কোন কাজ বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা বাস্তবায়ন করার জন্য যিনি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন তাকে উদ্যোক্তা বলা হয়। অর্থাৎ উদ্যোক্তা হল সংগঠক।উদ্যোক্তা হলো নিজ আগ্রহে নিজে কোন কিছু প্রতিষ্ঠা করা।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এদেশের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। এটি একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রধানমন্ত্রীর কর্তব্য এবং তার দূরদর্শিতার পরিচায়কও বটে। কিন্তু এ দেশের বাস্তবতায় এটি কতটা প্রয়োগযোগ্য?
তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তরুণ উদ্যোক্তা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি কমছে। কিন্তু এই ঝরে পড়ার কারণ বিশ্লেষণ করছেই বা কজন।উদ্যোক্তা হতে আগ্রহ আছে অনেকের আবার বিভিন্ন বাঁধার জন্য পিছিয়ে পড়ছে অনেক স্বপ্ন বাজ তরুণ।
বাঁধার মধ্যে রয়েছে, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কোন প্রকার সাপোর্ট না পাওয়ার জন্য।
উদ্যোক্তা হতে আগ্রহ তৈরিতে বাঁধা রয়েছে পরিবার ও সমাজের। যেমন,বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এই কাজ করতে হয়, এসব ব্যবসা করতে হবে তাহলে পড়াশোনা কেন করলো।এজন্য তরুণ সমাজ উদ্যোক্তা হতে আগ্রহ ও ইচ্ছা দুটিই হারায়।আর রাষ্ট্রীয় ভাবে কোন সহযোগীতা না পাওয়াতেও ইচ্ছে হারায় তরুণ উদ্যোক্তারা।
দেশে শ্রম অনেক সস্তা হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি খাতে কাঙ্খিত বিনিয়োগ আসেনি বাধাগুলো দূর না হওয়ায়। নীতি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে বিরাট ফারাক। তাই বাংলাদেশ এখনও উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত বন্ধুর। উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে নানারকম প্রশাসনিক জটিলতা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও উদ্যোক্তাবান্ধব নয়। দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ৯০ শতাংশ উদ্যোগই কৃষিভিত্তিক। অর্থাৎ জমির মালিক না হলে ব্যবসা শুরু করা মুশকিল। আর অধিকাংশ শিক্ষিত তরুণ পারিবারিক সূত্রে নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। তাদের পড়াশোনাই চলে একমাত্র সম্বল সামান্য জমির ওপর নির্ভর করে বা জমি বিক্রির টাকায়।
সবচেয়ে বড় কথা, উদ্যোক্তা হওয়া বা বানানো কোনো রাতারাতি স্বপ্নলব্ধ প্রক্রিয়া নয়। এজন্য তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশের জাতীয় বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা তৈরির স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো কোর্স নেই। হয় না কোনো গবেষণা বা সেমিনার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খবরের শিরোনাম হন থিসিস কপি করে, গবেষণা বা আবিষ্কার করে নয়।
চাকরি মুখী শিক্ষা ব্যবস্থা আরো বেশি বাঁধা তরুণ উদ্যোক্তাদের।শিক্ষা ব্যবস্থায় উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় ভাবে বিভিন্ন সহযোগিতা এবং সঠিক
তরুণ উদ্যোক্তাকে সাহায্য করার মাধ্যম উদ্যোক্তা তৈরি করা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে উদ্যোক্তা কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, সেমিনার আয়োজন করা উচিত।
এমন শিক্ষাব্যবস্থার গর্ভ থেকে রাতারাতি লাখো উদ্যোক্তা বেরিয়ে আসবে এ কল্পনা অবাস্তব। তাছাড়া অধিকাংশ ব্যাংক ঋণ দেয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে, হয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকা, জামানত হিসেবে জায়গার দলিল প্রদান করা, নয়তো গ্যারান্টার থাকা। কিন্তু তরুণদের একটা বড় অংশ নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের, যাদের ব্যবসা শুরু করার পুঁজি বা সম্পত্তি কোনোটাই নেই।
মেয়েদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়া আরও দুরূহ, থাকে নানারকম পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। দেশে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ কণ্টকাকীর্ণ, অনুকূলে নয়। প্রতিষ্ঠিত বা পরীক্ষিত পথে ব্যবসা করলেই উদ্যোক্তা হওয়া যায় না। একজন উদ্যোক্তা তার রাস্তা নিজে তৈরি করেন।
এখানে ঝুঁকির সম্ভাবনা শতভাগ। তাই যারা এ পথে হাঁটার সাহস করেন তাদেরকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিতে হবে। নিতে হবে কার্যকর সব উদ্যোগ। কিন্তু বিষয়টা রীতিমতো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
অভিজ্ঞতা বলে, স্বল্প পুঁজি নিয়ে দরিদ্র পরিবারের যে শিক্ষিত তরুণরা ভালো উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাদের মধ্যে শতকরা পাঁচজনই সফল হয় না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকি। যেমন, কেউ একজন মাছের চাষ বা গরুর খামার করল, কোনো কারণে মাছ বা ওই গরুগুলো মরে গেলে হতাশাগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্তদের পাশে কি কেউ দাঁড়ায়? সভা, সমাবেশ ও সেমিনারে আমরা বলতে পারি- উদ্যোক্তা হও, দেশ গড়ো। কিন্তু এর প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক ক’জন?
উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উপরোক্ত বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করে এর জন্য একটা অনুকূল ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রণয়ন করতে হবে যুগোপযোগী নীতিমালা। তবে এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হওয়ায় দেশের বর্তমান অপার সম্ভাবনাময় ও শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে চাকরি ক্ষেত্রে কাজে লাগানোই উচিত। এতে করে অন্তত বর্তমান প্রজন্ম কর্মে প্রবেশের মাধ্যমে দেশকে বেকারত্ব থেকে কিছুটা মুক্তি দিতে পারবে। আর এই জনশক্তির অপচয় রোধকল্পে চাকরিতে প্রবেশের সুযোগটা দ্রুত উন্মুক্ত করে দেয়াই যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করছি।
যত বেশি উদ্যোক্তা তৈরি হবে তত বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং তত বেকার সমস্যা কমবে।তাই সরকার এর এই তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে আগ্রহ দেখাতে হবে। এতে শিক্ষিত যোগ্য উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব।
লেখক-
শিক্ষার্থী
ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ,
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
