এইমাত্র পাওয়া

তালবন জনক একজন দাউদ বিশ্বাসের গল্প

হুমায়ূন কবির হিমু ।।

তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে, আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি কিংবা তিল থেকে তাল হয় এর মতো সমাজে নানা ধরনের কথার প্রচলন আছে তাল গাছকে নিয়ে।

আর নিরবে-নিঃশব্দে অর্ধশতাব্দির বেশিকাল ধরে অগণিত সেই পরিবেশ বান্ধব তালগাছ লাগিয়ে কিংবদন্তির তালিকায় নাম লিখিয়েছেন হাজী দাউদ বিশ্বাস নামের এক ব্যাক্তি। তাল জনক দাউদ বিশ্বাস চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার, হাটবোয়ালী ইউনিয়নের বদ্যিনাথপুর গ্রামের মৃত শওকত আলী মিয়ার ছেলে। শওকত বিশ্বাসের ৭ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট দাউদ বিশ্বাস।

দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ করে বেড়ে ওঠা দাউদ বিশ্বাস ছোট বেলায় বাড়ী ছেড়ে বগুড়াতে লজিং থেকে পড়ালেখা শুরু করেন। বগুড়াতে থাকাবস্তায় তিনি বিভিন্ন ফলদ ও বনজ বৃক্ষের বাগান ছাড়াও ব্যাতিক্রমি তালগাছ লাগানোর প্রতি বিশেষ দুর্বলতা তৈরী হয়। সেখানে লেখাপড়া শেষ না করেই তিনি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের কাকিলাদহ গ্রামের প্রতাপশালী আলী মুন্সির মেয়েকে বিয়ে করে ঘরজামাই থেকে যান।

নিজের দুরদর্শী চিন্তাশক্তি আর শ্বশুর বাড়ীর সহায়তায় তিনি জমি ক্রয়,ক্রয়কৃত জমিতে কৃষিকাজ, পাশাপাশি তহশীল অফিসের সাথে সম্পর্ক রেখে হয়ে যান কয়েকশত বিঘা জমির মালিক। আর তার কাকিলাদহের এই জমিতেই তিল তিল করে গড়ে তোলেন তার সুবিশাল তালবনকাকিলাদহের তালবন কেন্দ্রিক প্রতিবছরের তাল সিজনে এলাকার প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ বিকল্প কর্মের সন্ধান পায়। এ সময় তারা তালের রশ,তাল শাস ও পাকা তাল বিক্রি করা থেকে বছরে ১০ লক্ষাধিক টাকা আয় হয় বলেও জানা গেছে।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথম উড়োজাহাজে করে হজব্রত পালনের সুচনা হয়। ওই বছর তাল জনক দাউদ বিশ্বাস হজব্রত পালন করেন।আজ থেকে ৩২ বছর আগে ১৯৮৫ সালে ৯০ বছর বয়সে তাল বাগানের জনক আলহাজ দাউদ বিশ্বাস মারা যান।
মৃত্যুকালে তিনি দুই স্ত্রী,৭ ছেলে ও ৩ মেয়ে রেখে যান।

অত্র এলাকায় জনশ্রুতি আছে তিনি মারা যাবার দিনও সকালে বেশ কয়েকটি তালের আটি নিজ জমির আইলে রোপন করার সময় হঠাৎই বুকে ব্যাথা উঠলে বাড়ীতে চলে আসেন। পরে তিনি মারা যান।

তাল জনক দাউদ বিশ্বাস মারা যাবার আগ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ৩ শ বিঘা জমিতে ৫ হাজার তালগাছ লাগিয়ে যান।তালগাছ শুধু পরিবেশ বান্ধব বৃক্ষই নয়,তালের কোন কিছুই ফেলনা নয়। তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধ করে,তালের কাঠ দিয়ে ঘরের আড়া, খুটি হয়। তালের রস সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর,তালশাষ,তালের খাজা,তালমিশ্রি,তালপাখা,তালের পিঠা,তালপাতার বাঁশি,তালগাছের আশ দিয়ে মাছ ধরার বিত্তি ও তালের টুপি বানানো হয়।

দাউদ বিশ্বাসের দেখানো পথ ধরে অত্র এলাকার অনেকেই তাল গাছ লাগানো শুরু করে তালবনকে করেছে সমৃদ্ধ।সঠিক করে বলা না গেলেও অনেকেই ধারনা করেন, দাউদ বিশ্বাসের তালগাছের বাগান বাংলাদেশের সর্ববৃহত তালবন।জীবদ্দশায় নয়তো বটেই, মৃত্যুবরণের ৩২ বছরেও তালবন সৃষ্টির জনক হাজী দাউদ বিশ্বাসকে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় স্বিকৃতি প্রদান করা হয়নি।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.