জাতীয়করণ ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন অসম্ভব

মো: দ্বীন ইসলাম হাওলাদার ।।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের যে সামগ্রিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তা স্বাধীনতার পর অন্য কোনো সরকার করতে পারেনি। কিন্তু আমাদের তথাকথিত শিক্ষাবিদদের অজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা, সেচ্ছাচারিতা ও স্বার্থন্বেসী মনোভাবের কারনে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার অপূরনীয় ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। যার কিছুটা তুলে ধরছি।

আমাদের দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদেরকে সকাল ৯/৯.৩০টা থেকে বিকাল ৪/৪.৩০ টা পর্যন্ত জেল খানার কয়েদিদের মতো শিক্ষাঙ্গনে আটকে রাখা হয়। পাশাপাশি তাদের উপরে রয়েছে বড় বড় ভলিয়মের অনেক গুলো বইয়ের সমাহার। আমাদের অনভিজ্ঞ শিক্ষাবিদরা শিক্ষার্থীদের বয়স ও শ্রেণী ভেদে শ্রেণি সময়, বইয়ের সংখ্যা, বইয়ের ভলিয়ম, প্রশ্ন পদ্ধতি, পরীক্ষা পদ্ধতি কোনটি নির্ধারণ করতে পারেননি।

প্রতি ক্ষেত্রে তারা অযোগ্যতার ছাপ রেখে যাচ্ছেন। তারা যেন ৬ মাস বয়সি শিশুকে রোষ্ট খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। কেননা এত দীর্ঘ সময় যেমন শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করা সম্ভব নয়, তেমনি এত বড় বড় ভলিয়মের এতগুলো বই পড়াও অসম্ভব। এসএসসি এবং এইচএসসির পাবলিক পরীক্ষায় পুরো দুই বৎসরের আহরিত জ্ঞান একবারে ঢেলে দিতে হয়। অথচ অনার্স মাস্টার্সে গিয়ে পরিপক্ক শিক্ষার্থীরা সেমিস্টার ভিত্তিক ৪০০ থেকে ৬০০ নম্বরের পরীক্ষা দেয় প্রতি বছর। আমাদের মতো ছোট খাটো লেখকদের লেখালেখির কারণে শিক্ষাবিদদের চোখ খুলতে বসেছে।

তারা বইয়ের সংখ্যা ও ভলিয়ম কমাতে চাইছেন। আবার নবম-দশম, একদাশ-দ্বাদশেও সেমিস্টার ভিত্তিক পরীক্ষা নিতে চাইছেন। তবে তার জন্য এত সময় ক্ষেপন কেন? আমাদের শিক্ষাবিদরা চাইছেন সকল শিক্ষার্থীদেরকে একবারে ডাক্তার প্রকৌশলী বানাতে। তাই শিক্ষার্থীদেরকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চতর গণিত, জীব বিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থ সকল বই পড়তে হয়। অথচ একজন শিক্ষার্থী সব বিষয় রপ্ত করতে পারে না। আবার কাম্য সংখ্যক পাশনা করলে প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের নির্দেশ রয়েছ। তাই এমপিও ঠেকাতে শিক্ষকরা নকলের সহায়তায় পাশের হার বাড়াতে বাধ্য। আর নকল ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠার মূল কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা। অতিরিক্ত বইয়ের চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা ও শিক্ষকরা যথা সময়ে কোর্স শেষ করতে পারেন না, ফলে নকলের সাহায্যে পাশের হার বাড়ানো হয়।

নকল ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পাশের হার বাড়লেও শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বাড়ছে না। আর নকল ভিত্তিক পাশের ফলে দেশে বেকারত্বের সংখ্যা বেড়েই চলছে। শিক্ষার্থীরা না জেনে শুনে নকলের সহায়তায় ভালো ফলাফল অর্জনের পরে চাকুরির পেছনে ছোটে, তারা আত্মকর্মসংস্থানে আগ্রহী হয় না। ফলে চাকুরির ক্ষেত্রে ঘুষের ছড়াছড়ি বহুগুনে বেড়ে যায়। আমাদের দেশে বর্ষ ব্যাপি চলে বিভিন্ন জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় দিবস উজ্জাপন। যে উৎসব গুলোর আয়োজন করার কথা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহের। কিন্তু আমাদের কর্তা ব্যক্তিরা একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমান। আর শিক্ষকরা যেন ক্রীতদাস তাদেরকে যথেচ্ছা ব্যবহার করা হয়।

এমনকি গেজেটেড ছুটির অধিকাংশই ছুটিই শিক্ষকরা ভোগ করতে পারেন না। বিভিন্ন উৎসব পালনার্থে আয়োজন করা হয়-কবিতা, বক্তৃতা, গানসহ নানা পর্ব যার প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানের অনুশীলনের জন্য ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লেগে যায়। ফলে নানা অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরকে সম্পৃক্ত করায় শিক্ষার অপুরনীয় ক্ষতি হচ্ছে যা আমাদের তথাকথিত শিক্ষাবিদরা উপলব্দি করতে পারছেন না। পাশাপাশি শীত ও গ্রীষ্মকালীন এবং বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতা তো আছেই। আরো রয়েছে এনজিওর উৎপাত। তবে আপদকালীন (করোনা কালীন) বিষয়টা ভিন্ন।

