প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগে মেধাই হোক নেতৃত্বের মানদণ্ড

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি দেশের মানবসম্পদ গঠনের কারখানা। এই কারখানার চালিকাশক্তি হলো দক্ষ, দূরদর্শী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নেতৃত্বের আসনে বসার জন্য কী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, নাকি প্রখর মেধা ও দক্ষতা? সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কর্তৃক ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
প্রথমেই একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে—অভিজ্ঞতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের সাথে কাজ করতে করতে অনেক কিছু শিখেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা মানেই দক্ষতা—এই ধারণা সবসময় সত্য নয়। অনেক সময় দেখা যায়, বছরের পর বছর চাকরি করলেও কেউ নতুন কিছু শেখার বা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন না। অন্যদিকে, তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কিন্তু মেধাবী ও উদ্ভাবনী চিন্তাধারার শিক্ষক খুব অল্প সময়েই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হন।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। শিক্ষা পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের মানসিকতা—সবকিছুই বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রয়োজন সৃজনশীল নেতৃত্ব। শুধু ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই কেউ এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অনেক সময় দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও পুরনো ধ্যানধারণা নতুন উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে।

এই প্রসঙ্গে একজন শিক্ষক নেতার বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। একটি জাতীয় শিক্ষক সংগঠনের এক নেতা বলেন, “অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটি যেন মেধা ও দক্ষতার বিকল্প না হয়ে ওঠে। আমরা দেখেছি, অনেক তরুণ শিক্ষক নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে আসেন, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন। কিন্তু শুধু অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে তারা নেতৃত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।”

আরেকজন শিক্ষক নেতা মত দেন, “১৮ বছরের অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করা একটি যান্ত্রিক সিদ্ধান্ত। এটি মেধা যাচাইয়ের কোনো কার্যকর পদ্ধতি নয়। বরং একটি সমন্বিত মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকা উচিত, যেখানে একজন প্রার্থীর নেতৃত্বগুণ, উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে অবদান বিবেচনা করা হবে।”

বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক পদটি কেবল জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পূরণ করা হয়। এতে করে যারা দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার পান। কিন্তু এতে প্রতিষ্ঠান সবসময় সেরা নেতৃত্ব পায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান স্থবির হয়ে পড়ে, নতুনত্ব হারিয়ে ফেলে।

অন্যদিকে, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। শিক্ষকরা নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে আগ্রহী হবেন। নতুন নতুন প্রশিক্ষণ গ্রহণ, প্রযুক্তি শেখা, গবেষণামূলক কাজ—এসবের প্রতি ঝোঁক বাড়বে। ফলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নত হবে।

তবে মেধাভিত্তিক নিয়োগ মানে এই নয় যে অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করতে হবে। বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি প্রয়োজন। যেমন—ন্যূনতম অভিজ্ঞতার একটি সীমা থাকতে পারে, কিন্তু সেটি যেন এত বেশি না হয় যে মেধাবীরা সুযোগই না পান। ১৮ বছর অভিজ্ঞতার শর্ত অনেকের কাছেই অযৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে, কারণ এটি একটি বড় অংশের যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষককে প্রতিযোগিতা থেকে বাইরে রাখে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নেতৃত্ব একটি আলাদা দক্ষতা। একজন ভালো শিক্ষক মানেই তিনি একজন ভালো প্রশাসক বা নেতা হবেন, এমন নয়। নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং দূরদর্শিতা। এই গুণগুলো বয়স বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না; এগুলো অর্জন করতে হয় সচেতন চর্চা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।

শিক্ষক নেতারা তাই দীর্ঘদিন ধরে একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন, এবং পূর্বের কাজের মূল্যায়নের মাধ্যমে একজন প্রার্থীর প্রকৃত যোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব। শুধু অভিজ্ঞতার বছর গণনা করে নেতৃত্ব নির্বাচন করা একটি পুরনো ও অকার্যকর পদ্ধতি।

এছাড়া আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেও দেখা যায়, উন্নত দেশগুলোতে নেতৃত্ব নির্বাচনে মেধা ও দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে নির্দিষ্ট বছরের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রার্থীর নেতৃত্বের ভিশন, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশেও এই ধরণের আধুনিক পদ্ধতি চালু করা সময়ের দাবি।

আরেকটি দিক হলো—১৮ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করলে অনেক তরুণ ও মধ্যবয়সী শিক্ষক হতাশ হয়ে পড়বেন। তারা মনে করবেন, যতই মেধাবী বা দক্ষ হোন না কেন, নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কোনো মূল্যায়ন নেই। এতে করে কর্মউদ্যম কমে যেতে পারে, যা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ভালো নয়।

শিক্ষক নেতারা আরও বলেন, “আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে মেধা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা—এই তিনটির সমন্বয় থাকবে। কিন্তু কোনো একটি বিষয় যেন এককভাবে প্রাধান্য না পায়। বিশেষ করে, শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হলে আমরা যোগ্য নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হব।”

সবশেষে বলা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী নেতৃত্ব। সেই নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার মতো কঠোর শর্ত আরোপ না করে একটি সমন্বিত, মেধাভিত্তিক ও দক্ষতাকেন্দ্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত।

কারণ, নেতৃত্বের আসনে বসবেন তিনি-ই, যিনি প্রতিষ্ঠানকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবেন—তিনি যত বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্নই হোন না কেন। তাই সময়ের দাবি—প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগে মেধাই হোক নেতৃত্বের আসল মানদণ্ড।

লেখক: শিক্ষক ও  গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/১৮/০৩/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.