এইমাত্র পাওয়া

সব দোষ কি প্রাথমিক শিক্ষকদের

মৃণাল কান্তি দাস।।
বাইশটি বানান ও বিরামচিহ্নে ভুল ঘটিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে বরখাস্তের নোটিশ পাঠিয়েছেন ঝিনাইদহ জেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জনাব শেখ মোঃ আকতারুজ্জামান! ওই শিক্ষকের বিপক্ষে অভিযোগ হলো- সেখানকার একটি স্কুলের ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা “সাবলীলভাবে” ইংরেজি রিডিং পারে না। বানানের বিষয়টি বাদ দিলে বলা চলে ডি.পি.ই.ও মহোদয়ের সিদ্ধান্তটি বেশ কার্যকর একটি পদক্ষেপ। মানসন্মত শিক্ষা বাস্তবায়নের নিমিত্তে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। কিন্তু কথিত আছে- “নগরে আগুন লাগলে তা দেবালয় এড়ায় না”। আর সেজন্যই হয়তো ভুলময় চিঠিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে একেবারে গোল বাঁধিয়ে ফেললো!

ভাইরাল ভুলের পর তিনি ফেইসবুকে এর জবাব লিখলেন। তাঁর দাবি হলো, এই স্থুল সংখ্যক ভুল তাঁর নিজের নয়। এটি করেছেন তাঁর কম্পিউটার টাইপিস্ট। হ্যাঁ, সেটা হতেই পারে। সকল টাইপিস্ট তো আর সাবলীল লেখক নন যে তারা ভুল করবেন না। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো- সেই কৈফিয়ত লিখতে গিয়ে ডি.পি.ই.ও মহোদয় আরও কয়েকটি বানান ভুল করে ফেললেন! সেই ভুলগুলো আবারও এদিক ওদিক ছড়িয়ে-গড়িয়ে একাকার হয়ে গেলো! একজন ডি.পি.ই.ও যদি বানান ভুল করেন তবে সেটার প্রভাবে হয়তো বাস্তবিকক্ষেত্রে ততটা ক্ষতির কারণ হয় না যতটা ঘটে একজন শিক্ষকের ভুলে। তবুও সকল শিক্ষককে নিয়ন্ত্রণকারী একজন এমন উচ্চপদে আসীন অফিসারের এই প্রকারের ভুল দৃষ্টিকে কটু বানিয়ে দেয়!

এখানে বলে রাখা আবশ্যক যে, একজন জেলা শিক্ষা অফিসারের কোনো ভুলকে “ভুল” বলার কোনো ক্ষমতা কিংবা যোগ্যতা আমার অন্তত নেই। ওটা দেখার জন্য অধিদপ্তরে অনেক ঊর্ধ্বতন, বিচক্ষণ এবং মেধাবী কর্তৃপক্ষ আছেন। সেটা তাঁরাই দেখবেন এবং ভালো বুঝবেন। মোল্লা সাহেবের দৌঁড় যেমন মসজিদ পর্যন্ত আমার দৌঁড়ও তেমন শিক্ষক পর্যন্ত। আমি শিক্ষকের কথাই আলোকপাত করতে চাইছি।

তবে না! এই কথাগুলো লিখার মাধ্যমে কোনোভাবেই সেই রিডিং শিক্ষকের দোষকে আমি সাপোর্ট করছি না। সরকার এতগুলো টাকা ব্যয় করে জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহ শিক্ষা অফিসার এবং ওই শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েছেন কেবলমাত্র একটি লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের নিমিত্তে আর সেটা হলো মানসন্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। অধিদপ্তরের কোটি টাকা দামের গাড়ি থেকে শুরু করে স্কুলের একপয়সা দামের আলপিন পর্যন্ত প্রত্যেকটি ব্যয় চলছে কেবল একটি লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের জন্য আর সেটা হচ্ছে শিশুদের জন্য মানসন্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। সেখানে একজন শিক্ষক শিশুদেরকে ইংরেজি রিডিং শিখাবেন না, সেটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু এখানে এই স্কুলগুলোতে, যথার্থভাবে “না পড়ানো” “না শিখানো” বিষয়ক যে অপরাধগুলো ঘটে চলছে তার দায়ভার কি কেবল এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ? আগুন কি দেবালয় এড়িয়ে যাবে?

বিগত কয়েক বছরে এদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে হাজার হাজার “অশিক্ষক” ঢুকে পড়েছেন। এর সুদূরপ্রসারী এবং ভয়ংকর প্রভাব এসে পড়তে যাচ্ছে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। এর দায় কার? সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দিয়ে এই তুলনামূলক ক্ষীণ মেধার লোকবলকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসন দেওয়ার পেছনের ভূমিকা কারা রেখেছেন? রেখে চলছেন?

এখানে যোগ্যতা, শিক্ষকমান, পারদর্শিতা এবং শিক্ষাসনদ অনুযায়ী শিক্ষকদের জন্য কোনো আলাদা স্থান বা ব্যবস্থা বা মূল্যায়ন নেই। কেনো নেই ? কেনো একজন শিক্ষক তার অযোগ্যতার জন্য অধঃপতন কিংবা যোগ্যতার জন্য প্রমোশন পাচ্ছেন না? আর কেনোইবা এই শিক্ষকগণকে রেখে দেওয়া হয়েছে থার্ডক্লাসের পদমর্যাদায়?

রবি ঠাকুর “তোতা কাহিনী” গল্পে যে শিক্ষাব্যবস্থার এবং অবস্থার চিত্র এঁকেছিলেন, সেটা আজঅব্দি বদলায় নি। বাধ্য হয়ে এই সত্য কথাটা স্পষ্ট করে বলে ফেললে সেটা কি আমার জন্য নিয়ম ভাঙার মতো অপরাধ হয়ে যাবে?


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.