গত ৮ মার্চের পর এখন পর্যন্ত করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ৪০ দিনের বেশি সময় পার করেছে। সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ। অনুমেয় ছিল যে এ সময়টিতে ভাইরাসটির প্রকোপ বাড়তে পারে। ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রেও তা–ই হয়েছে। টেস্টের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোট আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ১৪৪ এবং মৃতের সংখ্যা ৮৪। মোট টেস্টের বিপরীতে মোট আক্রান্ত শতকরা ১০ ভাগ এবং মৃত্যুর পরিমাণ ৪ ভাগ। গত পাঁচ দিনে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৪১ জন, যা মোট আক্রান্তের শতকরা ৬৩ ভাগ। গত ১০ দিনের আক্রান্তের হিসাবে যা শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি। এই পরিসংখ্যান যথেষ্ট উদ্বেগজনক এবং আশঙ্কাজনক। সব ধরনের পূর্বাভাস, সতর্কতা কিংবা অবহেলার মধ্যেই করোনাভাইরাস তার স্বরূপে প্রকাশ পাচ্ছে।
বাংলাদেশ সংক্রমণের চতুর্থ ধাপে প্রবেশ করেছে। উপরিউক্ত পরিসংখ্যান তারই অকাট্য প্রমাণ। এর অর্থ এই যে আমার-আপনার পাশের যে লোকটিকে আমরা নিরাপদ ভাবছি, সে আর কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। এমন ব্যক্তি সংক্রমিত হবে, যার আসলে সংক্রমিত হওয়ার কথা নয়। সংক্রমণের উৎস এবং কারণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে না। পাশাপাশি উপসর্গহীন সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। দীর্ঘ লকডাউনের ক্লান্তি, পেটের তাগিদ এবং বাঙালির ঔদাসীন্য মনোভাবের কারণে মানুষ বাসা থেকে বের হয়ে আসবে। সব মিলিয়ে করোনা পরিস্থিতি একটি জটিল মোড় নিতে পারে।
এ অবস্থায় বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং আগামী সময়কে বিবেচনায় নিতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি নিতে হবে, যেখানে দুটি বিষয়ের ওপর সমানভাবে জোর দিতে হবে। প্রথমত, চিকিৎসাসেবা রোগের বর্তমান বিস্তার থেকে আশঙ্কা হয় যে এটি আর হাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না, লাখে পৌঁছে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও ইতালির ক্ষেত্রে মোট করোনা রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা যখন আমাদের বর্তমান মৃত্যুর সংখ্যার (৮৪) সমান ছিল, তার ঠিক ১০ দিন পরে সেই সংখ্যা হাজার পেরিয়ে যায়। সুতরাং এটি খুব সহজেই অনুমেয় যে আগামী দিনগুলোয় রোগীর সংখ্যা বাড়বে। রোগীর সংখ্যা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ কিংবা গাজীপুরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্থানীয় সংক্রমণের ধারাবাহিকতায় সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
সুতরাং, প্রতিটি জেলা শহরে কেন্দ্রীয়ভাবে বিশেষায়িত হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসাসেবা সংবলিত আইসোলেশন সেন্টার এখন থেকেই শুরু করতে হবে। আইইডিসিআর–কে কেন্দ্রে রেখে এই বিশেষায়িত হাসপাতালের সঙ্গে জেলার উপজেলা, ইউনিয়ন, থানা ও গ্রামকে সংযুক্ত করতে হবে। প্রচুর অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর ও ওষুধের (হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন কিংবা ফেভিপিরাভির) সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভব না হলে কম খরচে নেগেটিভ ফ্লো রুম তৈরি করা যেতে পারে। রোগীর সংখ্যা বাড়ার আগেই এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নিউইয়র্কে বিভিন্ন পার্ক, গাড়ির পার্কিং এবং শপিংমলের খোলা জায়গায় অস্থায়ীভাবে এ ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোগীর সংখ্যা সামলাতে তাদের হিমশিম খাওয়া অবস্থা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত নার্স, চিকিৎসক এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষাসামগ্রী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং চিকিৎসাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে কারণ তারাই হলেন এই সময়ের মুক্তিযোদ্ধা।
মোট আক্রান্ত করোনা রোগীর শতকরা ৬৮ জনকে তাদের নিজ বাসভবনে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা এসব রোগীর চিকিৎসা–সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো কম প্রকাশিত হচ্ছে। এই ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে। অন্যথায়, এসব রোগী থেকে নতুনভাবে লাগামহীনভাবে সংক্রমণ হতে পারে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো প্রতিরোধব্যবস্থা, যা বাংলাদেশে প্রথম থেকে করে আসছে। এর মধ্যে আছে বাসায় থাকা, লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব, হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার করা এবং পরিচ্ছন্নতার চর্চা। লকডাউন কিংবা বাসায় থাকার ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। মানুষকে বাসায় আটকে রাখা যাচ্ছে না, বিশেষ করে তরুণ সমাজকে। করোনাভাইরাসে মোট আক্রান্তের অধিকাংশই তরুণ। মাস্ক ব্যবহার করা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। সমাজের ভেতরের অসারতা, অসচেতনতা এবং অশিক্ষার অবয়বটি মাঝেমধ্যে নির্লজ্জভাবে বের হয়ে আসছে। প্রচারণার ধরন পরিবর্তন করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে রয়েছে সীমাহীন বিশৃঙ্খলা। শৃঙ্খলাপরায়ণ সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখতে হবে ত্রাণ বিতরণসহ সব জরুরি প্রয়োজনে।
বিশেষজ্ঞ মহল থেকে একটি কথা বলা হয়েছে যে মহামারিতে টেস্টের বিষয়টি খুব জরুরি নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটা সত্য হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই মত কার্যকরী নয়। বিশ্বব্যাপী করোনা প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত টেস্টের বিকল্প অন্য কিছু নেই। টেস্টের সংখ্যা এবং পরিধি যথাসম্ভব বাড়াতে হবে। এই মুহূর্তে প্রতিদিন দুই হাজারেরও বেশি টেস্ট করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এই সংখ্যা খুবই নগণ্য। দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিদিন ২০ হাজারেরও বেশি টেস্ট করেছে, যা তাদের সাফল্যের মূল কারণ বলে জানিয়েছেন তাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরীক্ষার সামর্থ্য আছে, এমন সব ল্যাবকে তালিকাভুক্ত করে তাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আশার কথা হলো, বাংলাদেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নমুনা পরীক্ষা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এ ছাড়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অভিজ্ঞ শিক্ষক ও গবেষক রয়েছেন। তাঁদের কাজে লাগাতে হবে।
স্থানীয় সংক্রমণের এই পর্যায়ে অ্যান্টিবডি টেস্ট শুরু করা যেতে পারে। যার মাধ্যমে ব্যাপক হারে নমুনা টেস্ট করা সম্ভব হবে। কারণ, মোটামুটি মানের সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অ্যান্টিবডি টেস্টের সুযোগ রয়েছে। এবং রয়েছে এক বিশাল প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী। তবে সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে যে ঠিক কখন এই টেস্ট শুরু করা যেতে পারে।
সমগ্র বাংলাদেশে করোনা প্রতিরোধ এবং এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণে পর্যাপ্ত জনস্বাস্থ্য জনবল প্রয়োজন। প্রয়োজন তাঁদের উন্নত প্রশিক্ষণ। এই জনবল সংগ্রহ এবং তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। সময় আসন্ন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে।
মো. তাজউদ্দিন সিকদার: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সভাপতি ও সহযোগী
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
