এসএসসিতে ‘জিপিএ ফাইভ’-এর গল্প

মোস্তফা মল্লিক।।

গল্প শব্দটি লেখা ঠিক হয়নি। কারণ এটা তো গল্প না, যা বলছি সেটা বাস্তব ঘটনা নিয়েই। ব্রিটিশদের উদ্যোগে বাংলাদেশে চালু হয়েছিল পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থা। ২০১০-এর আগে ১০ বছর শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ঘটতো পাবলিক পরীক্ষার সঙ্গে। সে এক বিশাল ব্যাপার। বেশিরভাগ মানুষের আর্থিক অবস্থার টানাটানি থাকায় এসএসসি পরীক্ষা শুরুর মাসখানেক আগে থেকে শিক্ষার্থীদের বাড়তি যত্ন নিতে শুরু করতেন অভিভাবকরা।

ডিম খেলে পরীক্ষার খাতা গোল্লা জুটবে তাই ডিম দেওয়া যাবে না, কোনও কোনও মা এমন ধারণা নিয়ে থাকলেও পরীক্ষা শুরুর আগে থেকে ঠিকই সন্তানকে সকাল, দুপুর আর রাতের খাবারের সঙ্গে ডিম দেওয়ার চেষ্টা করতেন। পরীক্ষা কেন্দ্র দূরে থাকায় এক গ্রামের শিক্ষার্থী অন্য গ্রামে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। জীবনে প্রথম পরীক্ষা বলে বাবা-মা ছাড়াও সঙ্গে যেতেন খালা, মামা, চাচা, এমনকি নানা-নানি, দাদা দাদিরাও। প্রথম পরীক্ষার আগের দিন মুরুব্বিদের পায়ে সালাম করতে ভুলতেন না কোনও শিক্ষার্থী। দোয়ার সঙ্গে মিলতো অর্থও। যাহোক, এখন পরীক্ষা শুরুর আগে এমন রেওয়াজ আর নেই বললেই চলে।

২০১০ সালে শিক্ষানীতি প্রবর্তন করে সরকার। শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। এই শিক্ষা অবৈতনিক বলে ঘোষণা দেওয়া হয় শিক্ষানীতিতে। পঞ্চম শ্রেণির পরিবর্তে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর করা হয় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত।

ওই বছর থেকেই পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার নামে নতুন একটি পাবলিক পরীক্ষা চালু করা হয়। ২০১০ সাল থেকে চালু করা হয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা বা জেএসসি। আট বছরের শিক্ষাজীবন শেষে অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণিতে দ্বিতীয়বারের মতো পাবলিক পরীক্ষায় বসার নিয়ম চালু করা হয়। এর দু’বছর পর অর্থাৎ দশ বছর শিক্ষাজীবন শেষে তৃতীয় পাবলিক পরীক্ষায় বসতে হয় শিক্ষার্থীর।

এই পরীক্ষার নাম মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বা এসএসসি পরীক্ষা। এরও দু’বছর পর অর্থাৎ ১২ বছর শিক্ষাজীবন শেষে চতুর্থ পাবলিক পরীক্ষায় বসতে হয় শিক্ষার্থীদের। এই পরীক্ষার নাম উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা বা এইচএসসি। এই পরীক্ষার পর উচ্চ শিক্ষার জগতে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীরা।

১৯৭১ সাল থেকেই বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষায় অর্থাৎ এসএসসি ও এইচএসসিতে ডিভিশন পদ্ধতি ফল প্রকাশ করা হতো। ৬০০ নম্বর পেলে প্রথম বিভাগ, ৪৫০ নম্বরে দ্বিতীয় বিভাগ ও ৩৩০ নম্বরে তৃতীয় বিভাগ। ৭৫০ নম্বর পেলে দেওয়া হতো স্টার মার্ক। যারা স্টার মার্ক পেতো তাদের এলাকার মানুষরা এক নজর দেখার জন্য ভিড় করতেন। মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে সব জায়গায় আলাদা কদর করা হতো তাদের। ৮০ নম্বর পেলে তাকে বলা হতো লেটার মার্ক নম্বর।

প্রতি বোর্ডে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া প্রথম বিশ জনকে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো। সর্বোচ্চ নম্বরধারীদের বলা হতো স্ট্যান্ড করা শিক্ষার্থী। ভালো শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যই থাকতো সেরাদের সেরা হওয়া। যারা স্ট্যান্ড করতো পরের দিন পত্রিকার প্রথম পাতায় বাবা-মা, শিক্ষকসহ শিক্ষার্থীর ছবি ছাপা হতো। ভালো ফল করার উপায় শিরোনামে ওই শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকারও ছাপতো পত্রিকাগুলো।

বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে বুয়েটে প্রথমবারের মতো গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হয়। অর্থাৎ প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগের পরিবর্তে অন্য এক পদ্ধতিতে ফল প্রকাশের ধারণা আসে বুয়েট থেকেই। এসএসসি পরীক্ষায় গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হয় ২০০১ সালে। আর ২০০৩ সালে এই পদ্ধতি চালু হয় এইচএসসি পরীক্ষায়।

জাতি পরিচিত হতে শুরু করে জিপিএ পদ্ধতির সঙ্গে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি। শুধু নম্বর দেওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। পরিবর্তন আনা হয় ফলাফলের প্রকাশ ভঙ্গিতে। ২০০১-এর আগে আশির ওপর নম্বর পেলে বলা হতো লেটার মার্কস আর ওই থেকে বলা হয় জিপিএ-৫।

যাহোক, এবার আসি মূল কথায়। সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট জিপিএ ফাইভ নিয়ে কিছু বলতে চাই। ২০০১ সালের আগে সনাতন পদ্ধতিতে স্টার মার্কস তোলা মানে হচ্ছে বিশাল একটা ব্যাপার। আর ডিজিটালের এমন সময়ে সর্বোচ্চ নম্বর জিপিএ ফাইভ না পাওয়াই হচ্ছে একটা ব্যর্থতা- এমনটাই ভাবেন অধিকাংশ অভিভাবক।

বোঝার সুবিধার জন্য এসএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের পরিসংখ্যান আপনাদের জানাতে চাই। তালিকায় দেখতে অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়ে চলছে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা। আগে যেখানে প্রতি বোর্ডে স্ট্যান্ড করতো মাত্র ২০ জন সেখানে এখন জিপিএ পাঁচের হিসাব লাখের ওপরে। গ্রেডিং পদ্ধতি শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিচে দেওয়া হলো।

এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা

২০০১ সাল মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৭ লাখ ৮৬ হাজার ২২০ জন। পাসের হার ছিল ৩৫.২২%। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৬ জন শিক্ষার্থী। এই বছর প্রতি এক লাখে ১০ জন শিক্ষার্থী অর্জন করে সর্বোচ্চ পয়েন্ট জিপিএ পাঁচ। অর্থাৎ মোট পরীক্ষার্থীর .০০৯৬৬৬৫% জিপিএ-৫ পেয়েছিল।

২০০২ সাল মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১০ লাখ ৫ হাজার ৯৩৭ জন। ৪০.৬৬% ছিল পাসের হার। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৩২৭ জন। যা মোট পরীক্ষার্থীর .০৩ শতাংশ।

২০০৩ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৯ লাখ ২১ হাজার ২৪ জন। পাসের হার ৩৫.৯১%। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৯ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর .১৫ শতাংশ।

২০০৪ সাল থেকে চতুর্থ বিষয়সহ নম্বর বণ্টন করা হয়। যে কারণে জিপিএ পাঁচ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাফেই বেড়ে যায় প্রায় ৮ গুণ। ওই বছর পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮৭ জন। এরমধ্যে পাস করে ৪৮.০৩%। জিপিএ-৫ অর্জন করে ৮ হাজার ৫৯৭ জন। যা মোট পরীক্ষার্থীর ১.১ শতাংশ।

২০০৫ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৭ লাখ ৫১ হাজার ৪২১ জন। পাসের হার ৫২.৫৭%। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫ হাজার ৬৩১ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ১.৬ শতাংশ।

২০০৬ সালে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮১৫ জন। ৫৯.৪৭% হচ্ছে পাসের হার। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৪ হাজার ৩৮৪ জন। যা মোট পরীক্ষার্থীর ৩.১২ শতাংশ।

২০০৭ সালে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ লাখ ৯২ হাজার ১৬৫ জন। পাসের হার ৫৭.৩৭%। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৫ হাজার ৭৩২ জন। যা মোট পরীক্ষার্থীর ৩.২৪ শতাংশ।

২০০৮ সালে মোট পরীক্ষার সংখ্যা গেল বছরের তুলনায় ৪৮ হাজার ৫৫৬ জন কমলেও জিপিএ পাঁচ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ১৬ হাজার ১৮৫ জন। ওই বছর মোট পরীক্ষার্থী ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬০৯ জন। এদের মধ্যে পাস করে ৭০.৮১% শিক্ষার্থী। জিপিএ-৫ অর্জন করে ৪১ হাজার ৯১৭ জন। যা মোট পরীক্ষার্থীর ৫.৬ শতাংশ।

