তরুণদের যা জানা দরকার

চৌধুরী নূরুল হুদা

মুক্তির সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না। ক্ষেত্র পরিবর্তন হয় মাত্র। আর একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য, সেটি হলো মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা বয়সে শিশু-কিশোর ছিলেন তাদের অবদান; মুক্তিযুদ্ধের নব অধ্যায়ে তাদের সংযুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এর অন্তর্নিহিত ভূমিকা ও এর প্রেক্ষাপট বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণে নিয়ে আসা। এই শিশুরা ১৯৭১-এর ৯ মাস যুদ্ধে তাদের কর্মকাণ্ড ও অবদানের নানা দিক বিশ্লেষণ করে মূল্যায়নের পরিমাপ সম্বন্ধে বর্তমান প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা এবং তাদের মুক্তির আন্দোলনে সংযুক্ত করা। পাকিস্তান দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত, এর একটি তথাকথিত দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল। একাত্তরে পাকিস্তানপন্থিরা অস্ত্রের মুখে আত্মসমর্পণ করেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দ্বিজাতিতত্ত্ববাদ খণ্ডন এবং বাংলা ও বাঙালির দর্শন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এই আধুনিক বিশ্বে অনেক দেশ রয়েছে এবং প্রতিটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতিসহ দীর্ঘকালের পরিক্রমার এক একটি পর্যায়ক্রমিক তথ্যের ব্যাপক গবেষণার ওপর দণ্ডায়মান। আমাদের এই বাংলাদেশ শোষণ, নিপীড়ন ও নির্যাতনের এবং একাত্তরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নানা অধ্যায় এখনো অজানা রয়ে গেছে। এ দেশের স্বাধীনতা অর্জনে মুক্তিযুদ্ধে শিশু-কিশোর-তরুণ তথা ছাত্রসমাজ, কৃষক-শ্রমিক আবালবৃদ্ধবনিতাসহ মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে জাতীয় ইতিহাসে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের লাল-সবুজ অঙ্কিত একটি মানচিত্র। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এগিয়ে যাওয়ার দৃপ্ত উচ্ছ্বাস। এই উচ্ছ্বাস লালন ও ধারণ করে আমাদের অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে।

আমরা তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরে আগামীর যাত্রাপথ আরো সংস্কৃতিময় সৃষ্টিশীল করার সোপানে সুদৃঢ় ভূমিকা রাখা হউক আমাদের অঙ্গীকার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও এর সঠিক মূল্যায়নে প্রচুর গবেষণা প্রয়োজন। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল এলাকায় নানা শ্রেণির, নানা সংস্কৃতির ভৌগোলিক অবস্থানের নিরিখে দীর্ঘ ৯ মাস একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুধু ৯ মাসব্যাপী যুদ্ধ হয়নি, তারও আগে ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল খুবই দুর্বল। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য যে একটি স্বয়ংসস্পূর্ণ রাজনৈতিক সুদৃঢ় ভিত্তি প্রয়োজন, সেটির অভাব ছিল পাকিস্তানের। রাজনৈতিক পরিবেশ ও নেতৃত্বদানকারী বা দিকনির্দেশনাকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন। পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির সঙ্গে পূর্ববঙ্গের জনসাধারণের প্রথম বিরোধের সূত্রপাত ঘটে ভাষাকে কেন্দ্র করে। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক যুবলীগের আবুল কাশেম তমদ্দুন মজলিশের মহাসচিব নির্বাচিত হন এবং বাংলা ভাষা আন্দোলনকে সুসংঘবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলায় গণ-আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী চেতনার সৃষ্টি হয়। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলে ছিল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিগ্রহের অনুভূতি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১—এ দীর্ঘকালীন নিষ্পেষণ বাঙালির বুকে অবিস্মরণীয় ইতিহাসের অজানা তথ্য গবেষণামাধ্যমে অর্জন করতে হবে।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে যারা ছিলেন শিশু-কিশোর, তারাও মুক্তিযোদ্ধা। কারণ তাদের অবদান অস্বীকার করার জো নেই। মায়ের কোলে থেকেও যে ভয়ংকর দৃশ্যের মোকাবিলা করেছেন, তা সত্যিই অমানবিক ও কষ্টকর। এখনো মুক্তিযুদ্ধের এই সহযোদ্ধারা একাত্তরের ভয়াবহ যুদ্ধের স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন। অনেক মানুষ মুক্তিযুদ্ধের ঐ সময়ের শিশুর মা, বাবা, ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজন হারিয়ে এতিম হয়েছিলেন। এমন শিশু সহযোদ্ধা রয়েছে, যারা সম্মুখযুদ্ধে বয়স্ক মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। দেশাত্মবোধের কোমল স্পর্শ ধারণ করে এই শিশুরা বিপক্ষ শত্রুদের বিপজ্জনক অবস্থানে বয়স্ক মুক্তিযোদ্ধাদের নানা রসদ দিয়েছেন। এদের বিষয়ে জাতির দায়বদ্ধাতা থাকা উচিত বলে মনে করি।

n লেখক :কবি, গবেষক ও সংগঠক


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.