আর একটি কথা না বল্লেই নয়, বিশ্বে সবচেয়ে শিল্পোন্নত দেশ জাপান, সেখানে কোনো সহশিক্ষা নেই। তারা প্রত্যক্ষ করেছে যে, ছেলে-মেয়ে একত্রে থাকলে তাদের মধ্যে সর্বদা পারস্পারিক আকর্ষন থাকে। ফলে তারা শিক্ষা থেকে অনেক দূরে ছিটকে যায়। আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও দেখা যায় ক্লাস চলাকালীন সময়েও জোড়ায় জোড়ায় ছেলে মেয়েরা আড্ডায় লিপ্ত। যে কারনে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অবস্থান থেকে দুই শতাধিক ধাপ নিচে নেমে গেছে। তাছাড়া ধর্মহীন শিক্ষা অষাঢ়, অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকাংশেই ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন। আর আমরা অনুসরণ করছি নেদারল্যান্ডের শিক্ষানীতি। যারা শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প কোনো দিকেই তেমন অগ্রসর নয়।

শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি বড় প্রতিবদ্ধকতা রাজনৈতিক সভাপতি, রাজনৈতিক সভাপতিরা তাদের দলীয় শিক্ষক কর্মচারীদেরকে নানা অবৈধ সুবিধা দিয়ে থাকেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরকে তারা যে কোনো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। রাজনৈতিক নেতাদেরকে নিয়ে প্রায়ই প্রতিষ্ঠানে হাজির হন, তাদের রাজনৈতিক ঢ়ৎড়ঢ়ধমধহফধ ছড়াতে। তারা এতোটাই নি:লজ্জ যে তাদেরকে কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিতে হয় না। এমনিতেই এসে যান।

এমপিও ভুক্তিতে রয়েছে বিশাল দুর্ণীতি, সভাপতি, প্রতিষ্ঠান প্রধান, উপজেলা-জেলা ও বিভাগীয় শিক্ষা অফিসে ঘাটে ঘাটে মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। টাইম স্কেল/উচ্চতর স্কেল নিয়ে চলে মন্ত্রনালয়ের টালবাহানা, টাইম স্কেল/উচ্চতর গ্রেড পেতে ঘাটে ঘাটে একজন শিক্ষককে লক্ষাধিক টাকা ঘুষ দিতে হয়। অথচ এটা অটোমেটিক হলে শিক্ষকদেরকে বিরম্বনা পোহাতে হতো না। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সেচ্ছাচারিতায় সহকারি শিক্ষক এবং প্রভাষকরা একই স্কেলে চাকুরি করছেন, নানা অনৈতিক প্রজ্ঞাপনে আটকে আছে প্রভাষকরা। আবার উচ্চতর গ্রেড দিলেও তা আটকে আছে নানা জটিলতায়। হয় না। আর নন এমপিও শিক্ষকদের কথা বলে আর কি হবে! সরকার প্রতি বৎসর বড় বড় মেঘা প্রজেক্ট পাস করে; আর পরে থাকে সামান্য কটা টাকার জন্য নন এমপিও শিক্ষকরা অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছেন।

আমাদের দেশে পদস্থ কর্মকর্তারা অবসরে গেলেও তাদেরকে বড় বড় পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। অথচ শিক্ষকরা অবসরে গেলে তাদের কোনো মূল্যায়ন হয় না। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ শিক্ষকদেরকে অবসরের পরে কারিকুলাম তৈরিতে প্রয়োগ করলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এই দন্য দশা থাকতো না। তারা তাদের অভিজ্ঞতালব্দ জ্ঞান দিয়ে একটি মান সম্মত শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করতে পারতেন।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রতিবদ্ধকতা হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরকারি এবং বেসরকারি (এমপিও/ননএমপিও) দুটি ধারায় বিভক্ত রাখা এবং এই দুই ধারার শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বিস্তর বৈশম্য বিরাজমান। একজন এমপিওভুক্ত সহকারি শিক্ষক ১২০০০ টাকা স্কেলে বেতন পান তা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। তাই তাকে পাশাপাশি অন্য কাজও করতে হয়। অথচ সরকারি ও বেসরকারি সকল শিক্ষকই সমান দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক আর্থিকসহ অন্যান্য সুবিধা অনেক বেশি পেয়ে থাকেন। তাই যতোদিনে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় করণ না করা হবে ততো দিনে বিশ্ব মানের সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না এবং মেধাবীরাও শিক্ষকতার পেশায় আসবে না।

লেখক-
প্রভাষক
দুমকি ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা
দুমকি, পটুয়াখালী।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.