।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
রাকিব নামের এক শিক্ষার্থী। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় সে গণিতে ২২ পেয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী সে ফেল। কিন্তু বছর শেষে “সামগ্রিক বিবেচনায়” তাকে প্রমোশন দেওয়া হলো। নবমে উঠে সে আরও পিছিয়ে গেল, দশমে গিয়ে কোচিংনির্ভর পড়াশোনা আর মুখস্থভিত্তিক প্রস্তুতিতে কোনোমতে এসএসসি পাস। ফল ভালো নয়, ভিত্তি দুর্বল। কলেজে গিয়ে বিজ্ঞান বিভাগে টিকতে পারল না। একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দিল।
রাকিব একা নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন হাজারো শিক্ষার্থী আছে, যারা আসলে ফেল করেই পাস করছে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি নকলমুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার মান বাড়াতে চাই, নাকি সত্যিকার অর্থে শেখার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চাই?
নকল বন্ধ করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু পাবলিক পরীক্ষায় কড়াকড়ি করলেই কি গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত হবে? প্রমোশন নীতির মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া কি মানোন্নয়ন সম্ভব?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার ও শিক্ষা প্রশাসন পাবলিক পরীক্ষায় নকল রোধে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রশ্নফাঁস রোধ, কড়া নজরদারি, কেন্দ্র পরিবর্তন—এসব উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাবলিক পরীক্ষার আগে যে বার্ষিক মূল্যায়ন, টেস্ট পরীক্ষা, নির্বাচনী পরীক্ষা—সেখানে যদি শিথিলতা থাকে, তাহলে শেষ মুহূর্তের কঠোরতা টেকসই ফল দেয় না।
বর্তমানে দেখা যায়—টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলেও শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। বার্ষিক পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে ফেল করেও “বিশেষ বিবেচনায়” প্রমোশন দেওয়া হয়।
উপস্থিতি কম হলেও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় না। এতে বার্তা যায়—ফেল করলেও সমস্যা নেই, কোনো না কোনোভাবে পরের শ্রেণিতে উঠে যাওয়া যাবে। এই সংস্কৃতি শিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করছে।
বাংলাদেশে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যারা এখনও কঠোর একাডেমিক নীতি অনুসরণ করে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় নটর ডেম কলেজ। এই কলেজে—উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। নির্ধারিত মান অর্জন করতে না পারলে শিক্ষার্থীকে ছাড় দেওয়া হয় না। সিলেবাস শতভাগ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এমন নীতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের গৌরব নয়; বরং প্রমাণ করে—কঠোরতা মানেই বৈরিতা নয়, বরং মানের নিশ্চয়তা।
দেশের অন্যান্য কলেজ ও বিদ্যালয় যদি এই ধরনের একাডেমিক শৃঙ্খলা গ্রহণ করে, তবে সামগ্রিক মানোন্নয়ন সম্ভব।
এক সময় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি স্পষ্ট বার্তা ছিল—ফেল করলে পরের শ্রেণিতে ওঠা যাবে না। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক—সবাই দায়িত্বশীল থাকতেন।
এখন “অটো প্রমোশন” বা নমনীয় মূল্যায়ন সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে দায়সারা মনোভাব তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেল নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগের তিনটি বড় উপকারিতা রয়েছে—
© শেখার প্রেরণা বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার্থী জানে—প্রমোশন নিশ্চিত নয়; অর্জন করতে হবে।
© শিক্ষকের জবাবদিহি বাড়ে। ফল খারাপ হলে শিক্ষকও দায় এড়াতে পারেন না।
© প্রতিষ্ঠানের মান রক্ষা হয়।দুর্বল ভিত্তির শিক্ষার্থী উচ্চ শ্রেণিতে গিয়ে আরও বিপর্যস্ত হয় না।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ফেল করা মানেই শিক্ষার্থীকে ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং তাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া। ফেল করা শিক্ষার্থীর জন্য রিমেডিয়াল ব্যবস্থা করা।
যদি কোনো শিক্ষার্থী এক বিষয়ে ফেল করে, তাকে একই অবস্থানে রেখে “শব্দের ট্রেনিং” বা ভিত্তিমূলক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
© অতিরিক্ত ক্লাস
© বিশেষ কোচিং (স্কুলের ভেতরে)
© বিষয়ভিত্তিক কাউন্সেলিং
© দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা
শুধু ফেল করানো নয়; তাকে শিখিয়ে তোলাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এক্ষেত্রে শিক্ষক প্রশিক্ষণও জরুরি। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পদ্ধতি—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
