকুর, রাস্তা সব কিছু পানিতে টল টল করছে। এর মধ্য দিয়ে আবার স্কুলের পেছনের ডোবা থেকে আসছে ব্যাঙের কোয়াক কোয়াক আওয়াজ। তবে সব থেকে মজার বিষয় হচ্ছে- এই বর্ষার মাঝে রেবা ম্যাডাম আমাদের ব্যাঙের জীবনচক্র পড়াচ্ছেন। যদিও আমি এর কিছুই বুঝতে পারছি না। আবার ম্যাডামকে বলতেও পারছি না। বলতে গেলে ম্যাডাম ধপাধপ করে মারতে শুরু করবেন। তার থেকে বরং চুপ করে থাকাই ভালো। পরে না হয় ব্যাঙের কাছ থেকেই শুনে নেওয়া যাবে কীভাবে তার জীবনচক্র হয়! কিন্তু ব্যাঙের কথা কি আমি বুঝবো? ব্যাঙ তো শুধু কোয়াক কোয়াক করে।
“ কেয়া?”
“জি ম্যাডাম!”
“বল, আজকের পড়া কী?”
“ব্যাঙের জীবনচক্র”
“আচ্ছা, ঠিক আছে! সবার যেন পড়া মনে থাকে। কালকে পড়া না হলে সবাইকে কিন্তু চারটা করে মার খেতে হবে। মনে থাকে যেন।” রেবা ম্যাডাম এ কথা বলে চলে গেলেন।
টিং টিং টিং !!! ছুটির ঘন্টা পড়ে গেল। এখনও বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম ঝুম করে না, টুপ টুপ করে। তবে আমার ঝুম ঝুম করা বৃষ্টিই বেশী ভালো লাগে। আজকে বাসায় গিয়ে খুব ভালো করে ব্যাঙের জীবনচক্র পড়তে হবে। কালকে পড়া না হলে রেবা ম্যাডাম খুব রেগে যাবেন। ম্যাডাম যে জোরে জোরে মারেন খুব ব্যথা লাগে। ব্যথা লাগলে বলারও উপায় নেই। বললে আরও জোরে মারবে ম্যাডাম। যাই হোক, কালকে যেকোন ভাবে হলেও পড়া দিতে হবে। আজকে মাকে গিয়ে বলবো কোনো কাজ করব না, আমাকে পড়তে হবে। “কেয়া, এই কেয়া, এদিকে আয় তো!” মা ডাকলেন।
“কী হলো, মা?”
“যা তো গুরুগুলোকে মাঠ থেকে নিয়ে আয়, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যে হতে গেল তো।”
মা, আজকে না, আমাকে একটু পড়তে হবে, পড়া না হলে কাল ম্যাডামের কাছ থেকে মার খেতে হবে। পড়া এখন না করলে কিছু হবে না, যা এখন গুরুগুলোকে নিয়ে আয় মাঠ থেকে। কী হলো দাঁড়িয়ে দেখছিস কী, তাড়াতাড়ি যা।
কেয়ার মা কোনভাবেই বুঝতে চায় না ব্যাঙের জীবনচক্র পড়াটা কতটা জরুরী! কেয়া জানে গুরুগুলোকে মাঠ থেকে আনতে আনতে নির্ঘাত অনেক দেরি হয়ে যাবে। রাত আটটা বেজে গেছে। কেয়া ব্যাঙাচির জীবনচক্র মাত্র পড়তে শুরু করেছে।
“কেয়া, এদিকে আয় তো দেখি!” মায়ের ডাক পড়ল।
“কী হলো, মা”
“আয়, এখানে বস, এখানে বসে ধানগুলো ঝাড় দে তো।”
“মা, আজ আমি পারবো না, আমাকে পড়তে হবে। আমি কাল করে দিবো।”
“কী কাল করবি! এখনি বসে আমার সাথে ধানগুলো ঝেড়ে দে তো দেখি।”
“মা, কাল পড়া না হলে , স্কুলের ম্যাাডাম খুব মারবে।” আর তুই আমার কথা না শুনে দেখ, তো অবস্থা আমি কি করি, নে বস আমার সাথে।
কেয়া আর কি করবে? চুপচাপ হয়ে ধান ঝাড়তে মায়ের পাশে বসে পড়ল। এদিকে দেখতে দেখতে রাত বারোটা বেজে উঠল। মায়ের সাথে ধান ঝাড়ার পর্ব শেষ। কেয়ার দু’চোখ এখন ঘুমে নিঝুম। ব্যাঙাচির জীবনচক্র এখন আর তার মাথায় নেই।
কু, কুরু, কু মোরগ ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। সকাল নয়টা বাজে এখন। কেয়ার ঘুম এখনো ভাঙ্গেনি। এদিকে স্কুলের সময়ও হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে মায়ের ডাকাডাকি শেষে ঘুম থেকে উঠে পড়ল কেয়া। কিন্তু সে আজ স্কুলে যাবে না।
“কীরে, জামা কাপড় পড়ে স্কুলে যা, কেয়ার মা চেঁচিয়ে বলল।”
“না, আমি স্কুলে যাব না, আমার পড়া হইনি আজ।”
“পড়া হয়নি তো কি হয়েছে? যা স্কুলে যা।”
“না, রেবা ম্যাডাম অনেক মারবেন পড়া না হলে, আমি স্কুলে যাব না।”
এই কথা কেয়া বলার সাথে সাথেই শুরু হলো কেয়ার মায়ের মার। যতবারই কেয়া বলছে সে স্কুলে যাবে না, ততবার তার মা কেয়াকে এসে মেরেই যাচ্ছে, তবুও কেয়া স্কুলে যেতে রাজি নয়। কেয়া কাঁদতে কাঁদতে যখন প্রায় নিশ্চুপ হয়ে গেল তখন কেয়ার মা জোর করে করে তাকে স্কুলের জামা পরাতে শুরু করে দিল। কোন উপায় না দেখে কেয়া চোখ মুছতে মুছতে স্কুলে গেল।
রেবা ম্যাডামের ক্লাস শুরু হলো। প্রায় সবাই ব্যাঙের জীবনচক্র পড়াটা বলতে পারল। কিন্তু কেয়া পারল না। “কেন পারল না? সে কথা ম্যাডাম বুঝতে চাইলেন না।” বরং কেয়া অযুহাত দিচ্ছে বলে আরো দুইটা বাতের মার বেশি দিল। কেয়ার হাত ফুলে গেছে। একেবারে লাল। তার চোখ দিয়ে আর জল পড়ছে না, কান্না সব চুপ হয়ে গেছে। ছুটির ঘন্টা পড়ল টিং টিং টিং।
বৃষ্টি পড়ছে। টুপটাপ করে না, ঝুমঝুম করে! যেমনটা কেয়ার পছন্দ। কিন্তু আজ কেয়ার বৃষ্টি ভালো লাগছে না, বলা যায় কিছুই ভালো লাগছে না। তার মনে অনেক অভিমান। অভিমান তার মায়ের উপর, তার ম্যাডামের উপর, ওই ব্যাঙের উপর। কেয়ার বৃষ্টি পানি আজ কেন জানি নোনতা নোনতা লাগছে? আচ্ছা , এটা কি বৃষ্টির পানি ,নাকি বৃষ্টি ভেজানো কেয়ার চোখের পানি?
অনন্যা সাহা
৯ম শ্রেণি,বিজ্ঞান বিভাগ।
আট্টাকা কে আলি পাইলট মাঃ বিদ্যালয়
ফকিরহাট,বাগেরহাট।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
