এইমাত্র পাওয়া

অবৈতনিক শিক্ষাদানে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক।। 

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয় শিক্ষাকে। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বা এসডিজি হিসেবে যে ১৭টি লক্ষ্য স্থির করেছে তার মধ্যে চতুর্থটি হলো সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি।

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয় শিক্ষাকে। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বা এসডিজি হিসেবে যে ১৭টি লক্ষ্য স্থির করেছে তার মধ্যে চতুর্থটি হলো সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি। বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র সর্বসম্মতভাবে ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বা এসডিজি গ্রহণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের কথা।

এসডিজির লক্ষ্য-৪-এর অন্তর্ভুক্ত প্রথম সাবকম্পোনেন্ট ৪.১-এ বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সব ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করা। তবে বাংলাদেশে বিনামূল্যে শিক্ষা এখনো প্রাথমিক স্তরেই সীমাবদ্ধ। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, অবৈতনিক শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিশ্বে অন্যতম এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার যেসব দেশে আইন কাঠামোর মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে শ্রীলংকা। দেশটিতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষাদানের বিধান রয়েছে। এছাড়া মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তানে প্রথম থেকে দ্বাদশ; কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও ভুটানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম; তাজিকিস্তান ও ইরানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণী এবং ভারতে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষাদানের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে অবৈতনিক শিক্ষার বিধান রয়েছে কেবল প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত। শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, সমগ্র বিশ্বেই বাংলাদেশ অন্যতম পিছিয়ে থাকা দেশ। বাংলাদেশের চেয়ে এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে কেবল তিনটি দেশ।

একই চিত্র দেখা গেছে বাধ্যতামূলক করার বিধানের ক্ষেত্রেও। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অন্যতম পিছিয়ে থাকা দেশের তালিকায় রয়েছে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫৫টি দেশ প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বা তদূর্ধ্ব শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও পাকিস্তানে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত, শ্রীলংকায় দশম শ্রেণী পর্যন্ত, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, ইরান ও আফগানিস্তানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত, নেপাল ও ভারতে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ও মালদ্বীপে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষার বিধান রয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলককরণ) আইনের মাধ্যমে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে ভুটানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হলেও আইনের মাধ্যমে কোনো স্তর পর্যন্ত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়নি।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা এবং যথাযথ উদ্যোগের অভাবেই দেশের অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার স্তর তিন দশকেও বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়নি। মাধ্যমিক স্তর অবৈতনিক না হওয়ায় এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় একদিকে যেমন মাধ্যমিক স্তরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, অপরদিকে সামাজিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসডিজির শিক্ষাসংক্রান্ত লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ যে অবস্থায় আছে, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে তা যথাযথভাবে পূরণ করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বিভিন্ন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সরকারের কার্যকর পরিকল্পনার অভাব এক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষত ব্যয়বহুল মাধ্যমিক শিক্ষা এবং প্রাথমিকে প্রায় ১১ ধারার শিক্ষাপদ্ধতি সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক করে তুলেছে।’

১৯৭২ সালে রচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলোদেশের সংবিধানেও অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাকে এ সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এর ফলে রাষ্ট্র গত ৫০ বছরেও গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলেও নাগরিকরা এর বিরুদ্ধে কোনো জবাবদিহি চাইতে পারছেন না। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেখানেও এ বিষয়ে কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত সংস্কারে মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও শিক্ষার সংস্কারে কোনো কমিশন গঠন হয়নি।

গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৯৭২-এর সংবিধানে শিক্ষাকে এ সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত না করার মাধ্যমে একধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি দেয়া হয়েছে। সংবিধানে বলা হয়েছে, একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানে রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কিন্তু রাষ্ট্র যদি এটা না করে তাহলে নাগরিকের রিট করার সুযোগ নেই। এটি খুবই দুঃখজনক যে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোর তুলনায়ও পিছিয়ে আছি। এখনো আমাদের অনেক শিক্ষার্থী অর্থাভাবে ঝরে পড়ছে। ইউনেস্কোর প্রতিবেদনই এর আগে বলেছে আমাদের দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যয়ের ৭১ শতাংশই পরিবার বহন করে। এ শিক্ষাব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। আমাদের মতো দেশের পরিবারগুলোর একটি বড় অংশের পক্ষে এ বিপুল পরিমাণ ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। যদি সরকারের পক্ষ থেকে অবৈতনিক শিক্ষার স্তর বাড়ানো না হয় তবে সামাজিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়তে থাকবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলছি অন্তত অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে যেন বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মাধ্যমিক ৯৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি। কিছু বেসরকারি বিদ্যালয়কে এমপিওভুক্তির মাধ্যমে সরকার কিছু অর্থসহায়তা দিচ্ছে, তবে এতে শিক্ষার্থীরা খুব একটা লাভবান হচ্ছে না। যে প্রক্রিয়ায় এমপিওভুক্তির বিষয়টি পরিচালিত হয়, সেখানে শিক্ষার তুলনায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বেশি। শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী, কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করার একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তবে সেটিও বাতিল করা হয়েছে। যেখানে এ ধরনের সুযোগ বাড়ানোর কথা সেখানে সুযোগ আরো সংকুচিত হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেখানে শিক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে ইশতাহারেও এখনো আমরা শিক্ষা খাতে আশাব্যঞ্জক কোনো অঙ্গীকার দেখিনি। সব মিলিয়ে শিক্ষা যেন অগ্রাধিকার খাত থেকে ছুটে গেছে।’


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.