২০০৯ সালে শিক্ষার্থী এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও পাসের হার গেল বছরের তুলনায় কিছুটা কমে যায়। ওই বছর মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯১ জন। পাসের হার ৬৭.৪১%। জিপিএ পাঁচ ৪ হাজার ১৭ জন বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৪৫ হাজার ৯৩৪ জন। যা মোট পরীক্ষার্থীর ৫.৭৫ শতাংশ।

২০১০ সালে আগের বছরের তুলনায় জিপিএ পাঁচ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ১৬ হাজার ২০০ জন। ওই বছর মোট পরীক্ষার্থী ৯ লাখ ১২ হাজার ৫৭৭ জন। পাসের হার ৭৮.৯১%। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬২ হাজার ১৩৪ জন। এই বছর মোট পরীক্ষার্থীর ৬.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ পাঁচ অর্জন করে।

২০১১ সাল মোট পরীক্ষার্থী ৯ লাখ ৮৬ হাজার ৬৫০ জন, পাসের হার ৮২.১৬ %। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬২ হাজার ২৮৮ জন। এই বছর মোট পরীক্ষার্থীর ৬.৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী জিপিএ পাঁচ অর্জন করে।

২০১২ সালে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১০ লাখ ৪৮ হাজার ১৪৪ জন। পাসের হার ৮৬.৩২%। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৫ হাজার ২৫২ জন। ২০১২ সালে জিপিএ পাঁচপ্রাপ্ত হয় মোট পরীক্ষার্থীর ৬.২৩ শতাংশ।

২০১৩ সালে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৯০ জন। একই সঙ্গে বাম্পার ফলন হয় জিপিএ ৫-এর ক্ষেত্রেও। গেল বছরের তুলনায় জিপিএ পাঁচ বেশি পায় ২৫ হাজার ৯৭৪ জন শিক্ষার্থী। ওই বছর মোট পরীক্ষার্থী ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৩৪ জন। পাসের হার ৮৯.০৩%। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯১ হাজার ২২৬ জন। এই বছর মোট পরীক্ষার্থীর ৭ শতাংশ অর্জন করে জিপিএ পাঁচ।

২০১৪ সাল পরীক্ষার্থীর সংখ্যা গেল বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯৩ জন। আর জিপিএ পাঁচ বেশি পায় ৫১ হাজার ৫০ জন শিক্ষার্থী। ওই বছর মোট পরীক্ষার্থী ১৪ লাখ ৩২ হাজার ৭২৭ জন। পাসের হার ৯১.৩৪%। জিপিএ-৫ পায় ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ জন শিক্ষার্থী। দেশে গ্রেডিং পদ্ধতিতে নম্বর দেওয়ার প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে ২০১৪ সালেই সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ পাঁচ অর্জন করে। ২০১৪ সালে মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ১০ শতাংশ পায় জিপিএ পাঁচ।

এরপরের বছরগুলোতে এসএসসিতে এই পরিমাণ শিক্ষার্থী জিপিএ পাঁচ না পেলেও এর সংখ্যা আর লাখের নিচে নামেনি।

২০১৫ সালে জিপিএ পাঁচ পেয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৯শ ১ জন, ২০১৬ সালে জিপিএ পাঁচ পেয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৭শ’ ৬১ জন, ২০১৭ সালে ১ লাখ ৪ হাজার ৭শ’ ৬১ জন, ২০১৮ সালে ১ লাখ ১০ হাজার ৬শ’ ২৯ জন। এই সংখ্যা মোট পরীক্ষার্থীর ৫.৪৬ শতাংশ।

২০১৯ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৫শ’ ৯৪ জন পায় জিপিএ পাঁচ। অর্থাৎ মোট পরীক্ষার্থীর ৪.৯৬ শতাংশ পরীক্ষার্থী সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট অর্জন করে।

২০২০ সালে জিপিএ পাঁচ পায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন। এই সংখ্যা মোট পরীক্ষার্থীর ৫ শতাংশ।

২০০০ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ মেধাবী ২০ জনের তালিকা প্রকাশ করতো শিক্ষা বোর্ডগুলো। সেই হিসেবে প্রতি বোর্ডে ২০ জন হিসেবে যত শিক্ষার্থী হয় গ্রেডিং পদ্ধতি শুরু হওয়ার প্রথম বছরে এর চেয়েও কম সংখ্যক পরীক্ষার্থী মাত্র ৭৬ জন পায় জিপিএ পাঁচ। ২০ বছরের ব্যবধানে জিপিএ পাঁচ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৬শ’ ২৯-এ।

অথচ এই সময়ের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কতটা সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে সেই হিসাবও আছে শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কাছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষা নিয়ে মাঠে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের সুযোগ সুবিধা যতটুকু বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, বেড়েছে ততটুকুই।

