এইমাত্র পাওয়া

নওগাঁর জাহাঙ্গীরপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজটি নারী শিক্ষার বাতিঘর

মোঃ রফিকুল ইসলাম, মহাদেবপুর( নওগাঁ) প্রতিনিধি  ।।

রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্হিত জাহাঙ্গীরপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজটি নারী শিক্ষার বাতিঘর নামে নওগাঁ জেলার একমাএ প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৪ সালে সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিগন জনাব সরদার মো: আব্বাস আলী, জসিম উদ্দীন, জাবেদ আলী, জয়েন উদ্দীন ও বাবু গনেশ চন্দ্র ব্যানারজীর দান করা জমির উপর গড়ে ওঠে নারীবান্ধব এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মোট জমির পরিমান ৩৭৬ শতক।

ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটির নামকরণে ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, মুঘলসম্রাট জাহাঙ্গীরের বদান্যতায় জমিদারি প্রাপ্ত এখানকার জমিদারগন সমগ্র ইংরেজ আমলে তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি অক্ষন রাখেন। মুঘল আমল ও ইংরেজ আমল হতে এখানকার জমিদার ও তাঁর পূর্বপুরুষদের একটা অর্থবহ গুরুত্ব সম্প্রসারিত হলেও মুঘলসম্রাট জাহাঙ্গীর এর প্রভাব ও কম ছিল না। সম্রাটের নামানুসারে এখানে জাহাঙ্গীরপুর নামক পরগনার উদ্ভব ঘটে। যা পরবর্তীকালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে এখানে জাহাঙ্গীরপুর পরগনার সাথে মিল রেখে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরপুর।

উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীরপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ (মাধ্যমিক শাখা) স্হাপিত হয় ইংরেজি ১৯৭৪ সালে। তৎকালিন প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন মরহুম কাজী আফতাব উদ্দীন আহম্মেদ নিবাস রহিমপুর, মহাদেবপুর।

পরবর্তীকালে ১৯৯৬ সালে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জনাব মোঃ সামছুর রহমান মৃধা সাহেবের প্রচেষ্টা এবং গর্ভনিং বডির সার্বিক সহযোগিতায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নিতকরণ করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গত ২৪/০৯/২০১৮ ইং তারিখে জাতীয়করণের সরকারি আদেশ ( জি ও) জারি করা হয়।

বর্তমান এ প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪২২ জন। মাধ্যমিক শাখায় ৫৩৩ জন এবং উচ্চ মাধ্যমিক শাখায় ৮৮৯ জন। যা নওগাঁ জেলায় উপজেলা পর্যায়ে সংখ্যার দিক থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে। শিক্ষার গুনগত মান ও ফলাফলে দিক থেকেও অনেক এগিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৮ ইং সালে মাধ্যমিক শাখায় এস এস সি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১০৩ জন। উত্তীর্ন হয়ছে হয়েছে ৮৯ জন। A+ পেয়েছে ১২ জন। উচ্চ মাধ্যমিক শাখায় এইচ এস সি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৪০ জন । উত্তীর্ণ হয়েছে ২৬৮ জন। A+ পেয়েছে ৯ জন। ২০১৯ ইং সালে মাধ্যমিক শাখায় এস এস সি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১০৪ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৯৫ জন। A+ পেয়েছে ৬ জন। এবং উচ্চ মাধ্যমিক শাখায় এইচ এস সি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৬৫ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২৬৭ জন। A+ পেয়েছে ৮ জন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্হিত কাটাতার যুক্ত উচুপ্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত এবং বিশাল জায়গা জুরে গড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানের মূল ক্যাম্পাসটি । বৃক্ষরাজীতে ভরা ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম এবং কোলাহলমুক্ত। পুর্ব দিকের জলাধারের নির্মলবায়ু মনকে ভরে দিবে প্রশান্তির ছায়া। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিরাট খেলার মাঠ। উত্তর প্রান্তে সদ্য নির্মিত হয়েছে ৪ তলা বিশিষ্ট একটি দৃষ্টিনন্দন আই সি টি ভবন, যা সবার নজরকারার মত। পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে প্রশাসনিক ভবন যার ২ য় তলায় উচ্চ মাধ্যমিক শাখার বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাব। দক্ষিণ ও পূর্ব প্রান্তে এল প্যাটানে ২০ কক্ষ বিশিষ্ট আরো একটি দ্বিতল ভবন। এই ভবনে রয়েছে মাধ্যমিক শাখার বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব, সততা স্টোর, ২ টি হল রুম ও শ্রেণিকক্ষ। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্হাসহ মানসন্মত স্যানিটেশন সুবিধা বিরাজমান। ক্যাম্পাসে এসে পড়াশুনার জন্য আধুনিক ডেকোরেশন সমৃদ্ধ রিডিং রুমসহ একটি লাইব্রেরী রয়েছে। দুই শাখার জন্য আলাদা আলাদা প্রজেক্টর এর মাধ্যমে ভিজুয়ালী পাঠদানসহ পুরো ক্যাম্পাসটি সিসি ক্যামারা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