গুণগত শিক্ষা চাইলে শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা বাড়াতে হবে।বেতন কাঠামো প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। কর্মঘণ্টা যৌক্তিক করতে হবে।গবেষণা ও প্রশিক্ষণে প্রণোদনা দিতে হবে।
একজন শিক্ষক যদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় থাকেন, অতিরিক্ত কোচিং নির্ভরতায় ঝুঁকেন, তাহলে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার মান কমে যায়।
শিক্ষা নেতা মো: জসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন,
“শিক্ষককে মর্যাদা না দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। কঠোর প্রমোশন নীতি তখনই কার্যকর হবে, যখন শিক্ষককে সক্ষম করে তোলা হবে।”
শিক্ষক কর্মচারী ঐক্য জোটের যুগ্ম মহাসচিব এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান বলেন— “নকল বন্ধ করা অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে শুধু পাবলিক পরীক্ষায় কড়াকড়ি করে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রকৃত মানোন্নয়নের জন্য প্রমোশন নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। ফেল করলে প্রমোশন দেওয়া যাবে না—এই নীতি কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য রিমেডিয়াল ক্লাস ও বিশেষ সহায়তা চালু করতে হবে। শিক্ষককে আর্থিক ও পেশাগতভাবে শক্তিশালী না করলে কঠোর নীতিও টেকসই হবে না।”
বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়—ফিনল্যান্ডে ধারাবাহিক মূল্যায়ন কঠোরভাবে মানা হয়।
জাপানে উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ কোরিয়ায় একাডেমিক মান রক্ষায় কোনো আপস নেই।
এসব দেশে ফেল করলে পুনরায় প্রস্তুতির সুযোগ থাকে, কিন্তু অযথা প্রমোশন নেই।
বাংলাদেশে পাশের হার অনেক সময় ৮০–৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে (যেমন PISA) আমাদের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। অর্থাৎ, সংখ্যাগত সাফল্য মানেই গুণগত সাফল্য নয়।
বর্তমানে দেখা যায়—
টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করেও শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। নির্বাচনী পরীক্ষার ফল প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।
প্রস্তাব হতে পারে—
© নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করলে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না।
© ন্যূনতম উপস্থিতি ৯০–১০০ শতাংশ নিশ্চিত করতে হবে।
© সিলেবাস শতভাগ সম্পন্ন না করলে পরীক্ষা নেওয়া যাবে না।
এতে হয়তো প্রথমদিকে পাশের হার ২০–২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হবে।
একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা চাই আমাদের সন্তান সত্যিকারের শিখুক। বছর শেষে নম্বর পেলেই হবে না।”
শিক্ষক নাজমা হোসেন লাকী মত দেন, “কঠোরতা ছাড়া মান আসবে না। তবে ফেল নীতি মানবিক হতে হবে—শাস্তিমূলক নয়, সহায়ক।”
শিক্ষা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “নীতির পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। অভিভাবকরা অনেক সময় ফেল মানতে চান না।” অর্থাৎ, শুধু নীতি নয়; সামাজিক সচেতনতা দরকার।
কী হতে পারে করণীয়?
© ফেল করলে প্রমোশন নয়—নীতি পুনর্বহাল।
© রিমেডিয়াল ক্লাস বাধ্যতামূলক।
© টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাতিল।
© শতভাগ সিলেবাস সম্পন্ন নিশ্চিত করা।
© শিক্ষকদের বেতন ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি।
© ধারাবাহিক মূল্যায়ন কঠোরভাবে প্রয়োগ।
শিক্ষা শুধু পাশের হার নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রক্রিয়া। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে গুণগত শিক্ষা চাই, তবে নকলমুক্ত পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। বদলাতে হবে প্রমোশন নীতি, ফিরিয়ে আনতে হবে জবাবদিহি, নিশ্চিত করতে হবে ভিত্তিমূলক দক্ষতা।
প্রথম কয়েক বছর হয়তো ফল খারাপ হবে, পাশের হার কমবে, সমালোচনা হবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমরা পাবো দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, জ্ঞানভিত্তিক একটি প্রজন্ম।
রাকিবদের হারিয়ে যেতে দিলে চলবে না। তাদের প্রকৃত শেখার সুযোগ দিতে হলে আমাদের সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নকলমুক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি—নীতির সংস্কার। এখন প্রশ্ন, নতুন শিক্ষামন্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন কি সেই সাহস দেখাতে প্রস্তুত?
শিক্ষাবার্তা /এ/১৮/০২/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল