
করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের শিশুদের স্কুল বন্ধ। দিনের একটা দীর্ঘ সময় আমাদের শিশুরা স্কুলে কাটাত, যা নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখা ও অনুশীলনের একটি যথার্থ স্থান হিসেবে বিবেচিত। শিশুদের উপযুক্ত শারীরিক, মানসিক ও মনঃসামাজিক বিকাশের জন্য এই নিয়মানুবর্তিতা চর্চার কোনো বিকল্প নেই। সময়মতো স্কুলে যাওয়া এবং যেকোনো কাজ সময়ে সম্পাদন করতে পারার জন্য কিছু বিশেষ দক্ষতা (যেমন আত্মনিয়ন্ত্রণ, সময়জ্ঞান, মনোযোগ) অর্জন এবং তা নিয়মিত চর্চা করার দরকার হয়।

ছুটির শিথিল সময় কাটানোর কারণে শিশুদের মস্তিষ্ক ক্রমে এসব দক্ষতা হারিয়ে ফেলছে। ফলাফল, তারা দেরি করে ঘুম থেকে উঠছে, এ সুযোগে মা তার নিজের কাজটি সেরে নিচ্ছেন, অনলাইনে ক্লাসে কোনো দিন ঢুকতে পারছে, কোনো দিন পারছে না। সুযোগ পেলেই মোবাইল, ট্যাবলেট ও ডিভাইস নিয়ে গেম খেলতে বসে যাচ্ছে; রাত জেগে গেমস খেলছে; ঘুম, খাওয়া, গোসলের প্রচণ্ড অনিয়ম হচ্ছে। শারীরিক খেলার কোনো সুযোগ নেই। ফলে শিশুদের ওজন বেড়ে যাচ্ছে এবং তারা অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। স্বাভাবিক কারণেই শিশুরা খিটখিটে, ঘ্যানঘ্যানে বা তিরিক্ষি মেজাজের হয়ে যাচ্ছে।
অভিভাবকেরা ভেবে কূল পাচ্ছেন না কীভাবে এই শিশুদের আবার নিয়মের আওতায় ফিরিয়ে আনবেন। এই মহামারির ছোবল হয়তো আরও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, আবার নাও পারে। যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে আমাদের পরিকল্পনা ভিন্নধর্মী হবে। এর মধ্যে অবশ্য ভার্চুয়াল ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। বাচ্চারা বাসায় বসে ক্লাস করছে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও ভার্চুয়াল স্কুলিংয়ে সহায়তা করতে হবে।

যদি এ অবস্থার শিগগির অবসান হয়, তাহলে স্কুলগুলো খুলে যাওয়া সত্ত্বেও আগের নিয়মে ফিরে আসাটা বেশ কষ্টকর হয়ে উঠবে। সে জন্য স্কুল খুলুক বা না খুলুক, মা-বাবাকে এখন থেকে নিয়মের রাশ টেনে ধরতে হবে। শিশুদের ওপর এটা প্রয়োগ করতে হলে প্রথমে যা করতে হবে, তা হচ্ছে নিজের মধ্যে এটি ধারণ করা। নিজেকে প্রথমে নিয়মশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আত্মনিবেদিত হতে হবে। বিভিন্ন অনিয়মকে একবারে শোধরানোর চেষ্টা না করে একটা একটা করে ধরুন, তাতে মনোযোগী হোন এবং ধৈর্য সহকারে বারবার তা আপনার শিশুদের সঙ্গে একত্রে চর্চা করুন।
প্রথমে শিশুর ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার রুটিনকে ঠিক করুন। ঘুমাতে যাওয়ার ও ঘুম থেকে ওঠার প্রক্রিয়াটিকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে নিন।
ঘুমাতে যাওয়ার রুটিন
১. আপনার শিশুর জন্য ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিন্ত করুন।
২. রাত আটটার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করুন। সবাই একসঙ্গে খেতে বসুন। খাবার হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকর ও সুষম। চকলেট ও মিষ্টিজাতীয় পদার্থ পরিহার করুন।

৩. রাত নয়টার মধ্যে বাড়ির সবাই তাদের মোবাইল/ডিভাইস বাড়ির কর্তার কাছে জমা দেবে।
৪. আপনার শিশু ঘুমাতে যাবে আর আপনি/মা-বাবা ঘুমাবেন না, টিভি/মোবাইল দেখবেন, অফিসের কাজ করবেন, আজকের শিশু কিছুতেই তা মেনে নেবে না। রাত আটটার পর মা-বাবা কেউই অফিসের জরুরি কাজটিও করবেন না, তারা না ঘুমানো অবধি। শিশু আপনার কাছ থেকেই শিখবে আপনি কীভাবে অফিসের ও পরিবারের গুরুদায়িত্বের মধ্যে সময় ও সীমা নির্ধারণ করেন।
৫. রাত নয়টা থেকে ঘুমের আয়োজন শুরু করুন, যেমন: দাঁত ব্রাশ করা, টয়লেট করা। রাতে ঘুমানোর জায়গা গুছানো, ঘুমানোর নির্দিষ্ট কাপড় পরিধান করা, যা আরামের ও ঢিলেঢালা হলে ভালো হয়।
৬. একটি ভালো মানের অ্যালার্ম ঘড়ি কিনুন। শিশুকে নিয়ে অ্যালার্ম সেট করুন।

৭. শিশুর সঙ্গে বিছানায় শুয়ে গল্পের বই পড়ার অভ্যাস করুন। নিয়মিত গল্প পড়ে বা গল্প বলে শিশুকে জীবনের আদর্শ ও নীতিবোধ সম্পর্কে ধারণা দিন। গল্পের শিক্ষণীয় সারমর্মটি বুঝতে সাহায্য করুন। ফাঁকে ফাঁকে তার সারা দিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। গল্প বলার শেষে সৃষ্টিকর্তার কাছে নিয়মিতভাবে প্রার্থনা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৮. বাবা ও মা উভয়েই পালাক্রমে এই সময় শিশুর সঙ্গে কাটানোর চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, ঘুমের আগের এই সময়ে শিশুর স্নায়ুগুলো ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। অভিভাবকের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা, আস্থা ও নির্ভরতা তৈরির এটা একটা বিশেষ সময়। শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনেও এই প্রক্রিয়া বিশেষ ভূমিকা রাখে।

১০. রাত ১০টার মধ্যে ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিন এবং ঘুমের পরিবেশ নিশ্চিত করুন।
ঘুম থেকে ওঠার রুটিন
১. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে শিশুকে ঘুম থেকে ওঠান।
২. নিজে নিজে ঘুম থেকে উঠলে শিশুকে শাবাশ বলুন, আদর করে জড়িয়ে ধরুন। ঘুম থেকে ওঠা ও ঘুমাতে যাওয়ার সময় আপনার সান্নিধ্য শিশুকে অনেক সাহস ও আশ্বাস জোগাবে।

৩. নিজে ঘুম থেকে উঠতে না পারলে তাকে আলতো করে সারা গায়ে মালিশ করে দিন। শুভ সকালের অভিবাদন জানান, দোয়া পড়ে সারা গায়ে ফুঁ দিয়ে দিন। শিশু যদি বিরক্ত না হয়, কুসুম গরম ভেজা তোয়ালে দিয়ে তার চোখ, মুখ, ভ্রু, কপাল ও কান মুছে দিন।
৪. জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে দিন এবং ঘরে আলো ঢুকতে দিন।
৫. ঘুম ভাঙার পর আড়মোড়া খেতে সময় দিন।
৬. টয়লেট সারলে একসঙ্গে মজা করে দাঁত মাজুন। রাতের পরিধেয় বস্ত্র পরিবর্তনের অভ্যাস করুন।
৭. নিয়মিত মর্নিং ওয়াক, শরীরচর্চা, যোগব্যায়ামের আসর করুন।

৮. সকালের নাশতা একসঙ্গে খেতে বসুন এবং নাশতাকে উপভোগ করুন। নাশতার মেনু আগে থেকে নির্ধারণ করবেন। সেখানে শিশুর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেবেন। অবশ্যই তা স্বাস্থ্যসম্মত সুষম খাদ্য হতে হবে। প্রতিদিন মৌসুমি ফলের ব্যবস্থা রাখুন। জাঙ্কফুড পরিহার করুন। সকালের নাশতা তৈরিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুন।
৯. শিশুর অংশগ্রহণকে প্রশংসা করুন। নাশতা খাওয়ার জন্য জোরাজুরি করবেন না।
১০. নাশতার পরবর্তী তিন ঘণ্টা নাগালের মধ্যে কোনো স্ন্যাকস রাখবেন না।
এরপর বাড়ির সবাই যে যাঁর নির্ধারিত কাজে মনোনিবেশ করুন। আপনার নিজের ওপরে আস্থা ও বিশ্বাস রাখুন। দৃঢ়তার সঙ্গে এবং ধৈর্য সহকারে নিয়মগুলো প্রতিদিন চর্চা করলে অবশ্যই আপনি সফল হতে পারবেন।
লেখক: বিশেষজ্ঞ ও প্রধান, চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, এভারকেয়ার হসপিটাল ঢকা
শেয়ার করুন এই পোস্ট
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Print (Opens in new window) Print
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
