এইমাত্র পাওয়া

বেহেশতের সার্টিফিকেট থেকে চরিত্রহনন: আমির হামজার বক্তব্যে সীমালঙ্ঘনের রাজনীতি

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 
ধর্মীয় বয়ান সমাজে নৈতিকতা গঠনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। ওয়াজ মাহফিল, খুতবা কিংবা ধর্মীয় আলোচনার মঞ্চ থেকে উচ্চারিত একটি বাক্য হাজারো মানুষের চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করে।

সেই জায়গায় দায়িত্বশীলতা না থাকলে ধর্ম হয়ে ওঠে বিভ্রান্তির হাতিয়ার, আর বক্তা হয়ে ওঠেন বিতর্কের উৎস। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত বক্তা আমির হামজার একের পর এক বেফাস, অসত্য ও উসকানিমূলক বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।

আমির হামজার বক্তব্য ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কোনো একক মন্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। 

আমির হামজা একাধিক ওয়াজে দাবি করেন, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করেছেন।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০১১ সালের আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ চালুই হয়নি। ফলে তার এই দাবি তথ্যগতভাবে অসত্য বলে প্রমাণিত হয়।

এছাড়া তিনি বলেন—
“জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ছেলেরা সকালে মদ দিয়ে কুলি করে”—
এই মন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের কাছে চরম অপমানজনক ও ভিত্তিহীন বলে বিবেচিত হয়েছে।

ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানাকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর তিনি আরেক ওয়াজে দাবি করেন—
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হলে ১৬ বছর আজান দিতে দেওয়া হয়নি, ডাকসু নির্বাচনে শিবির জেতার পর আজান শুরু হয়।”
এই বক্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত। মুহসিন হলে আজান কখনোই বন্ধ ছিল না—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

 করোনা ও আল কোরআন  নিয়ে ভয়ংকর বক্তব্যে তিনি বলেন—
“মুসলমানদের করোনা হলে আল কোরআন মিথ্যা হয়ে যাবে।”
এই বক্তব্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন বিভ্রান্তিকর, তেমনি এটি আকিদাগতভাবে বিপজ্জনক বলেও আলেম সমাজের একাংশ মত দেন।

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ উপমা রাজনৈতিক বক্তব্যে তিনি বলেন—
“হাসিনা মানে সুন্দরী, খালেদা জিয়া মানে মনে প্রবেশকারী—তিনি জেলখানায় প্রবেশ করে  আছেন।”
এই বক্তব্যকে অনেকেই নারী রাজনীতিকদের অবমাননা ও কুরুচিপূর্ণ রসিকতা হিসেবে দেখেন।

একসময় তিনি প্রকাশ্যে বলেন—
“আমার চৌদ্দগুষ্টি আওয়ামী লীগ।” আমার দাদা ২২ বছর আওয়ামীগের চেয়ারম্যান। তিনি তার ওয়াজমাহফিল এ বলেছিলেন-

১৬ কোটি মানুষের জননী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে স্বপ্ন দেখেছে সেই স্বপ্ন  বাস্তবায়নের জন্য যে কাজ করবেনা সে যে দলেরই হোক সে জাহান্নামে যাবে।

জুলাই ২৪ অভ্যুস্থানের পর ৩৬০ ডিগ্রি ভোল পাল্টে হয়ে যান জামাত ইসলামের এমপি প্রার্থী।তিনি এখন বলছেন দাঁড়িপাল্লায় একটা ভোট দিয়ে ১৮ কোটি মানুষের সোয়াব পাবেন।জামাতকে ভোট দিলে বেহেশত নিশ্চিত। 

মহানবী সা: সম্পর্কে বেফাঁস মন্তব্য করেন। তিনি মহানবী হযরত মুহম্মদ সা:  একজন সাংবাদিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

একাধিক বক্তব্যে আমির হামজা নিজেকে “বিশ্ববিদ্যালয়ের মাল” বলে দাবি করেন—যা সামাজিকভাবে হাস্যকর ও আত্মম্ভরিতার প্রকাশ বলে সমালোচিত হয়।

নারী ও অভিনেত্রীদের নিয়ে বেফাস মন্তব্য
ভারতীয় জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানাকে নিয়ে তিনি বলেন—
“চেহারার দিক থেকে তিনি বিশ্বের এক নম্বর নারী।”
ধর্মীয় মঞ্চে এমন মন্তব্যকে অনেকেই অশালীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জনপ্রিয়তা কুড়ানোর চেষ্টা বলে মনে করেন।

তিনি দাবি করেন—
কখনো তারেক রহমান নুরুদ্দিন আপুর সঙ্গে গোপন বন্দিশালায় ছিলেন,
আবার বলেন, গিয়াস আল মামুনের সঙ্গে গোপন বন্দিশালায় লুডু খেলেছেন।
এই বক্তব্যগুলোকে রাজনৈতিক মহল গুজব ও কল্পকাহিনি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

তিনি বলেন—
“আমি আর মামুনুল হক একসঙ্গে চলন্ত ট্রেনের ভেতর নামাজ আদায় করেছি।”
এ ধরনের বক্তব্যকে অনেকেই অতিরঞ্জিত ও নাটকীয় গল্প হিসেবে দেখেন।

