সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি কি আদৌ প্রকৃত শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তুলছে?

সৃজনশীল পদ্ধতি বলতে মূলত মূল পাঠ্য বইয়ের যে বিষয় রয়েছে সেখান থেকে প্রশ্ন না করে তারই মুল ভাবের আলোকে জ্ঞানমূলক, অনুধাবন মুলক, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা এই ৪ টি ধাপে প্রশ্ন করাকে বোঝায়।

আমাদের দেশে যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু করার লক্ষ্যে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ স্তর পর্যন্ত সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছে। তবে সৃজনশীল পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। ভীতিকর বিষয়ই হচ্ছে সৃজনশীল পদ্ধতির কারনে শিক্ষার্থীদের গাইড বইয়ের প্রতি নির্ভরশীলতা দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে ফলে মূল পাঠ্য পুস্তক থেকে তারা দূরে সরে যাচ্ছে।

মূলত শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যায় নিরুৎসাহিত করা, গাইড নির্ভরতা কমানো ও কোচিং দৌরাত্ব বন্ধের লক্ষ্যে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়, কিন্তু এর কোনটি ঠেকানো সম্ভব হচ্ছেনা। শিক্ষকরা যারা অনেকদিন ধরে একভাবে পড়িয়ে আসছেন ,তারা অনেকেই নতুন পদ্ধতি শিখতে আগ্রহী নন। সে ক্ষেত্রে সৃজনশীল প্রশ্ন প্রনয়নের জন্য সরাসরি গাইড বই থেকে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন।আমার প্রশ্ন গাইড দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে দিলে সেটি কিভাবে সৃজনশীল প্রশ্ন হয়?

সম্প্রতি এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে তুমুল বিতর্ক হয়েছে৷ সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাদের ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, শহীদ দিবস কবে তা-ও জানে না৷ এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? জিপিএ ৫ আগের চেয়ে বাড়লেও প্রকৃত শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে উঠছে না। বাড়ছে না শিক্ষার মান। এটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
সব থেকে বড় সমস্যা যেটি সেটি হলো যে সমস্ত শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন প্রনয়ন করবেন তাদেরই সৃজনশীল সম্পর্কে তেমন ধারনা নেই। মাউশির প্রতিবেদনেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের এমন অযোগ্যতার বিষয়টা উঠে এসেছে। সে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গড়ে দেশের ৫২.০৫ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এখনো সৃজনশীল অংশ বোঝেন না। এর মধ্যে ৩০.৮৯ শতাংশ শিক্ষক অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহায়তায় প্রশ্ন তৈরি করেন। আর সমিতি থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করেন ২১.১৭ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। (সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৩ আগস্ট, ২০১৭)।

২০১৬ সালে মাউশির প্রতিবেদনেও অনুরূপ তথ্য উঠে এসেছিল। বরং এবারের প্রতিবেদনে পরিস্থিতির উন্নতি তো নয়; বরং অবনতির চিত্রই ফুটে উঠেছে। ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের ৪৫ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন না। (সূত্র : প্রথম আলো, ১৫ অক্টোবর, ২০১৬)

পুরোনো সিলেবাস বদলে নতুন ব্যবস্থা অর্থাৎ সৃজনশীল পদ্ধতি চালু যদি হয় সফলতার শুরুর চিত্র তাহলে বলতেই হবে এতদিনে আমাদের অগ্রযাত্রা কাঙ্ক্ষিত রূপ এবং গতি কোনোটাই পায়নি বরং নানা সময়ে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোচিং ব্যবসা তার দুরন্ত গতি অব্যাহত রাখতে পেরেছে। গাইড বইয়ে এখন বাজার আরো বেশি ছেয়ে গেছে, বরং যে গাইড বই ছিল ২৫ ফর্মার এখন তা হয়েছে ৫০ ফর্মার। আর অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে গৃহশিক্ষকের রুটিন হয়েছে ক্লাস রুটিনের চেয়েও অনেক গুরুত্ত্বপূর্ন।

এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মেধার যাচাই সঠিক ভাবে হচ্ছেনা বলে আমি মনে করি। সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে, যখন পরীক্ষার খাতা দেখা হচ্ছে তখন শিক্ষকদের বলা হচ্ছে, যে সকল শিক্ষার্থী প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার মুল বিষয়টি সম্পূর্ণ লিখতে পারবে তাদেরকে পূর্ণ মার্কস দিতে হবে আবার অন্যদিকে যে প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার বিষয়টি কোনমতে বুঝতে পেরে লিখা শুরু করবে সে সম্পূর্ণ না লিখলেও তাকেও কাছাকাছি মার্কস দিতে হবে। তাহলে মেধার যাচাই হল কি করে? সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালুর দীর্ঘ সময় কেটে গেছে তাই এখন আমাদের ভাবার সময় হয়েছে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি কি আদৌ সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে সাহায্য করছে নাকি এই শিক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে !

লেখক: সজল আহমেদ
প্রভাষক, কাজি আজহার আলি কলেজ ফকিরহাট, বাগেরহাট।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.