টিউশন ফি নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের মতবিরোধ

শিক্ষাবার্তা ডেস্ক :

স্কুল-কলেজের টিউশন ফিসহ অন্যান্য ফি আদায়ের জন্য অভিভাবকদের ক্রমাগত চাপে রাখছে রাজধানীর নামি স্কুলগুলো। অন্যদিকে অভিভাবকরাও এই ফি পরিশোধে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের দাবি—টিউশন ফি অন্তত ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত আড়াই মাসে তারা টিউশন ফি পরিশোধের তেমন একটা চাপ দেয়নি। শিক্ষকদের বেতনভাতাও তো দিতে হবে। তাই বাধ্য হয়েই এই টিউশন ফি আদায়ের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে এই দুর্যোগকালীন মুহূর্তে বেশির ভাগ অভিভাবকই টিউশন ফি দিতে নারাজ। তারা বলছেন, বেশিরভাগ অভিভাবকের আয় কমে গেছে। অনেকে বেকার হয়েছেন। এই মুহূর্তে কোনোভাবেই টিউশন ফি দেওয়া যাবে না।

অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। আর কতদিন এভাবে চলবে কেউ জানি না। সরকারের একটা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসা জরুরি। একদিকে সরকার বলবে টিউশন ফি আদায়ে চাপ দেওয়া যাবে না, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো দিনের পর দিন নোটিশ দিয়ে যাচ্ছে ফি পরিশোধ করতে। সরকার, স্কুল কর্তৃপক্ষ আর অভিভাবকরা ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় একটা সমাধানের পথ খোঁজা দরকার বলে মনে করেন নজরুল আমিন নামে এক অভিভাবক। রাজধানীর নামি সু্কলগুলো ভিকারুননিসা, আইডিয়াল, সাউথ পয়েন্ট, হলিক্রস নয়, সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গালর্স স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ রাজধানীর বেশিরভাগ ও দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বেতন ও অন্যান্য ফি পরিশোধে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে অভিভাবকদের ফোন করে শিক্ষার্থীদের টিসি, ভর্তি বাতিল করার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবকদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করতে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। মোবাইলে এ সংক্রান্ত বার্তা পাঠানো হয়েছে। টিউশন ফি পরিশোধ করা না হলে অনলাইন ক্লাস থেকে বহিষ্কার ও পরবর্তী ক্লাসে উন্নীত করা হবে না বলে শ্রেণিশিক্ষকদের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে দুই মাসের টিউশন ফিসহ অন্যান্য ফি পরিশোধের জন্য অভিভাবকদের কাছে নোটিশ পাঠিয়েছে। তবে দুই মাসের বেতনের সঙ্গে ডায়ারি, সিলেবাস, বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী পালন, পরীক্ষার খাতাসহ বিভিন্ন ফি বেতনের সঙ্গে পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। তবে অভিভাবকের আপত্তির মুখে তা বাতিল করা হয়। অভিভাবক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ সুজন বলেন, টিউশন ফি দিতে চাই। তবে সেটা সহনীয় হতে হবে। করোনাকালীন সময়েও শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের নামে কোটি টাকার বেশি সম্মানি দেওয়া হয়েছে। এই সময় এসব অতিরিক্ত সুবিধা বন্ধ করতে হবে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ফৌজিয়া জানান, অনেক শিক্ষার্থীর গত পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া হয়ে গেছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে মানবিক বিবেচনায় গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে দুই মাসের বেতন পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। একই চিত্র ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ক্ষেত্রে। সানিডেল স্কুলের এক অভিভাবক বলেন, স্কুলটি প্রতিবছর টিউশন ফি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে করোনার মধ্যেই টিউশন ফি প্রদানের তারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছে। সে সময়ের মধ্যে ফি পরিশোধ না করা হলে ভর্তি বাতিল হবে বলে অভিভাবকদের কাছে নোটিশ পাঠিয়েছে। এ কারণে আতঙ্কে আছেন অভিভাবকরা। শুধু বকেয়া টিউশন ফি নয়, একই সঙ্গে জরিমানা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে রাজধানীর প্লে পেন স্কুলের বিরুদ্ধে। করোনা ভাইরাসের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গত এপ্রিল, মে ও জুন মাসের টিউশন ফি পরিশোধ করা হয়নি। সমপ্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দফায় দফায় টিউশন ফি পরিশোধের তাগিদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মোবাইলে বার্তা পাঠানো হয়েছে। নির্ধারিত ব্যাংকে টিউশন ফি জমা দিতে গেলে ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে জরিমানা ছাড়া (বিলম্ব ফি) টিউশন ফি গ্রহণ করা হবে না। এছাড়া বেতন দিতে না পারায় অনলাইন ক্লাস থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন অভিভাবকরা। এক অভিভাবক জানান, এই স্কুলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বেতন ৪০-৫০ শতাংশ কমানোর দাবি জানিয়ে আবেদন করা হলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয়নি। শুধু তাই নয়, গত ১৪ জুন থেকে গুগল ক্লাসরুমে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছিল, কিন্তু বেতন বকেয়া থাকায় ১৮ জুন থেকে এক শিক্ষার্থীকে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না, তাকে ব্লক করে রাখা হয়েছে। এপ্রিল মাসের বেতনের সঙ্গে ১ হাজার টাকা বিলম্ব ফি ধরা হয়েছে জানিয়ে এক অভিভাবক বলেন, প্রথম মাসে থাকে ২০০ টাকা, পরের মাসে ৫০০ টাকা এরপর সেই বিলম্ব ফি ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। রাজধানীর উত্তরার দিল্লি পাবলিক স্কুল (ডিপিএস) অভিভাবকরা স্কুলের টিউশন ফি ৫০ শতাংশ মওকুফ চেয়েছেন। এ দাবিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দিয়েছেন তারা।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক ইত্তেফাককে বলেন, আমরা স্কুল কর্তৃপক্ষকে বলতে পারছি না যে টিউশন ফি আদায় করা যাবে না। কারণ শিক্ষকদের বেতন দিতে হয়। আবার অভিভাবকদেরও বলতে পারছি না টিউশন ফি পরিশোধ করুন বা করবেন না। তবে এ ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে কাজটি করতে হবে।

মাউশির মহাপরিচালক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্কুলের বিদ্যুৎ, পানির বিলসহ অনেক ধরনের ব্যয় হচ্ছে না। তাই এ বিষয়টিও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে বিবেচনায় আনতে হবে। এ ধরনের নির্দেশনা শিক্ষামন্ত্রীও দিয়েছেন বলে তিনি জানান। এর আগে শিক্ষাবোর্ড থেকে একটা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যে, টিউশন ফি আদায়ে অভিভাবকদের চাপ দেওয়া যাবে না। অভিভাবকরা বলছেন, এর সমাধান শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই করতে হবে। অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বিষয়টির সমাধান করতে হবে। অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু করোনাকালীন সময়ে বেতন মওকুফের জন্য শিক্ষামন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।

 

সূত্র: ইত্তেফাক


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.