এইমাত্র পাওয়া

অফিসে বসে প্রকাশ্যে ধূমপান, টেবিলে ফাইল: কোন বার্তা দিচ্ছে প্রশাসন?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠান নয়—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আচরণ, দৃষ্টান্ত এবং নৈতিকতা। একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন অফিসে বসে কাজ করেন, তখন তিনি কেবল নিজের দায়িত্ব পালন করেন না; তিনি রাষ্ট্রের একটি প্রতীক হিসেবেও কাজ করেন। সেই প্রতীকের ভেতর যদি শৃঙ্খলার পরিবর্তে উদাসীনতা, দায়িত্ববোধের পরিবর্তে অবহেলা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার পরিবর্তে প্রকাশ্য অবজ্ঞা ফুটে ওঠে, তখন তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না—বরং একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।

রংপুরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার নিজ অফিসকক্ষে বসে প্রকাশ্যে ধূমপানের ঘটনা এমনই এক প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। টেবিলে ফাইল, সামনে সহকর্মীরা, আর মাঝখানে দায়িত্বশীল একটি পদে থাকা ব্যক্তি—এই দৃশ্যটি শুধুই একটি ভিডিওর অংশ নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি প্রতীকী চিত্র।

প্রথমত, বিষয়টি সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও আইনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ—এটি কোনো নৈতিক অনুরোধ নয়, এটি একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। সরকারি অফিস, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসা-যাওয়া করে, সেখানে ধূমপান কেবল অসৌজন্যমূলক নয়, এটি স্পষ্টতই আইন লঙ্ঘন। একজন সাধারণ নাগরিক যদি এই অপরাধ করেন, তবে তাকে জরিমানা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু যখন একই কাজ একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা করেন, তখন প্রশ্ন জাগে—আইন কি সবার জন্য সমান?

এই প্রশ্নের উত্তর যতটা আইনের বইয়ে, তার চেয়েও বেশি লুকিয়ে আছে আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে। আমরা প্রায়ই দেখি, ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে দায়বদ্ধতা কমে যায়। পদ যত উঁচু হয়, ততই যেন নিয়মের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। অথচ বাস্তবতা হওয়া উচিত ছিল সম্পূর্ণ উল্টো—যত উচ্চপদ, তত বেশি দায়িত্ব, তত বেশি সতর্কতা, তত বেশি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।

দ্বিতীয়ত, এই ঘটনার একটি মনস্তাত্ত্বিক দিক রয়েছে, যা আরও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। একজন কর্মকর্তা যখন সহকর্মীদের সামনে বসে এমন আচরণ করেন, তখন তিনি অজান্তেই একটি বার্তা দেন—“আমি যা করছি, তা গ্রহণযোগ্য।” এই বার্তাটি ধীরে ধীরে একটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। জুনিয়ররা মনে করতে শুরু করে, নিয়ম মানা জরুরি নয়; বরং ক্ষমতার কাছে নিয়ম নমনীয়। এর ফলে একটি প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলার জায়গায় আসে অনিয়ম, দায়িত্ববোধের জায়গায় আসে সুবিধাবাদ।

এই ধরনের আচরণ শিক্ষা বিভাগের মতো একটি সংবেদনশীল খাতে আরও বেশি উদ্বেগজনক। কারণ শিক্ষা শুধু জ্ঞান দেওয়ার বিষয় নয়; এটি মূল্যবোধ গঠনের একটি প্রক্রিয়া। যখন শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিরাই নিয়ম ভঙ্গ করেন, তখন তা শিক্ষকদের কাছে কী বার্তা পৌঁছে দেয়? আর সেই শিক্ষকরা যখন শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়ান, তখন সেই বার্তার প্রতিফলন কোথায় গিয়ে থামে?

তৃতীয়ত, এই ঘটনাকে ঘিরে যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে—এমপিও বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেন—তা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই প্রয়োজন, তবুও একটি বিষয় পরিষ্কার: যখন একজন কর্মকর্তার আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তার প্রতিটি কাজই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়। এটি শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্যই ক্ষতিকর।

দুর্নীতি কখনোই হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে—ছোট ছোট অনিয়ম, ছোট ছোট আপস, ছোট ছোট অবহেলার মধ্য দিয়ে। অফিসে ধূমপান হয়তো একটি ছোট বিষয় মনে হতে পারে, কিন্তু এটি সেই মানসিকতারই প্রতিফলন, যেখানে নিয়মকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আর যখন নিয়মকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তখন বড় ধরনের অনিয়মের পথও সহজ হয়ে যায়।

চতুর্থত, এই ঘটনার পর প্রশাসনের নীরবতা একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া, কোনো ব্যাখ্যা না দেওয়া—এসবই একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়। এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করে যে, ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা নিয়ম রয়েছে। এই ধারণা যত শক্তিশালী হয়, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা তত দুর্বল হয়ে পড়ে।

একটি সুস্থ প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ঘটনার পর দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে না পারলে, অনিয়মকে কার্যত প্রশ্রয় দেওয়া হয়। আর প্রশ্রয় পেলে অনিয়ম কখনো কমে না; বরং আরও বিস্তৃত হয়।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—আমরা কেমন প্রশাসন চাই? এমন একটি প্রশাসন, যেখানে আইন শুধু সাধারণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য, আর কর্মকর্তারা তার ঊর্ধ্বে? নাকি এমন একটি প্রশাসন, যেখানে সবার জন্য একই নিয়ম, একই জবাবদিহিতা?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নীতিনির্ধারকদের নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রশাসনের আচরণই শেষ পর্যন্ত সমাজের আচরণকে প্রভাবিত করে। যদি আমরা নিয়ম ভাঙাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, তাহলে একসময় সেটিই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।

সমাধানের পথও তাই এখান থেকেই শুরু করতে হবে।

প্রথমত, আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে—পদমর্যাদা যাই হোক না কেন।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের ভেতরে একটি শক্তিশালী নৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নিয়ম মানা শুধু বাধ্যবাধকতা নয়, বরং গর্বের বিষয়।

তৃতীয়ত, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

সবশেষে, মনে রাখতে হবে—একটি ছোট দৃশ্য, একটি ছোট আচরণ, কখনো কখনো একটি বড় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। অফিসে বসে ধূমপান করা সেই দৃশ্যটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, কোথাও না কোথাও আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি গভীর সমস্যা রয়েছে।

টেবিলে ফাইল থাকা মানে দায়িত্ব পালন নয়; দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন সততা, শৃঙ্খলা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা। আর এই তিনটি জিনিসই যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে যত ফাইলই টেবিলে থাকুক না কেন, সেই কাজ কখনোই সঠিক অর্থে সম্পন্ন হয় না।

অতএব, প্রশ্নটি শুধু একজন কর্মকর্তাকে নিয়ে নয়; এটি আমাদের পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি একটি প্রশ্ন—আমরা কী বার্তা দিচ্ছি? আমরা কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই, নাকি নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতিকে আরও গভীর করতে চাই? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/ ৩০ /০৪/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.