এইমাত্র পাওয়া

মাহে রমজানের ছুটি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চোর-পুলিশ খেলা

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 
শহরের এক প্রান্তে এক স্কুলে নোটিশ ঝুলছে—“রমজানে ক্লাস চলবে যথারীতি।”অন্য প্রান্তে এক মাদ্রাসায় ঘোষণা—“পহেলা রমজান থেকে ছুটি।”আর কলেজে? সেখানে আবার মাঝামাঝি এক সিদ্ধান্ত।

শিক্ষক কক্ষে বসে গণিত স্যার বললেন, “দেখি তো, এই সমীকরণটা মেলে কিনা—রমজান = ছুটি (মাদ্রাসা + কলেজ) – স্কুল?” পাশ থেকে ইতিহাস স্যার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এটা ইতিহাসের অঙ্ক নয়, এটা প্রশাসনের কৌতুক!” হঠাৎ খবর এলো—হাইকোর্ট রিটে আদেশ দিয়েছে, পহেলা রমজান থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে।

এরপরই আবার আপিল, আবার স্থগিতাদেশ—এক দফা, দুই দফা… যেন আদালতের সিঁড়িতে ‘চোর-পুলিশ’ খেলা। এই গল্প কাল্পনিক হলেও বাস্তবের ছায়া স্পষ্ট। মাহে রমজানের ছুটি নিয়ে যে টানাপোড়েন, তা এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সামাজিক বিতর্ক, নীতিগত প্রশ্ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত প্রথা ছিল—রমজানের শুরু থেকে স্কুল-কলেজে আংশিক বা পূর্ণ ছুটি। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে নানা সরকার এসেছে গেছে, কিন্তু এই ধারাবাহিকতা খুব একটা বদলায়নি। এবার দেখা গেল ভিন্ন চিত্র।

মাদ্রাসায় পহেলা রমজান থেকেই ছুটি। কলেজে ছুটি কার্যকর। কিন্তু স্কুল পর্যায়ে ছুটি কার্যকর নয়।

প্রশ্ন উঠছে—রোজা কি কেবল মাদ্রাসা বা কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য? স্কুলের শিক্ষার্থীরা কি রোজা রাখে না?

এই বিভাজনকে অনেকে “প্রশাসনিক বৈষম্য” বলছেন। শিক্ষা তো একটি সমন্বিত ব্যবস্থা—তাহলে সিদ্ধান্তে এমন অসামঞ্জস্য কেন?

রমজানের ছুটি কার্যকর করার দাবিতে আদালতে রিট হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর হাইকোর্ট বিভাগে আদেশ আসে—পহেলা রমজান থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আপিল করে। আবার স্থগিতাদেশ। আবার নতুন আদেশ।

এই ধারাবাহিকতা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে না বন্ধ থাকবে—এ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক সবাই।

একজন আইনজীবী মন্তব্য করেন, প্রশাসনিক নীতির স্পষ্টতা না থাকলে আদালতে যেতে হয়। কিন্তু একই বিষয়ে বারবার আদেশ-স্থগিতাদেশ জনস্বার্থে বিভ্রান্তিকর।”

ঢাকার এক সরকারি স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক বললেন, “আমরা শিক্ষকরা সিদ্ধান্তের খেলায় বলের মতো হয়ে গেছি। একদিন বলছে ক্লাস নেবো, পরদিন বলছে বন্ধ। এতে একাডেমিক পরিকল্পনা ভেঙে যায়।”

আরেকজন শিক্ষক বলেন, “রমজানে সকাল ১০টার পর শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। গরম, রোজা—সব মিলিয়ে ক্লাসের মান কমে যায়।”

দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, “আমরা রোজা রেখে ক্লাস করি, কিন্তু দুপুরের দিকে খুব কষ্ট হয়। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের ল্যাব ক্লাসে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন।”

অন্যদিকে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, “রমজানে বাসায় থাকলে পড়াশোনায় মন বসে না। স্কুলে গেলে একটা রুটিন থাকে।” অর্থাৎ ছুটি পেলেই সবাই খুশি—এমন নয়। কেউ চায় রুটিন, কেউ চায় বিশ্রাম।

একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“একই দেশে এক স্তরে ছুটি, অন্য স্তরে নয়—এটা বৈষম্য। সিদ্ধান্ত যদি নিতেই হয়, একযোগে নিক।”

আরেকজন বলেন, “রমজান ইবাদতের মাস। ছোটদের জন্য বিশ্রাম দরকার। কিন্তু দীর্ঘ ছুটিতে পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে তার প্রভাব পড়ে।”

অভিভাবকদের বড় উদ্বেগ—সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তা। বারবার পরিবর্তন মানে পরিকল্পনা ভেঙে যাওয়া।

একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মন্তব্য করেন, “শিক্ষানীতি আবেগ দিয়ে নয়, গবেষণা ও পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারণ করা উচিত। রমজানে ক্লাসের সময় কমিয়ে দেওয়া, অনলাইন সাপোর্ট বাড়ানো—এগুলো বিকল্প হতে পারে।”

আরেকজন বলেন,“দশ দিন স্কুল খোলা রাখলে শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা পাবে—এই যুক্তি দুর্বল। আবার পুরো মাস বন্ধ রাখলেও একাডেমিক ঘাটতি তৈরি হতে পারে। সমন্বিত সিদ্ধান্ত দরকার।”

এক শিক্ষক সংগঠনের নেতা জসিম উদ্দিন আহমেদ  বলেন, “আমরা চাই এক ও অভিন্ন নীতি। মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ—সব স্তরে সমতা থাকতে হবে।” কিন্ত শিক্ষা মন্রনালয়ের কার্যক্রমে মনে হয় এরা মাহে রমজানের ছুটি নিয়ে চোর পুলিশ খেলছে। কিছু অথর্ব কর্মকর্তা মন্ত্রনালয়ে বসে শিক্ষাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা করবো এই অথর্ব কর্মকর্তাগুলো বিষয়ে তদন্ত করা।

শিক্ষক কর্মচারি ঐক্যজোটের নেত্রী অধ্যাপিকা রোকেয়া চৌধুরী বেবি বলেন, “শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেন রুটিন দায়িত্বে ব্যস্ত—ম্যানেজিং কমিটি, গভর্নিং বডি, অ্যাডহক কমিটি—এসব নিয়েই বেশি সময় যাচ্ছে। কিন্তু বড় নীতিগত প্রশ্নে স্পষ্টতা নেই।”তাদের মতে, রমজানের ছুটি ইস্যুতে প্রশাসনিক দ্বিধা জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি করছে।

স্বাধীনতার পর থেকে রমজান ঘিরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি নিয়ে নানা পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এবারের মতো এত আইনি টানাপোড়েন কমই দেখা গেছে। তিনি আরও বলেন দশ দিন খোলা রাখলে কী ক্ষতি হবে?

রমজান শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি সামাজিক বাস্তবতা। বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী রোজা রাখে। তাদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার কথা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে শিক্ষাবর্ষের ধারাবাহিকতাও রক্ষা করতে হবে।

মাহে রমজানের ছুটি নিয়ে “চোর-পুলিশ” খেলা চলতে থাকলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীরাই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত—শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকের মতামত গ্রহণ করা এবং আদালতের দোরগোড়ায় যাওয়ার আগেই নীতিগত স্পষ্টতা তৈরি করা। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে বিভ্রান্তি।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.