ওয়াজ মাহফিলে তিনি বলেন—
“কোকো নামের উচ্চারণ নিয়ে অত্যন্ত জঘন্য কুরুচিপূর্ণ বিতর্কিত মন্তব্য করেন।এটি সরাসরি মরহুম ব্যক্তিকে অবমাননা ও রুচিহীন বক্তব্য হিসেবে নিন্দিত হয়।

সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তিনি বলেন—
“জামায়াতকে ভোট দিলেই বেহেশত নিশ্চিত।”
এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর এমপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। একটি টকশোতে তিনি বলেন—
“বেহেশত-দোজখের ফয়সালা কোনো রাজনৈতিক দলের ভোটের সঙ্গে যুক্ত করা ইসলামসম্মত নয়।”

আমির হামজা দাবি করেন—
“আম্মাজান খাদিজাতুল কুবরা (রা.) জীবনে নামাজ, রোজা, যাকাত কিছুই করেননি।”
আলেমরা বলেন, এটি ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস সম্পর্কে মারাত্মক অজ্ঞতার পরিচয়। শরিয়তের বিধান নাজিলের সময়কাল ও প্রেক্ষাপট না বুঝে এমন মন্তব্য করা সম্পূর্ণ অনুচিত।

ধর্মীয় বক্তা হিসেবে আমির হামজার দায়িত্ব ছিল সত্য, শালীনতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে কথা বলা। কিন্তু একের পর এক বেফাস মন্তব্য, মিথ্যা দাবি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ধর্মীয় বিষয়কে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার প্রবণতা তাকে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
আজ প্রশ্ন উঠছে—
ওয়াজ কি হবে সত্যের দাওয়াত, নাকি জনপ্রিয়তার বাজারে বিভ্রান্তি ছড়ানোর মঞ্চ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সমাজের সচেতন মহল আমির হামজার বক্তব্যগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করছে।

ইসলাম কখনোই মিথ্যা, অপবাদ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণকে সমর্থন করে না। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয় কিছু অনুমান গুনাহ। আর তোমরা একে অপরের দোষ অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না।”(সুরা হুজুরাত, আয়াত ১২)

এই আয়াত শুধু ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়, সামাজিক বক্তব্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রমাণহীন অভিযোগ, অতিরঞ্জিত কাহিনি কিংবা কারো বিশ্বাস ও চরিত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য—সবই গীবত ও অপবাদের অন্তর্ভুক্ত।

হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন—“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

ওয়াজের মঞ্চে “ভালো কথা” বলতে গিয়ে যদি অসত্য, বিদ্বেষ বা কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহৃত হয়, তবে তা এই হাদিসের সরাসরি পরিপন্থী।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—কারো জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা ঘোষণা করার অধিকার। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“নিশ্চয় তোমার পালনকর্তাই জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং কে সৎপথে আছে।”(সুরা আনআম, আয়াত ১১৭) অর্থাৎ জান্নাতের ‘সার্টিফিকেট’ দেওয়ার মালিক কোনো বক্তা নন, বরং একমাত্র আল্লাহ।

শিক্ষাবিদদের মতে, এমন বক্তব্য শুধু ধর্মীয় বিভ্রান্তিই নয়, বরং সমাজে যুক্তিবোধের ওপর আঘাত। একজন অধ্যাপক বলেন, “যখন ওয়াজে তথ্য যাচাই ছাড়াই কথা বলা হয়, তখন সাধারণ মানুষ সেটাকেই সত্য ধরে নেয়। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও সমাজ—তিনটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

সুধীজনরা মনে করেন, ধর্মীয় বক্তাদের জনপ্রিয়তা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত ছড়াচ্ছে। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার সঙ্গে দায়বদ্ধতা না থাকলে ধর্ম হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত এজেন্ডার হাতিয়ার।

আলেম সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশই আমির হামজার বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। অনেক আলেম স্পষ্ট করে বলেছেন—ওয়াজ মানে বিনোদন নয়, গালগল্প নয়। এটি আমানত। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে কথা বলাই একজন আলেমের দায়িত্ব।

একজন আলেমের ভাষায়, “ওয়াজের মঞ্চে অসত্য বলা কবিরা গুনাহ। আর কাউকে হেয় করা, বিশেষ করে মৃত ব্যক্তি বা নারী নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা ইসলামের নৈতিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত।”

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আইনের বাইরেও রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতা। ধর্মীয় বক্তারা যদি আইনের ফাঁক গলে দায় এড়ান, তবু ইতিহাস ও সমাজ তাদের বিচার করবেই।

আমির হামজার বক্তব্য আমাদের একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—ধর্মের মঞ্চ কি যাচাইহীন বক্তব্য ও চরিত্রহননের জায়গা হতে পারে? নাকি এটি হবে নৈতিকতা, সত্য ও সংযমের আশ্রয়?

বেহেশতের সার্টিফিকেট বিলি করা যতটা সহজ, সত্য ও নৈতিকতার পথে থাকা ততটাই কঠিন। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা সেই কঠিন পথেই চলতে বলে। আজ সময় এসেছে—ওয়াজের মঞ্চকে দায়িত্বশীলতা, জ্ঞান ও সত্যের আলোয় ফিরিয়ে আনার। নইলে সীমালঙ্ঘনের এই রাজনীতি সমাজকে আরও বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করবে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।। 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.