মো. নূরুজ্জামান।।
৯ এপ্রিল দিবাগতরাত পবিত্র শবে বরাত। শবে বরাত ফারসি ভাষার শব্দ। ফারসি ভাষায় ‘শব’ শব্দের অর্থ রাত ও ‘বরাত’ অর্থ সৌভাগ্য। এ দুটি শব্দ নিয়ে ‘শবে বরাত’ বা সৌভাগ্যের রাত। আরবিতে একে বলে ‘লাইলাতুল বরাত’। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ১৪ শাবান দিবাগত রাতটিই পবিত্র শবে বরাত হিসেবে উদযাপন করে থাকেন। এ রাতটি বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের জন্য তার অশেষ রহমতের দরজা খুলে দেন।
ইসলাম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সূর্যাস্তের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত রাত সময়টুকু মহিমান্বিত ভাগ্য-রজনী; পাপ মোচনের পরম সৌভাগ্যের রাত। এ রাতেই পরবর্তী বছরের জন্য ভাগ্য নির্ধারিত হয়। নির্ধারিত হয় হায়াত-মউত, রিজিক-দৌলত ও আমল। বিশেষ পুণ্য লাভের উদ্দেশে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মুসলমানরা তাৎপর্যপূর্ণ এ রাতে ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আজকার, মিলাদ-মাহফিল, নফল নামাজ আদায় ও কোরআন তেলাওয়াতে মশগুল থাকবেন। মহিমান্বিত এ রজনীতে মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশ্বের মুসলমান সম্প্রদায় বিশেষ মোনাজাত ও দোয়া করবেন। মুসলমানদের কাছে মাহে রমজানের বার্তাও বয়ে আনে শবেবরাত। এটি রমজানের প্রস্তুতিও বটে। শাবান মাসের পর আসে পবিত্র মাহে রমজান।
ফজিলত:
(১) এ প্রসঙ্গে হযরত আয়শা (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত আছে যে, নবী করিম (সা.) হযরত আয়শা (রা.) কে সম্বোধন করে বললেন, হে আয়শা! এ রাতে কি হয় জানো? হযরত আয়শা (রা.) বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল (সা.) বললেন, এ রাতে আগামী বছর যত শিশু জন্ম নিবে এবং যত লোক মারা যাবে তাদের নাম লেখা হয়, মানুষের বিগত বছরের সব আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং মানুষের রিজিক অবতীর্ণ হয়। (মিশকাত শরীফ ১ম খ- পৃ. ১১৫)
(২) হযরত উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ১৫ শাবান রাতে এ শবে বরাত থেকে পরবর্তী শবে বরাত পর্যন্ত মানুষের বয়স নির্ধারিত হয়। এমনকি এ সময়ের মধ্যে কেউ তো বিয়ে করে তার সন্তান জন্ম নেয় অথচ দুই শাবানের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যারা মারা যাবে তাদের তালিকায় তার নাম রয়েছে।পূর্বোক্ত হাদিসদ্বয় বিশদভাবে পর্যালোচনা করলে সহজেই অনুমেয় যে, লাইলাতুন নিস্ফ মিন শাবান- (শবে বরাত) ভাগ্য রজনীও বটে।
এ রাতে আমাদের করণীয় :
(১) রাত জেগে ইবাদাত করা। যেমন- নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, তওবা-ইস্তিগফার ইত্যাদি। কেননা হাদিস শরীফে এসেছে- এ রাতে সূর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং ফজর পর্যন্ত মানুষকে তাঁর কাছে ক্ষমা, রোগ মুক্তি, জাহান্নাম থেকে মুক্তি, রিজিক ইত্যাদি বৈধ প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রার্থনা করার জন্য আহ্বান করতে থাকেন।
হযরত আবু বকর (রা.) নবী করিম (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন- আল্লাহ তায়ালা শবে বরাতে পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং কাফের-মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করেন।