সহকারী অধ্যাপক জনাব স ম আসাদুজ্জজামান সাহেব শিক্ষাবার্তাকে জানান, এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পিছনে রয়েছে শিক্ষকদের পাঠদানের ক্ষেএে যঠেষ্ট মনোযোগী ও কলেজের যেকোন প্রয়োজনে আন্তরিক ভাবে সহযোগিতায়পূর্ন ভূমিকা । তিনি আরো বলেন, বর্তমানে সুযোগ্য ও সুদক্ষ অধ্যক্ষ স্যার জনাব মোঃ নাজিম উদ্দীন মিঞা সাহেবের সঠিক দিক নির্দেশনা এবং তাঁর সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছতাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার অনুকুল পরিবেশ এবংশিক্ষার গুনগত মান ফিরে আনাসহ নিজেকে সম্পূর্ণ আত্ন- নিয়োগের মাধ্যমে যথাসাধ্য অবদান রেখে চলেছেন আজও। নারী শিক্ষার অগ্রযাএায় এর সুফল মহাদেবপুর উপজেলাবাসিসহ আমরা সবাই এখন পাচ্ছি।

আর এক সহকারী অধ্যাপক জনাব মোঃ হাফিজল হক সাহেব শিক্ষাবার্তাকে জানান, ১৯৯৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে উন্নিত করনের সময় তিনি এখানে যোগদান করেন।


১ ম ব্যাচে মাএ ৩ জন ছাএী ভর্তি হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য তিনি প্রচুর সময় ও শ্রম দিয়েছেন ফলেই আজ জেলার মধ্যে নারী বান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসাবে মর্যাদা লাভ করেছে।তিনি আরো বলেন, আমি আগামী বছর অবসরে যাব, তাই তিনি এ প্রতিষ্ঠানের উত্তর উত্তর সাফল্য ও মঙ্গল কামনা করেন। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ জনাব মোঃ নাজিম উদ্দীন মিঞা সাহেব শিক্ষাবার্তাকে বলেন, আমি গত ২৫/০১/২০১২ ইং তারিখে এ প্রতিষ্ঠানে যোগদান করি। ঐ সময় দুর্বল অবকাঠামো, আর্থিক সংকট অস্বচ্ছতাসহ একাডেমিক বহু সমস্য ছিল, যা আমি প্রত্যক্ষ ভাবে শিক্ষকগনদের এবং গভর্নিং বডির সর্বাত্নক সহযোগিতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার অনুকুল পরিবেশ ফিরে আনাসহ শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ১৮ টি শ্রেণিকক্ষসহ পুরো ক্যাম্পাস সিসি ক্যামারা দ্বারা আমি নিজে মনিটর করি। ছাএীদের পড়াশুনার জন্য লাইব্রেরীতে পর্যাপ্ত বইয়ের ব্যবস্হাসহ সুন্দর ডেকোরেশন সমৃদ্ধ রিডিং রুম করে দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের মিড ডে মিল চালু রাখার জন্য একটি মানসন্মত ক্যান্টিন স্হাপনসহ সকলের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নামায ঘরের ব্যবস্হা করেছি । সদ্য নির্মিত ৪ তলা বিশিষ্ট আই সি টি ভবন চালু হলে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ারসহ শ্রেণিকক্ষের আর কোর আসন সংকট থাকবেনা বলে তিনি জানান। এ জন্য তিনি মাননীয় সংসদ জনাব মোঃ ছলিম উদ্দীন তরফতার সেলিম (৪৮ নওগাঁ-৩) সাহেবকে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। এবং আবাসন সমস্যা সমাধানের জন্য মাননীয় এম পি মহোদয়ের নিকট একটি ছাএীনিবাস এর আবেদন শিক্ষাবার্তার মাধ্যমে জানান। তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে আরো বলেন, প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করায় জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধান মন্ত্রীকে অন্তর থেকে শিক্ষাবার্তার মাধ্যমে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জনাব মোঃ হাবিবুর রহমান সাহেব বলেন এই প্রতিষ্ঠানটি ঐতিহাসিক ভাবে, অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। পড়াশুনার মান ও ফলাফল বেশ সন্তোষজনক এবং সবুজে ঘেরা ভেতরের পরিবেশ আরো মনোরম। তিনি আরো বলেন, প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সাহেব খুব সৎজন ব্যক্তি এবং আর্থিক স্বচ্ছতা ও সুনামের সহিত নারীবান্ধব এ বিদ্যাপিঠটি তিনি পরিচালনা করে আসছেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব মোঃ মিজানুর রহমান সাহেব শিক্ষাবার্তাকে জানান, উপজেলায় সর্ববৃহত নারীবান্ধব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এটি। অধ্যক্ষের আন্তরিকতায় শিক্ষার গুনগতমান ও শ্রেণিকক্ষের পরিবেশগত দিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের ক্ষেএেও এ প্রতিষ্ঠানটি অনেক এগিয়ে। তিনি নারীশিক্ষা অগ্রযাএায় এ বিদ্যাপিঠটির উন্নতিসহ সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করেন।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.