২০০১ সালে ৭৬ জন শিক্ষার্থীর একজন বলবে আমরা গ্রেডিং পদ্ধতির প্রথম ব্যাচ। গর্ব করেই ও বলবে, আমি জিপিএ পাঁচ পেয়েছিলাম। একই সঙ্গে এই বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে জিপিএ পাঁচ পাওয়া ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮শ’ ৯৮ জন শিক্ষার্থীর একজনও বলবে আমিও পেয়েছি জিপিএ পাঁচ। ঢালাওভাবে এত জিপিএ পাঁচ অর্জন কি করে সম্ভব এ নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।

আমার শিক্ষা রিপোর্টিং জীবনে বোর্ড স্ট্যান্ড করা কোনও শিক্ষার্থীকে দুই বছরের (এখন তিন বছর) পাস কোর্স পড়তে দেখিনি। অপ্রিয় হলেও সত্য, এই কোর্সে পড়ার কথা তারা চিন্তাও করতে পারে না (কোর্সটি খারাপ নয়, তবে শীর্ষ শিক্ষার্থীর জন্যও আবার এই কোর্সটি নয়)। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা দেশের প্রতিষ্ঠিত অঙ্গনে যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন তাদের মধ্যে খুব যোগ্য জায়গায় আছেন বোর্ড স্ট্যান্ডধারীরা।

অথচ হাল আমলে জিপিএ পাঁচ পাওয়া শিক্ষার্থীদের বিশাল একটি অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, তালিকার একেবারের নিচের দিকের বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।

ভর্তির সুযোগ হয় না দেশ সেরা ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, কারমাইকেল কলেজ কিংবা বিএম কলেজের কোনও ভালো বিষয়েও। কিন্তু কেন? সেরাদের সেরা শিক্ষার্থীর তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। এসব নিয়ে মনে হয় ভাবার সময় এসে গেছে।

কাউকে আঘাত করার জন্য এই লেখা নয়। প্রতিটি শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফল অর্জন করুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু বিষয়টি এমন যেন না হয়ে যায় যে, ভালো ফল কিন্তু জিপিএ পাঁচের আধিক্যের কারণে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী নিজেও তার উচ্চ মানের ফল অন্যের কাছে প্রকাশ করতে লজ্জা পায়!

বিষয়টি এমন হয়েছেও বটে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পেয়েছে জিপিএ ৩ থেকে জিপিএ ৩.৫-এর মধ্যে। এমন সংখ্যা ২৮ শতাংশ।

অর্থাৎ এসব শিক্ষার্থীরা ৫০ থেকে ৬৯ পর্যন্ত নম্বর পেয়েছে। জিপিএ পাঁচের আধিক্যের কারণে ৪ থেকে পাঁচের মধ্যে পাওয়া এমন শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশও কেন যেন ফ্যাকাশে মুখে আছে। অথচ এসব শিক্ষার্থীর প্রত্যেকে প্রতিটি বিষয়ে পেয়েছে গড়ে ৭০ থেকে ৭৯ নম্বর।

ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করতে চাই। করোনার এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসক, স্বাস্থ্য খাতে সেবা দেয়া কর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যমকর্মীকে বলা হচ্ছে সম্মুখযোদ্ধা। কোনও সন্দেহ নেই। তবে এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ফল প্রকাশের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তারাও প্রত্যেকে সম্মুখযোদ্ধা।

কারণ যে সময়টিতে পরীক্ষার খাতার প্যাকেট খোলা, খাতা দেখা, নম্বর পাঠানোসহ আরও হাজারো কাজ করার প্রস্তুতি চলছিল ঠিক তখনই দেশ আক্রান্ত হয় করোনাভাইরাসে। এসবের মধ্যেই ফল প্রস্তুত করে তা ঘোষণা দেওয়া হয়। ধন্যবাদ তাদের। ধন্যবাদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে।

এবারই প্রথম শতভাগ কাগজহীন ফল ঘোষণা করা হলো। শিক্ষার্থীদের করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা করতে সবার মুঠোফোনে দেওয়া হয় ফল। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সংবাদ সম্মেলনও হয় অনলাইনে। এরই মধ্যে দেশের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রমও শুরু করেছে। ইংরেজি মাধ্যমের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরীক্ষাও নিয়েছে অনলাইনে।

অনলাইন কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি সফলতা দেখিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বলা যেতে পারে করোনাভাইরাসের কারণে শিক্ষা খাতে যে তছনছ অবস্থা তার কিছুটা হলেও সামাল দিতে পেরেছে এই অনলাইন কার্যক্রম। ধন্যবাদ সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

লেখক- বিশেষ প্রতিনিধি, চ্যানেল আই

সভাপতি, বাংলাদেশ এডুকেশন রিপোর্টার্স ফোরাম-বিইআরএফ।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.