হাদিসের ব্যাখ্যায় এসেছে এ ধরনের লোকেরাও যদি খালেছভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ভবিষ্যতে আর কুফরি, শেরেকি ও হিংসা করবে না বলে ওয়াদা করে তবে আল্লাহ এদেরও ক্ষমা করে দেন।
শবে বরাতের সব ইবাদাতই নফল। নফল ইবাদাত নির্জনে একাকী করাই উত্তম। রাসূল (সা.) বহু হাদিসে নফল নামাজ বাড়িঘরে, নির্জনে-নিভৃতে আদায় করার পরামর্শ দিয়েছেন। শবে বরাতে নফল নামাযের ধরা-বাঁধা কোনো নিয়ম নেই বরং অন্যান্য নফল নামাজের মতো দুই/চার রাকাত নিয়ত করে সূরায়ে ফাতিহার পরে যে কোনো সূরা মিলিয়ে যত ইচ্ছা পড়া যেতে পারে। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যে, রাতভর নফল ইবাদাত করে ফজর নামাজ কাজা না হয়ে যায়। কারণ হাজার রাকাত নফল নামাজের ছাওয়াব একটি ফরজ নামাজের সমতুল্য হবে না।
(২) পরদিন রোজা রাখা, কেননা রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- ১৪ শাবানের দিবাগত রাত জেগে ইবাদাত কর এবং পরদিন ১৫ শাবান রোজা রাখ। যারা শব-ই-বরাত উপলক্ষে রোজা রাখবো তারা একটি রোজা রাখতে চাইলে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ইবাদত করে শুক্রবার দিন রোজা রাখব। যারা একটির বেশি রোজা রাখতে চাই তারা বুধ, বৃহস্পতি এবং শুক্রবার এই তিন দিন রোজা রাখব।
(৩) যতদূর সম্ভব অনাড়ম্বরভাবে কবর জিয়ারত করা। যেমন হাদিসে পাকের ইরশাদ : হযরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক রাতে রাসূল (সা.) কে হারিয়ে ফেললাম। অতঃপর আমি তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। অবশেষে তাকে জান্নাতুল বাকীতে পেলাম।
আমাকে দেখে তিনি বললেন, আয়শা তুমি কি আশঙ্কা করছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি জুলুম করবেন? হযরত আয়শা বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল- আমি ধারণা করেছিলাম, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোন স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন। অতঃপর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন,১৫ শাবান আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বনু-কাল্ব গোত্রের মেষের পশম অপেক্ষা অধিক লোককে ক্ষমা করেন। (তিরমিযী- ১ম খঃ পৃ. ১৫৬) উল্লেখ্য, আরবে বনু কালবের অধিক মেষ ছিল। তবে যেহেতু এ বছর করোনা ভাইরাসের কারনে লক ডাউন চলছে সেহেতু ঘরে বসে ইবাদতেই মনোনিবেশ করতে হবে। পরিবেশগত কারণে কবর যিয়ারত না করাই ভাল।
শবে বরাতে বর্জনীয়:
এ রাতে হালুয়া,রুটি ও পায়েস তৈরি করে গরিব-দুঃখী, আত্নীয়স্বজন, প্রতিবেশদের ঘরে তৈরি করে ধুমধামের সাথে বিতরণ করা হয় যেটা আদো উচিত নয়। কেননা আপনি খাবার দিতে চাইলে বছরের যে কোন সময়ই করতে পারেন কিন্তু এ রাতকে ঘিরে করার রেওয়াজ ইসলাম সমর্থন করে না। বরং এ রাত ইবাদের রাত। আমরা যদি এসব কাজে রাত্রী পার করে দিই তবে অন্যান্য ইবাদত করবো কবে? অনেকে শবে বরাতের নামে আলোকসজ্জা, কবর সাজানো, কবরে মেলা বসানো, চাঁদাবাজি করে শিরকের ব্যবস্থা, শাবিনা খতম ইত্যাদির মাধ্যমে শবে বরাতকে একটি জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের রূপ দিতে চায়। তারা বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। হাদিসে বর্ণিত নফল ইবাদাতগুলো ছাড়া অন্য সব রুসম-রেওয়াজ (রীতি) ও কুসংস্কার ছেড়ে দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার তওফিক আল্লাহ সবাইকে দান করুন। আ-মিন।
লেখক- সহকারি শিক্ষক, খায়রুল্লাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
