এইমাত্র পাওয়া

বিশ্ব শিশু শাস্তি বিলোপ দিবস

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

১০ বছরের শিশু নাহিদ হাসান। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র সে। ২২ এপ্রিল মাদ্রাসায় পড়া ঠিকমতো বলতে না পারায় শিক্ষক তার ওপর চড়াও হন। হাতে থাকা বেত দিয়েই চলতে থাকে আঘাত। নাহিদের পিঠে, হাতে, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পড়ে বেতের দাগ। ভয়ে, ব্যথায় নিশ্চুপ হয়ে যায় নাহিদ।

বিকেলে বাবা মিজানুর রহমান নাশতা নিয়ে মাদ্রাসায় গেলে ছেলের শরীরে দগদগে ক্ষত দেখে আঁতকে ওঠেন। প্রশ্ন করতেই নাহিদ বলে, ‘পড়া দিতে পারিনি বলে হুজুর আমাকে অনেক মারধর করেছেন। হাতজোড় করেও রক্ষা পাইনি।’

নাহিদের বাবা মিজানুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষক শাসন করবেন, এতে আপত্তি নেই। কিন্তু যেভাবে আমার ছেলেকে মারা হয়েছে, তা অমানবিক। চোরকেও এভাবে মারা হয় না।’

নাহিদের এই ঘটনা শুধু একটি শিশুকে দেওয়া শারীরিক শাস্তির গল্প নয়। এটি বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সমাজে শিশুদের ওপর শৃঙ্খলার নামে সহিংসতা চাপিয়ে দেওয়ার একটা খণ্ডচিত্র।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু শারীরিক শাস্তির শিকার হয়ে থাকে। ৫ থেকে ৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার ৮৯ দশমিক ৮ শতাংশ।

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তি নিষিদ্ধ করতে ২০১১ সালে একটি পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারপরও শিশুরা শিক্ষকদের মারধর ও অপমানের শিকার হচ্ছে। বাড়ি, প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রেও শাস্তির নামে শিশুদের ওপর চলে সহিংসতা।

এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ ৩০ এপ্রিল পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু শাস্তি বিলোপ দিবস। বাংলাদেশে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই দিবসটি পালন করে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘করপোরাল পানিশমেন্ট অব চিলড্রেন: দ্য পাবলিক হেলথ ইম্প্যাক্ট (২০২৫)’ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৮ বছরের নিচের অর্ধেকের বেশি শিশু প্রতিবছর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়। এদের মধ্যে ১৭ শতাংশ শিশু গুরুতর শাস্তির মুখোমুখি হয়। যেমন মাথা, মুখ বা কানে আঘাত করা, অথবা জোরে ও বারবার মারধর করা।

৪৯টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা শাস্তির শিকার হয় তাদের বিকাশের সম্ভাবনা সমবয়সীদের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমে যায়। শাস্তি শরীরে হরমোনজনিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে আত্মমর্যাদা হ্রাস পায় এবং উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং পরিণত বয়সে অসামাজিক আচরণ বা মাদকাসক্তির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

লেখক ও গবেষক এবং শিশু অধিকারকর্মী গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, মারপিটকে প্রয়োজনীয় হিসেবে মনে করেন অনেকে। বেশির ভাগ অভিভাবক ও শিক্ষকদের ধারণা, ‘মারের ওপর ওষুধ নাই’। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শারীরিক শাস্তি বা মারপিট স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শাস্তি শিশুর মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং নিঃসন্দেহে শিশু অধিকারের ভয়াবহ লঙ্ঘন। বাংলাদেশের মা-বাবা, শিক্ষকসহ অনেকের মাঝেই ভুল ধারণা রয়েছে যে শাস্তি শিশুদের সঠিক আচরণ করতে শেখায়। বড়রা শাস্তি দিলে শিশুরা ভয়ের কারণে কোনো বিষয় মেনে নিতে বাধ্য হয়, কিন্তু বুঝিয়ে বলা হয় না বলে তারা এর কারণ অনুধাবন করতে পারে না। তাই সুযোগ পেলেই তারা আগের আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। এ কারণেই শিশুদের কিছু শেখানোর কৌশল হিসেবে শাস্তি একটি অকার্যকর পদ্ধতি।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার জানান, পৃথিবীর ৭০টি দেশে বাড়ি, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রসহ সব ক্ষেত্রে শিশুদের শাস্তি নিষিদ্ধ করে আইন করেছে। বাংলাদেশ এখনো এই তালিকায় নেই।

শিশু অধিকারকর্মীরা মনে করেন, বেশির ভাগ সময়ই শাস্তির ঘটনা ঘটে বয়স্কদের ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনের হতাশা থেকে। শাস্তি না দিয়ে ইতিবাচকভাবে শিশুদের বড় করা ও শিক্ষা-প্রদান সম্পর্কে মা-বাবা এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। সেই সঙ্গে শিশুদের শাস্তি নিষিদ্ধ করে একটি নতুন আইন প্রণয়নের দাবি তাঁদের।

শিক্ষাবার্তা /এ/ ৩০ /০৪/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.